
কক্সবাংলা ডটকম :: সিঙ্গাপুরের নিজস্ব জ্বালানি তেল উৎপাদন নেই। তবে দেশটি ক্রুড অয়েল সংগ্রহ করে পরিশোধিত তেল বিভিন্ন দেশে রফতানি করে। তাদের এ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে। এতে খরচ পড়ছে বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জাহাজের প্রিমিয়াম কমলেও তার কোনো সুফল পাচ্ছে না দেশের ভোক্তারা।
বাংলাদেশের মতো সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে ইন্দোনেশিয়াও। কিন্তু এ বছরের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরের বাড়তি দামের বোঝা কমাতে সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে জ্বালানি তেল আমদানি হ্রাসের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দেশটি।
মূলত ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ইন্দোনেশিয়া সিঙ্গাপুর থেকে তেল আমদানি করে। তবে এখন নিজের দেশে জ্বালানির দাম হ্রাস ও সিঙ্গাপুরনির্ভরতা কমিয়ে আনতে চাইছে ইন্দোনেশিয়া।
যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরভিত্তিক যেসব কোম্পানি থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে তার মধ্যে আছে গানভর সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড, ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড, আরামকো ট্রেডিং ও ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি কোম্পানি ২৭৮ কোটি ৩২ লাখ ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি করেছে।
এর মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ১০২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৯৬ কোটি ৮৮ লাখ, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৬৪ কোটি ৯৫ লাখ ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ১৪ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের তেল আমদানি করেছে।
প্রতি বছর এ তেল দেশের বাজারে বিক্রি করে বড় অংকের মুনাফা করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বিভিন্ন উৎস দেশকে পাশ কাটিয়ে উৎপাদক না হওয়ার পরও সিঙ্গাপুর থেকে এভাবে জ্বালানি তেল কেনার ঘটনাটিকে অনেকে বলছেন সিঙ্গাপুরফিলিয়া। সাধারণত কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণকে ইংরেজি ভাষায় ‘ফিলিয়া’ বলা হয়।
২০২৩ সালে বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহে শীর্ষস্থানে ছিল চীন। ওই বছর দেশটি বাংলাদেশে মোট ২ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল রফতানি করে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে চীনের অংশীদারত্ব দ্রুত বাড়ছে বলে সে সময় জানিয়েছিলেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরনির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির উৎসকে সংকুচিত করেছে।
অন্যদিকে বিপিসির আয়-ব্যয় হিসাবে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিদেশী প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য অতীতে আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করলেও তাতে কোনো সরকারই আগ্রহ দেখায়নি। বিগত আওয়ামী সরকার বিপিসির ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো অডিটের আয়োজন করেনি। এ ধারা অব্যাহত আছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও।
একদিকে বেশি দামে সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি, অন্যদিকে বিপিসির অভ্যন্তরে অনিয়মের অভিযোগ—এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সুফল দেশের ভোক্তারা পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ববাজারে গত এক বছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ২৪ শতাংশের বেশি। পণ্যটি আমদানি করতে গত ছয় মাসের ব্যবধানে জাহাজের প্রিমিয়াম কমেছে গড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। তেলের মূল্য ও জাহাজ ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার বিপরীতে উল্টো বেড়েছে। সরকার ৩০ নভেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম চলতি মাসের জন্য লিটারপ্রতি ২ টাকা বাড়িয়েছে।
অথচ তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দেশেও কমার কথা। কিন্তু তা না করে উল্টো দাম বাড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণ ভোক্তা নয় বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফাকে গুরুত্ব দিচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা আরো বলছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার গত দেড় দশকে যেভাবে ভেক্তার স্বার্থ উপেক্ষা করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সে ধারাই অনুসরণ করছে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারও।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
এ ফর্মুলা অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশেও কমার কথা। তাতে ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি তেল পেতেন। কিন্তু ঘটছে উল্টোটা। এখানে দাম বাড়িয়ে বিপিসির মুনাফা অক্ষুণ্ন রাখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তা। বিপিসির লাভ-ক্ষতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করা উচিত বলেও মনে করেন তারা।
যদিও বিপিসি বলছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম থেকে সমন্বয় করার সুযোগ নেই। কারণ দেশে রিফাইনারি সক্ষমতা না থাকায় বিপিসি বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। পরিশোধিত-অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার পর জাহাজ ভাড়া, বীমা, সার্ভিস চার্জ, শুল্ক, ভ্যাটসহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার ২০ শতাংশ ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত) আমদানি করা হয়।
বাকি ৮০ শতাংশ আমদানি হয় পরিশোধিত তেল। বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত) দাম কমাকে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে, অথচ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামটা যে বেশি, সেটি প্রাধান্য পাচ্ছে না।
দুই উৎস থেকে পণ্য কিনে দেশে আনতে জাহাজ ভাড়া, শুল্ক, কর, সার্ভিস চার্জ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, লাইটারিংসহ নানা খরচ রয়েছে। এসব খরচ ট্যারিফের সঙ্গে যুক্ত করা হলে হয়তো বেশি দেখাচ্ছে। কিন্তু এটা বেশি নয়। বিপিসি সরবরাহকৃত তেলের দাম বেশি নিচ্ছে এটা কিন্তু ঠিক নয়।
বিপিসি গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এ অর্থ কিন্তু বিপিসির উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হবে। রিফাইনারি করা হবে। সেখানে বড় ব্যয় রয়েছে। ফলে বিপিসি অর্থ নিয়ে যে রেখে দিচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। সংস্থাটি মজুদ কাঠামো, পাইপলাইনসহ নানা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছে।’
দেশের বাজারে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে ৬৮ থেকে ৭০ লাখ টনের মতো। এ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল), যা ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধন করে বাজারে বিপণন করছে বিপিসির তিনটি কোম্পানি।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে পণ্যটির দাম কমেছে ২৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দরে এ পতন দেখা গেছে।
যদিও বিপিসি বলছে, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে সেই অর্থে কমেনি। যে কারণে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দর হিসাব করলে মূল্যে তেমন কোনো তারতম্য হচ্ছে না। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন তুলনামূলক কম দামের উৎসের সন্ধান না করে সিঙ্গাপুর থেকে বেশি দামে পরিশোধিত তেল আমদানি দেশের ভোক্তাদের বঞ্চিত করছে।
বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করতে জাহাজের প্রিমিয়াম খরচও গত ছয় মাসের ব্যবধানে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে।
পণ্যভিত্তিক হিসাব করলে ডিজেল আমদানিতে প্রিমিয়াম কমেছে ব্যারেলপ্রতি ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ, জেট ফুয়েলে কমেছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ, অকটেনে ১২ দশমিক ৩১ শতাংশ, মেরিন ফুয়েলে টনপ্রতি ৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ফার্নেস অয়েলে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।
দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ডিজেল আমদানিতে ব্যারেলপ্রতি প্রিমিয়াম ছিল ৮ ডলার ৭৫ সেন্ট, যা এখন ৪ ডলার ৭৬ সেন্টে নির্ধারিত রয়েছে।
এছাড়া বিমানের জ্বালানি জেট এ-১ ব্যারেলপ্রতি প্রিমিয়াম ছিল ৭ ডলার ৩২ সেন্ট, যা বর্তমানে ৬ ডলার ৬৬ সেন্ট। অকটেনে ব্যারেলপ্রতি প্রিমিয়াম ৫ ডলার ৯৩ সেন্ট থেকে ৫ ডলার ২০ সেন্টে নেমে এসেছে।
এছাড়া জাহাজের জন্য আমদানি করা জ্বালানি তেল মেরিন ফুয়েল চলতি বছরের প্রথমার্ধে টনপ্রতি ৭২ ডলার ৯০ সেন্ট নির্ধারণ ছিল, যা এখন ৭০ ডলারে। এছাড়া ফার্নেস অয়েলে টনপ্রতি ৪৪ ডলার ৬৮ সেন্টে ছিল, যা বর্তমানে ৪০ ডলার ২৫ সেন্ট। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) জাহাজের প্রিমিয়াম ভাড়া আরো কমে যাবে।
আন্তর্জাতিক দরপত্র ও সরাসরি সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চুক্তির ভিত্তিতে জ্বালানি তেল ক্রয়ে চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রিমিয়াম খাতে মোট ৭৬০ কোটি টাকা সাশ্রয় করার কথা জানায় বিপিসি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জিটুজি প্রক্রিয়ায় প্রিমিয়াম খাতে ব্যয় সাশ্রয় হয় প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রিমিয়াম খাতে একই সময়ে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। প্রিমিয়ামে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হলেও স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেল ক্রয়ে ভোক্তা তেমন কোনো সুফল পায়নি। দেশের পরিবহন খাতেও তাই ভাড়া কমার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশে তার প্রভাব পড়ার সুযোগ সীমিত। কারণ জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। এছাড়া তেল কেনার পর দেশে আসতে এক মাস সময় লেগে যায়। চলতি মাসে যে দাম বেড়েছে সেখানে গত ২১ অক্টোবর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত দামের গড় হিসাব করা হয়েছে। বর্তমান দামের সঙ্গে হিসাব করে সমন্বয় করার সুযোগ নেই স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলায়।
দেশে বিপিসির জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় মূলত সিঙ্গাপুরভিত্তিক তেল পণ্যের জন্য প্রকাশিত প্ল্যাটস দরের ভিত্তিতে। সেক্ষেত্রে জ্বালানি তেল লোডিংয়ের দিন, তার আগের দুইদিন এবং পরের দুইদিন—অর্থাৎ পাঁচদিনের গড় দাম হিসাব করে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এরপর এ গড়ের সঙ্গে একটি প্রিমিয়াম যোগ করা হয়। এ প্রিমিয়ামের মধ্যে রয়েছে শিপিং খরচ, বীমা খরচ, পরিচালন ব্যয় ও প্রশাসনিক খরচ। এ প্রিমিয়াম ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত হয়।
দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি হয় ডিজেল, যা আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস অয়েল নামে পরিচিত। ডিজেলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে যে প্রিমিয়াম ছিল তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ডিজেল—দুটোতেই দাম কমেছে কিন্তু বিগত এক বছরে দেশের বাজারে তার প্রভাব খুবই সীমিত। বরং সরকার দাম বেশি রেখে মুনাফা করেছে। বিপিসির মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পায়। জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে ভোক্তাকে সুবিধা দিলে তাতে সরকারের রাজস্ব কমবে।
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জ্বালানি তেল বিক্রিতে যে আয় হচ্ছে তা থেকে সংস্থাটি সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দিচ্ছে। জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক-কর আরোপ করে সরকার প্রতি অর্থবছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুল্ক, কর বাবদ সরকারের আয় ছিল ১৪ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সরকার বিপিসির কাছ থেকে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা পাবে বলে প্রাক্কলিত হিসেবে দেখা গেছে।
দেশের বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপুল অংকের মুনাফা করেছে বিপিসি। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি। শুধু গত তিন অর্থবছরে ১২ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেল বিক্রি করে প্রতি বছর বিপুল আয় করে বিপিসি একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। ভোক্তার স্বার্থের চেয়ে মুনাফা করার দিকে মনোযোগ বেশি তাদের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বিপিসির পেট্রল, অকটেন বিক্রিতে কোনো লোকসান নেই। ডিজেল বিক্রিতে তারা লোকসানের কথা বলে, অথচ লোকসান হয় কিনা সেটি জানার সুযোগ নেই ভোক্তার। বছর শেষে বিপিসির আর্থিক হিসাব দেখলে বোঝা যায় তাদের জ্বালানি তেল বিক্রিতে কোনো লোকসান নেই। জ্বালানি তেল বিক্রিতে একটি মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলা জারি করেছে জ্বালানি বিভাগ। সে অনুযায়ী বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।
কিন্তু এতে আদৌ ভোক্তার সাশ্রয়ের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে কিনা সেটি বিবেচনাধীন। স্বচ্ছতার জন্য হলেও বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রির ফর্মুলা বিইআরসির গণশুনানিতে নেয়া যেতে পারে। তাহলে ভোক্তা জানতে পারবে তারা কোন পণ্য কত টাকায় কিনছে, যেটা এলপিজির দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে করা হয়েছে।’
এ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দাম নির্ধারিত হলে তেলের দাম কমানো সম্ভব। কারণ বছরের পর বছর বিপিসির বিপুল মুনাফা প্রমাণ করে এখানে ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষিত।
জ্বালানি তেলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিসি ব্যবসা করছে। তারা প্রতি বছর তেল কেনাবেচায় রাজস্বে লোকসান হবে বলে প্রাক্কলন করে। তবে দিন শেষে বিপুল পরিমাণ মুনাফা জমা হয় সংস্থার তহবিলে। জনগণের এ টাকার হিসাবে স্বচ্ছতা থাকা উচিত বলে মনে করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘বিপিসির আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে এক দশক আগেই আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার দাবি তোলা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও আজও তা হয়নি। এটি করা গেলে সংস্থাটিকে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যেত। অথচ বিপিসি এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। সারা দুনিয়ার নিয়ম হলো সরকার সেবা দেবে, মুনাফা করবে না। অথচ শুল্ক, এক্ষেত্রে করের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব যাচ্ছে সরকারের ঘরে।’

Posted ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta