Home কক্সবাজার কক্সবাজার জেলার লক্ষাধিক দম্পতি এখনো পরিবার পরিকল্পনার বাইরে

কক্সবাজার জেলার লক্ষাধিক দম্পতি এখনো পরিবার পরিকল্পনার বাইরে

351
SHARE

শহীদুল্লাহ্ কায়সার(১০ জুলাই) :: কক্সবাজার জেলার এক লাখের অধিক সন্তান জন্মদানে সক্ষম দম্পতি এখনো পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির বাইরে। নবজাতক এবং প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার আনা যাচ্ছেনা শূন্য পর্যায়ে । নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না সুস্থ শিশুর জন্মদান। ফলে দিন দিন জেলার জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তেমনি মায়েদের মধ্যে মৃত এবং বিকলাঙ্গ শিশু জন্মদানের সংখ্যাও কমানো যাচ্ছে না।

এই অবস্থার মধ্যেই ১১ জুলাই জেলাব্যাপী পালিত হবে বিশ^ জনসংখ্যা দিবস। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ফ্যামিলি প্ল্যানিং এমপাওয়ারিং পিপল, ডেভেলপিং নেশন। এটি কার্যকর করতে সরকারের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র,মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং অন্যান্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কিশোরি, শিশু ও নারী স্বাস্থ্য সেবার উপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, বাল্য বিবাহ, অশিক্ষা, কু-সংস্কার, অপুষ্টি, অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রসবই মৃত সন্তন প্রসব, মাতৃ এবং নবজাতকের মৃত্যুর প্রধান কারণ।

যেসব দম্পতি পরিকল্পনা করে সন্তান গ্রহণ করেন না। গর্ভবতী মায়েরা সঠিক নিয়ম মেনে চলেন না। এ সংক্রান্ত সহায়তা তাঁর মা এবং অন্য কোন বয়স্ক নারীর কাছ থেকেই নিয়ে থাকেন। চিকিৎসক কিংবা এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করেন না। প্রসবের দায়িত্ব ছেড়ে দেন অপ্রশিক্ষিত ধাইয়ের উপর । নবজাতকের ঠিক মতো পরিচর্যা করতে জানেন না। তাদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি।

যদি প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব অর্থাৎ সন্তান গর্ভে আসার পর থেকে প্রসবকালীন সময় পর্যন্ত মায়েরা অন্তত ৪ বার চিকিৎসকের যান। হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা প্রশিক্ষিত ধাইয়ের সাহায্যে প্রসব করান। তাহলে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় শূন্য পর্যায়ে চলে আসবে। পাশাপাশি মৃত শিশু জন্মদান এবং জীবিত নবজাতকের মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও অনেক কমে যাবে।

এদিকে খোদ কক্সবাজার জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কাছেই জেলার নবজাতক ও প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর কোন সঠিক তথ্য নেই।

কার্যালয়টির উপ-পরিচালক ডাঃ পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য্যরে কাছে এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে বিবেচনা করা হয়। জেলার ক্ষেত্রে আলাদা কোন হিসাব রাখা হয় না। বর্তমানে সারাদেশে প্রতি বছর একহাজারের মধ্যে দুই জনেরও কম নবজাতক মারা যায়। জন্মের পরপরই শ^াসকষ্টের সমস্যা এবং সংক্রামক ব্যাধি জনিত কারণেই তাদের মৃত্যু হয়। ” জেলার ৮টি উপজেলার মধ্যে উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলাতে মৃত শিশু জন্মদান, নবজাতক এবং মাতৃমৃত্যুর হার বেশি বলেও জানান তিনি।

যদিও কক্সবাজার সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের কাছে এ সংক্রান্ত কিছু তথ্য রয়েছে। ওই তথ্যে দেখা গেছে, কক্সবাজার সদর উপজেলায় প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু, মৃত শিশুর জন্মদানের চেয়ে, নতুন জন্ম নেয়া শিশুর মারা যাওয়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে, অন্যান্য বছরের তুলনায় তা কিছুটা কমেছে মৃত শিশুর জন্মদান এবং নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা।

২০১৬ সালে যেখানে ৭৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। সেখানে চলতি বছরে ৯ জন শিশু মারা গেছে। অন্যদিকে ২০১৬ সালে ১৩ জন মৃত শিশুর জন্ম হলেও চলতি বছরে সেই সংখ্যা ১ জন। তবে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার গত বছরের (২০১৬) তুলনায় বেড়েছে। গত বছর যেখানে ৩ জন নারী সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। সেখানে চলতি বছরের অর্ধেক সময়েই অর্থাৎ জুন পর্যন্ত ৫ জন নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।

কক্সবাজার জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের গত দেড় বছরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে জেলাব্যাপী সন্তান জন্মদানে সক্ষম এমন ৪ লাখের অধিক দম্পতি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ১২ হাজারের মতো দম্পতি হাসপাতাল, চিকিৎসক, কিংবা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মীদের কাছ থেকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিতে এগিয়ে গেলেও প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়ে দম্পতিরা অনেক পিছিয়ে। যদিও এই সেবা পেতে কোন টাকা খরব করতে হয়না। কিন্তু অসচেতনতার অভাবেই দম্পতিরা প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করেন না। বর্তমানে জেলার মাত্র ১২ হাজার দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সেবা গ্রহণ করছেন। কিছু সংখ্যক দম্পতি ব্যক্তিগত খরচে এই সেবা গ্রহণ করলেও বেশিরভাগই রয়ে গেছেন প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার বাইরে।

জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণের চেয়ে জেলার দম্পতিরা অস্থায়ী পদ্ধতিতেই অধিক আগ্রহী। বর্তমানে আইইউডি,ইমপ্ল্যান্ট, খাবার বড়ি,ইনজেকশন,কনডম এই পাঁচ পদ্ধতিতে অস্থায়ীভাবে অনাকাঙ্খিত সন্তান জন্মদানের ঘটনা এড়ানো হয়। পাশাপাশি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে ভ্যাসেকটমি এবং টিউব্যাকটমিকে ব্যবহার করা হয়।  এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে শারীরিক মিলনের সময় কনডম ব্যবহার সর্বোত্তম। কিন্তু বেশিরভাগ পুরুষদের মধ্যে (বর্তমানে নারীদের কনডমও বাজারে পাওয়া যায়) কনডম ব্যবহারে রয়েছে অনীহা।

অস্থায়ী পদ্ধতিগুলোর মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও জেলার অধিকাংশ বিবাহিত নারীর কাছে অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ এড়াতে এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য মতে, গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসেই সর্বোচ্চ সংখ্যক (২৫৯৮ জন) নারী জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনের মাধ্যমের অনাকাঙ্খিন গর্ভধারণ এড়িয়েছেন। একই সময়ের মধ্যে কনডম ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ৭৮৮ জন।

কক্সবাজার সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সারওয়ার মাহবুব বলেন,“ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করলে মহিলাদের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। মোটা হওয়া, প্রেসার, কিডনিতে পাথর জমা থেকে শুরু করে চীরদিনের জন্য বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকিও রয়েছে এই পিলে।”

গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি নারীর টিউবেকটমিকরণের তুলনায় পুরুষের অর্থাৎ ভ্যাসেকটমিকরণের সংখ্যা বেশি। এই সময়ে জেলায় প্রায় সাড়ে ১২’শ পুরুষ ভ্যাসেকটমিকরণ করিয়েছেন। অন্যদিকে টিউবেকটমিকরণ করে সারাজীবনের জন্য স্বেচ্ছায় বন্ধ্যাত্বের পথ বেছে নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার নারী।

SHARE