
কক্সবাংলা ডটকম :: দেশে দফায় দফায় পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণে গত সপ্তাহের শুরুতে ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এরপর প্রতিদিন বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আসছে। ছয়দিন ধরে আমদানি করা পেঁয়াজ এলেও কমেনি মসলা পণ্যটির দাম।
বাজারে দেশী ও আমদানি করা দুই ধরনের পেঁয়াজই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১২০-১৩০ টাকায়। দেশী নতুন পেঁয়াজ ১২০ ও পুরনো দেশী ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাজারে এসেছে দেশী মুড়িকাটা পেঁয়াজ। সেটির দামও ১০০ টাকার ওপরে। আমদানি শুরুর পর বাজারে পেঁয়াজের দাম কমবে—এমন ধারণা ছিল বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা। কিন্তু এর দামে কোনো ধরনের প্রভাব না পড়ায় হতাশ তারা।
পেঁয়াজ আমদানির আইপি (আমদানি অনুমতি) ইস্যু করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংগনিরোধ উইং।
সংস্থাটির সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে কেনা পেঁয়াজের দাম বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪০ টাকার কাছাকাছি। এছাড়া পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের ১৫ শতাংশ শুল্কও রয়েছে।
পাইকারি বাজারে দেশী পুরনো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৩৫ টাকায়, নতুন দেশী পেঁয়াজ ৯০-১০০ এবং আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়। গতকাল রাজধানীর অন্যতম পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার ও রামপুরা বাজার ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্রেতারা জানান, দুই সপ্তাহ আগে পেঁয়াজের দাম ছিল ১০০ টাকার নিচে। বর্তমানে সেটি ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে। সরকার আমদানির অনুমতি দেয়ার পরও সব বাজারে এখনো ভারতীয় পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে দেশীয় নতুন ও পুরনো পেঁয়াজ একই দামে বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজ কিনেছিলেন সরকারি চাকরিজীবী রবিউল আলম। তিনি বলেন, ‘ভরা মৌসুমেও শীতকালীন সবজির কেজি ৫০-৬০ টাকা। পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকা। অথচ সরকার বলছে আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি করলেও দামে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। পাঁচ কেজি পেঁয়াজের দাম পড়েছে ৭০০ টাকা। এটা সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকারিভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি করা দরকার।’
কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. সজীব বলেন, ‘সরকার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু আমদানি করা পেঁয়াজ আমাদের ৯৫-৯৮ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সেটা যখন আমরা ১০০-১১০ টাকায় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি, তারা আবার আরো ১০-২০ টাকা লাভে বিক্রি করছে। এভাবে দাম বেড়েছে। ছয়দিন আগে আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। কিন্তু সেটার প্রভাব এখনো বাজারে পড়েনি। আমদানি করার পরও দাম না কমার বিষয়টা আমদানিকারকরা ভালো বলতে পারবেন।
আমরা পাইকারি দামে বিক্রি করি। খুচরা বিক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে নিয়ে কিছু লাভ করে আবার বিক্রি করছেন। যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি ভোক্তাদের ওপর। তবে আমদানি যদি সচল থাকে তাহলে আমরা আশা করছি এ সপ্তাহের শেষ দিক থেকে দাম কমে আসবে।’
আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিতে চান না বলে জানান খুচরা বিক্রেতা ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ‘পেঁয়াজের নিয়ন্ত্রণ মূলত বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। খুচরা বিক্রেতারা কয়েক বস্তা পেঁয়াজ এনে খুচরায় বিক্রি করেন। এবার ভারতীয় পেঁয়াজ এখনো সেভাবে খুচরা পর্যায়ে আসেনি। দাম না কমার এটা একটা কারণ হতে পারে। আরেকটা বড় কারণ ভারতীয় পেঁয়াজ ক্রেতারা কম পছন্দ করেন। আর এটা দ্রুত পচে যায় বলে অনেক ব্যবসায়ী ঝুঁকি নিতে চান না। ঝুঁকি নিয়ে পেঁয়াজ এনে যদি বিক্রি করতে না পারেন তাহলে লোকসান হবে। এ কারণে অনেকে আনছেন না।’
এদিকে গত রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাড়ে সাত হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির আইপি ইস্যু করলেও পেঁয়াজ এসেছে তিন হাজার টন।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) বনি আমিন খান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমরা সাড়ে সাত হাজার টন আমদানির জন্য আইপি (আমদানি অনুমতি) ইস্যু করেছি। তবে তিন হাজার টনের মতো পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে রোববার থেকে প্রতিদিন ২০০টি করে আইপি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি আইপির বিপরীতে ৩০ হাজার টন, সব মিলিয়ে প্রতিদিন ছয় হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা যাবে।’
প্রথম পাঁচদিনে সাড়ে সাত হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির আইপি ইস্যুর পরও তিন হাজার টন আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় অংশই আসে মহারাষ্ট্র থেকে। সেখান থেকে বাংলাদেশ বর্ডারে আসতে ৩-৪ দিন লেগে যায়। দেশের বাজারে পৌঁছতে আরো একদিন লাগে। সেজন্য আইপি নেয়ার পরও সব পেঁয়াজ বাজারে আসেনি।’
গত ৭ ডিসেম্বর থেকে সীমিত পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। ওইদিন থেকে প্রতিদিন ৫০টি করে আইপি ইস্যু করা হচ্ছিল। প্রতিটি আইপির বিপরীতে ৩০ টন করে দিনে সর্বোচ্চ দেড় হাজার টন করে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়া হচ্ছিল।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো দেশের পেঁয়াজের সরবরাহ রয়েছে। তাছাড়া নতুন মৌসুমের পেঁয়াজও উঠছে পাবনা, মেহেরপুর, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এসব পেঁয়াজ তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে সেখানকার বাজারে। কিন্তু পুরনো দেশী পেঁয়াজ ও আমদানীকৃত ভারতীয় পেঁয়াজের বাড়তি দামের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজও কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে।
তাছাড়া ভারতীয় পেঁয়াজ দেখতে তুলনামূলক ভালো হওয়ার কারণে কম দামে আমদানির পরও বেশি দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। মূলত মোকাম থেকে বেশি দামে বিক্রির কারণে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপণ্যটি।’
জানতে চাইলে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মেসার্স ইরা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘দেশী পেঁয়াজের মজুদ কমে আসায় দাম বেড়েছে। এখন আমদানি খুলে দেয়ার পর কোনো পেঁয়াজের দামও কমছে না। বাজারে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা সেই অনুপাতে সরবরাহ আসছে না। এ কারণে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।’ তাছাড়া পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায় উঠে যাওয়ার পর আমদানি সত্ত্বেও দাম পতনের হার কম বলে জানিয়েছেন তিনি।
চট্টগ্রামের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন বাজারে একাধিক মানের পেঁয়াজ রয়েছে। ভারত থেকে আমদানি হওয়া কিছুটা নিম্নমানের পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার দেশীয় ভালো মানের বড় পেঁয়াজ ভারতীয় পেঁয়াজের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমদানির উৎস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে চাহিদামতো পেঁয়াজ না পাঠানোর কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পেঁয়াজের দাম কমছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশীয় পেঁয়াজ উত্তোলন শুরু হয়েছে। বিশেষত এ সময়ের উত্তোলন হওয়া পেঁয়াজ তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়। এখন দাম বেশি থাকায় ধারণার চেয়েও বেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন করছেন কৃষকরা। প্রতিদিনই উত্তোলনের পরিমাণ বাড়ছে।
তাছাড়া মৌসুমের শেষ সময়ে আগের মৌসুমের দেশী পেঁয়াজ ও আমদানীকৃত পেঁয়াজের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমদানি সত্ত্বেও দাম না কমায় আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের বাড়তি মুনাফার লোভকে দায়ী করেছেন তারা। এজন্য আমদানির অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠান, আমদানির পর আড়তগুলোর নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

Posted ১:৪৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta