
কক্সবাংলা ডটকম(৫ ডিসেম্বর) ::ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা ভূমিকম্পে কাঁপল।
ঘুমিয়ে থাকায় অনেকেই কম্পন টের পাননি, আবার কেউ কেউ টের পেয়ে আতঙ্কে বিছানা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৩৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নরসিংদীর শিবপুরে। এটি ছিল হালকা মাত্রার ভূমিকম্প; রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ৩৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।
ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ৩৩ কিলোমিটার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে, আর নরসিংদী শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ৩০ কিলোমিটার।
এর আগে সর্বশেষ সোমবার (১ ডিসেম্বর) মধ্যরাত ১২টা ৫৫ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৯। মায়ানমারের মিনজিনে ছিল এর কেন্দ্রস্থল। চট্টগ্রামসহ দেশের কিছু অংশে এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
তার আগে গত ২৭ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্প হয়। ওই দিন বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে। ওই দিন ভোরের দিকে সিলেটে ও কক্সবাজারের টেকনাফে দুই দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়।
তবে এর আগে গত ২১ নভেম্বর সকালে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে বাংলাদেশে। ওই ভূমিকম্পে তিন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন।
রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে এবং এর কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
পরদিন সকালে নরসিংদীর পলাশে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তার রেশ না কাটতেই সন্ধ্যায় সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প হয়, যার একটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা, আরেকটি সেই নরসিংদীতেই।
কেন নরসিংদীতেই বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে?
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্পেরই উৎপত্তিস্থল নরসিংদী।
এর কারণ হিসেবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আক্তার বলেন, ভূমিকম্পের প্রধান উৎস হচ্ছে সাবডাকশন জোন অর্থাৎ এমন একটি অঞ্চল, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং একটি প্লেট অন্যটির নিচে চলে যায়।
দেশের পূর্ব প্রান্তটা হচ্ছে বার্মা প্লেট, পশ্চিমটা হচ্ছে ইন্ডিয়ান প্লেট; এই সংযোগস্থলে ভূমিকম্প হয়েছে। এই সংযোগটা এতদিন আটকে ছিল। এখন এই সংযোগটা গত ২১ নভেম্বরের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে খুলে গেছে। অর্থাৎ আটকানোটা বা লকটা খুলে গেছে।
তিনি বলেন, দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হাওর হয়ে মেঘনা নদী বরাবর ইন্ডিয়ান প্লেটটা পশ্চিম দিকে। এই বরাবর ইন্ডিয়ান প্লেটটা যে অংশে সেখানে তলিয়ে যাচ্ছে। এখন এই দুটি প্লেট পরস্পরমুখী গতি। ইন্ডিয়ান প্লেটটা পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে, বার্মা প্লেট দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে। তাহলে পরস্পর মুখেই সংঘর্ষ হচ্ছে।
ফলে ভূত্বকের মধ্যে সে শক্তি সঞ্চিত করতে থাকে। এখন এই শক্তি যখন শিলারাশির মানে সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন সেখানে ফাটল হয়ে সেই শক্তিটা বের হয়ে যায়, সেটা আগের কোনো ফাটল দিয়েও বের হতে পারে আবার নতুন করে নতুন ফাটল দিয়েও বের হতে পারে।
একই স্থান থেকে বারবার ভূমিকম্পের কারণের বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর একই স্থান থেকে বারবার উৎপত্তি হওয়াকে আফটার শক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির গণমাধ্যমে বলেন, ‘দেশে একটি বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর ছোট ছোট মৃদু অনেক ভূমিকম্প হয়েছে, এগুলো আমরা এখন পর্যন্ত আফটার শক হিসেবে দেখতে পেয়েছি।’
আগামীতে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা আছে কি না
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আক্তার বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখেছি, সাবডাকশন জোনে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে, তাহলে এই শক্তিটাকে তো বের হতে হবে। ২১ নভেম্বর যে বড় ভূমিকম্প দেশে অনূভূত হয়েছে, সেখানে মোট শক্তির শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম শক্তি বের হয়েছে।
আরও কয়েক হাজার গুণ শক্তি এখনো জমা হয়ে আছে। ওই শক্তিটাও যে বের হবে, ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প সেটারই আলামত। ওই দিনের ভূমিকম্পটা ওই সংযোগস্থলেই হয়েছে।
ফলে আবশ্যিকভাবে বলা যায়, আগামীতে আরও বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সেটা কবে, কখন হবে, মৃদু, মাঝারি না বড় আকারে হবে, সে বিষয়ে কেউ কিছুই বলতে পারবে না। কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।
এখনো আতঙ্কে দেশের অধিকাংশ মানুষ
এখনো ভূমিকম্পের আতঙ্কে রয়েছেন দেশের অধিকাংশ মানুষ। তারা ভূমিকম্প না হলেও ভূমিকম্প টের পাচ্ছেন। অর্থাৎ মানুষ ট্রমায় পড়ছেন। ভয়ে অনেকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতেও ভয় পাচ্ছেন। গতকালের ভূমিকম্পেও ছোট বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ মানুষের অনেকেই আতঙ্কে চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন।
সোহেল হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার বাচ্চা ভোরে এমন চিৎকার দিয়ে জেগে উঠেছে, তাকে আমরা কিছুতেই থামাতে পারছি না।’ বনানী ঘোষ নামের একজন মধ্যবয়স্ক নারী বলেন, ‘আমার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা দরকার। কিন্তু ভূমিকম্পের আতঙ্কে আমি আসার সাহস পাচ্ছি না।’
ভূমিকম্পে করণীয়
বারবার ভূমিকম্পের পর এখনই করণীয় ঠিক করতে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের বিপদ বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে। এ জন্য জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা এবং সামাজিক মহড়ার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে তারা।
এ বিষয়ে ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা সম্ভব না, আগাম সংকেতও দেওয়া যাবে না; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব- যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’
একই বিষয়ে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা তো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি ভূমিকম্পে আতঙ্কিত না হতে। এ জন্য মহড়ার কোনো বিকল্প নেই। ভূমিকম্পের মহড়া নিয়মিত করতে হবে। বিভিন্ন গেমের মাধ্যমে এই বিষয়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
এটা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার কারণে আমি জানি ভূমিকম্পে কী করতে হবে। কিন্তু চর্চা না থাকায় আমিও ঘাবড়ে গিয়েছি। এ জন্যই নিয়মিত মহড়া করা দরকার।’
দুই সপ্তাহে ৫ বার ভূমিকম্প, আতঙ্কে নরসিংদীবাসী
নরসিংদী থেকে প্রতিনিধি শাওন খন্দকার শাহিন জানান, দুই সপ্তাহে জেলায় পাঁচবার ভূমিকম্প হয়েছে। এসব ভূমিকম্পের বেশির ভাগের উৎপত্তিস্থলই ছিল নরসিংদী।
বৃহস্পতিবার পঞ্চম দফায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল জেলার শিবপুরে। এতে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে জেলাবাসীর মধ্যে।
গত ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভবন, ঘোড়াশাল রেলসেতু ও মাটিতে ফাটল সৃষ্টি হয়। ওই দিন এ জেলায় শিশুসহ পাঁচজন মারা যান এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। নতুন করে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে আবার তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
প্রথম ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মাধবদীতে। যেখানে রয়েছে ১৬ তলা ভবনসহ অসংখ্য আবাসিক ভবন। ফলে স্থানীয়রা পরিবার-পরিজন নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন।
মাধবদী পৌরসভায় চাকরি করেন ফজলুল হক ও হানিফ মিয়া। তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, পরিবার নিয়ে তারা শঙ্কার মধ্যে আছেন। এর মাঝে ফজলুল হক আটতলা ভবনে বসবাস করেন। ভূমিকম্পের নাম শুনলে তিনি এখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আতঙ্কের মাঝেও নরসিংদীতে গতকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলেছে। তবে মাধবদী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ক্লাস করতে এসে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন অনেক শিক্ষার্থী।
এ সময় কথা হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘কলেজের পুরোনো ভবনে ফাটল ধরেছে। আমরা কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য শ্রেণিকক্ষের গেটগুলো খোলা রাখা হয়েছে।’
পাঁচ দফা ভূমিকম্পের পর নরসিংদীর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বহুতল ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মাধবদী বাজার ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ মো. রায়হান বলেন, ‘আমরা অগ্নিনির্বাপণে যেমন ভূমিকা রাখি। তেমনি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াই।’ তিনি যেকোনো দুর্যোগে আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেন।

Posted ৩:৩৯ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta