
কক্সবাংলা ডটকম(৪ ডিসেম্বর) :: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ২০০৭ সালে আংশিক এবং ২০১৫ সালে পুরোদমে চালু হওয়ার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে টার্মিনালটির আয়।
ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে মুনাফায় থাকা দেশের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটিকে বিদেশী অপারেটরের হাতে দেয়ার সিদ্ধান্তে উঠছে নানা প্রশ্ন।
যদিও বিষয়টি নির্ভর করছে আদালতের রায়ের ওপর, যা আজ ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জাহাজ ও কনটেইনার মিলিয়ে মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা।
সব খরচ বাদ দিলে প্রকৃত আয় দাঁড়ায় ৬০৭ কোটি।
আবার এনসিটির এ আয় থেকে সরকার কর হিসাবে পেয়েছে ১৫২ কোটি টাকা। এ হিসাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে এনসিটি থেকে প্রতি টিইইউতে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকৃত আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪১ ডলার।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত সবচেয়ে লাভজনক এ টার্মিনাল বিদেশী অপারেটরের হাতে গেলে ভবিষ্যতে বন্দরের রাজস্ব নির্ভর করবে মূলত ওই বিদেশী পরিচালকের সঙ্গে দরকষাকষির ওপর।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, দেশে টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশী অপারেটরদের শতভাগ করমুক্ত ছাড়ের সুযোগ থাকবে।
এরই মধ্যে লালদিয়া ও পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া দুই বিদেশী অপারেটর আগামী ১০ বছর শতভাগ করমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এটিকে ২০১৭ সালের বিদ্যমান সরকারি আদেশ অনুযায়ী পিপিপিভিত্তিক অবকাঠামো প্রকল্পে দেয়া নিয়মিত করছাড় বলে দাবি করা হয়েছে এনবিআরের পক্ষ থেকে।
এর আওতায় বিদেশী টেকনিক্যাল স্টাফের আয়, রয়্যালটি, টেকনিক্যাল নলেজ ফি ও লভ্যাংশ—সবই করমুক্ত।

চট্টগ্রাম বন্দর এখন পর্যন্ত দুটি সমুদ্রগামী কনটেইনার টার্মিনালে বিদেশী অপারেটরের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি করেছে। এর একটি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), যেখানে প্রতি টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট (টিইইউ) হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বন্দর পায় ১৮ ডলার।
পিসিটিতে জেটি নির্মাণ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের আর কোনো বিনিয়োগ নেই। সম্প্রতি লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে নতুন কনসেশন চুক্তি করেছে বন্দর।
লালদিয়ার ক্ষেত্রে প্রথম স্ল্যাব (০-৮ লাখ টিইইউ) প্রতি টিইইউতে ২১ ডলার, দ্বিতীয় স্ল্যাব (৮-৯ লাখ টিইইউ) ২২ ডলার এবং তৃতীয় স্ল্যাবে ৯ লাখ অতিক্রম করলে প্রতি টিইইউতে ১০ ডলার রাজস্ব পাবে বন্দর।
টার্মিনালটি সম্পূর্ণ গ্রিনফিল্ড প্রকল্প হওয়ায় আগামী তিন বছরের মধ্যে সব বিনিয়োগই করবে বিদেশী অপারেটর।
অন্যদিকে বিদেশী অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় থাকা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি স্থাপনে এরই মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সরকার, যা এখন পুরোপুরি লাভজনক অবস্থায় রয়েছে।
জাহাজ ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এনসিটির আয় ধারাবাহিকভাবেই বেড়েছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে আয় ছিল ৯৭০ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ আয় হয় ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা, ২০২২-২৩-এ ১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫২৩ কোটি টাকায়।
আয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে টার্মিনালের মোট মুনাফাও। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এনসিটির মোট মুনাফা ছিল ৪৬৩ কোটি টাকা; পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ৪৬১ কোটি টাকায় নেমে আসে।
তবে পরবর্তী অর্থবছরগুলোয় মুনাফা আরো দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬২১ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৭৭ কোটি এবং সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট মুনাফা দাঁড়ায় ৭৯৬ কোটি টাকায়।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশী অপারেটরের হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) টার্মিনালটি পরিচালনায় ২০২৩ সালের মার্চে অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি।
এরপর ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি)।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সে সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি হস্তান্তরের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (অর্থ) মো. মাহবুব আলম তালুকদারকে।
নিয়ম অনুযায়ী, দরকষাকষি শেষে দুই পক্ষের মধ্যে কনসেশন চুক্তি সম্পন্ন হয়। এরপর বন্দরকে এককালীন অর্থ, বার্ষিক ফি ও কনটেইনারপ্রতি নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে বেসরকারি অপারেটর।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, ‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে সব অবকাঠামোই তৈরি করা আছে। বর্তমানেও নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এটি দেশের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে চলছে। এখানকার রাজস্ব পুরোপুরি দেশে থেকে যাচ্ছে।
তবে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পে যেখানে সরকারের কোনো বিনিয়োগ নেই সেখানে আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর যুক্ত করাটাই যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি।’
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে এটি একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ ভেড়াতে পারে। বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১০ লাখ টিইইউ। যদিও বর্তমানে ১২ লাখ টিইইউর বেশি হ্যান্ডলিং হচ্ছে।
সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পুরো বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয় ২৮ লাখ ১৬ হাজার টিইইউ। এর মধ্যে কেবল এনসিটিতেই ১২ লাখ ৩৭ হাজার টিইইউ হ্যান্ডলিং হয়। অর্থাৎ বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪৪ শতাংশই এ টার্মিনালে সম্পন্ন হয়েছে। এর আগের অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনসিটিতে হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১১ লাখ ৪০ হাজার টিইইউ।
এনসিটি চালুর পর থেকে গত ৬ জুলাই পর্যন্ত পরিচালনার দায়িত্বে ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। দরপত্র অনুযায়ী তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ৭ জুলাই থেকে পরিচালনার দায়িত্ব পায় চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। বর্তমানে নৌবাহিনীর অধীন এ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানেই চলছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালন কার্যক্রম।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড এনসিটির দায়িত্ব পাওয়ার পর টার্মিনালটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। জাহাজের গড় অবস্থান সময় কমেছে, পরিচালন দক্ষতার কারণে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর নতুন রেকর্ডও হয়েছে।
তবে বিশ্বের শীর্ষ আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটররা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যেখানে তারা বিভিন্ন ধাপে আরো বেশি দক্ষতা দেখাতে পারে।’
এদিকে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া বন্দর কর্তৃপক্ষ এগিয়ে নিতে চাইলে তার বৈধতার প্রশ্নে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন। আবেদনের বিষয়ে আজ রায় দেবেন হাইকোর্ট।

Posted ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta