Home স্বাস্থ্য বাংলাদেশে শিশুদের চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা মানছেন না চিকিৎসকরা

বাংলাদেশে শিশুদের চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা মানছেন না চিকিৎসকরা

329
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১৩ অক্টোবর) :: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় নিউমোনিয়ায়। এ রোগে মৃত্যুর হারও অনেক বেশি। বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশে সমস্যাটি আরো প্রকট। নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে তাই এর চিকিৎসা পদ্ধতির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

যদিও এ নীতিমালার সামান্যই অনুসরণ করছেন দেশের চিকিৎসকরা। রোগের তীব্রতা বিভাজন না করেই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন। এর ফলে আক্রান্ত শিশুর অবস্থা আরো জটিল হচ্ছে।

রোগটি গুরুতর (সিভিয়ার) হলে এক ধরনের এবং খুবই গুরুতর (ভেরি সিভিয়ার) হলে আরেক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে ডব্লিউএইচওর নীতিমালায়। গুরুতর হলে প্রথম পর্যায়ে অ্যামোক্সিসিলিন সেবনের কথা বলা হয়েছে। এতে কাজ না হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে সেফট্রিঅ্যাক্সন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আর খুবই গুরুতর হলে প্রথম পর্যায়ে অ্যাম্পিসিলিন বা বেনজাইল পেনিসিলিনের সুপারিশ করেছে ডব্লিউএইচও। তাতেও কাজ না হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে গিয়ে সেফট্রিঅ্যাক্সন ব্যবহারের কথা বলেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশে শিশুদের চিকিৎসায় এ নীতিমালার কতটা চিকিৎসকরা অনুসরণ করছেন, তা জানতে একটি গবেষণা পরিচালনা করে আইসিডিডিআর,বি, ব্র্যাক ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একদল গবেষক।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, নিউমোনিয়ার ধরন বিভাজন না করেই চিকিৎসকরা আক্রান্ত সব শিশুকেই একই মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন। এমনকি রক্তসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা না করেও আক্রান্ত শিশুর ব্যবস্থাপত্রে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন তারা।

বিষয়টি উদ্বেগের বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।তিনি বলেন, ডব্লিউএইচওর নীতিমালা মেনেই শিশুদের চিকিৎসা দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিকস অ্যাসোসিয়েশন ও নিউন্যাটাল অ্যাসোসিয়েশন তাদের সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চলছে। ব্যবস্থাপত্র ছড়া যাতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না হয়, সে ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন থেকে ফার্মেসিগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শিশুদের নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়ে আসছে বহু আগে থেকেই। এ প্রবণতা কোন দিকে, তা জানতে ঢাকার একটি বেসরকারি শিশু হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী ৮০টি শিশুর ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করেন গবেষকরা। গবেষণার আওতাধীন ২৮টি শিশু ছিল কম ওজনের। ১৪টি শিশুর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম। আর ১৩টি শিশুর ওজন ভয়াবহ রকমের কম।

ডব্লিউএইচওর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ৪৩টি শিশুর নিউমোনিয়ার মাত্রা ছিল গুরুতর। বাকি ৩৭টি শিশু খুবই গুরুতর মাত্রায় নিউমোনিয়ায় ভুগছিল।

তাদের ওপর প্রয়োগ করা চিকিৎসা পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তির পর একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকও শিশুদের দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপত্রে লেখা হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। একই ওষুধ দেয়া হয় হাসপাতালে ভর্তির আগেও। সেবনযোগ্য অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি ইনজেকশনও ছিল সেখানে।

রোগের শুরুতে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া গুরুতর অপরাধ বলে মন্তব্য করেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল মান্নান।

তিনি বলেন, এসব অ্যান্টিবায়োটিকে রোগী সুস্থ না হলে দ্বিতীয় কোনো ওষুধ কাজে আসবে না। আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত। দেশের অনেক চিকিৎসক নিজেদের আর্থিক সুবিধার কারণে স্বল্পমাত্রার পরিবর্তে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করছেন।ঢাকার বাইরে শিশুদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার আরো অনিয়ন্ত্রিত।

দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মোট নির্দেশিত অ্যান্টিবায়োটিকের ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ সিফালোস্পরিন। এর মধ্যে কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ৮৩ শতাংশ ব্যবস্থাপত্রে অযৌক্তিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন চিকিৎসকরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিকস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. সৈয়দ খায়রুল আমিন বলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে। তবে তা হতে হবে ডব্লিউএইচওর নীতিমালা অনুযায়ী। রোগ নির্ণয় ছাড়া যাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা না হয়, খেয়াল রাখতে হবে সেদিকেও।

শিশুদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ডব্লিউএইচওর নীতিমালা অনুসরণের কথা বলা হলেও ওই ৮০ শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়ে আইসিডিডিআর,বি, ব্র্যাক ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গবেষকরা দেখেছেন ভিন্ন চিত্র। তাদের গবেষণার ফলাফল বলছে, ৫০ শতাংশ শিশুর ব্যবস্থাপত্রেই সেফট্রিঅ্যাক্সন লেখা হয়।

এছাড়া ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুকে দেয়া হয় এমিকাসিন, ৮ দশমিক ৮ শতাংশকে সিফুরক্সিম, ৭ দশমিক ৫ শতাংশকে সেফটাজিডিমের সঙ্গে এমিকাসিন ও ৩ দশমিক ৮ শতাংশের সেফট্রিঅ্যাক্সনের সঙ্গে এমিকাসিন। ২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুকে দেয়া হয় মেরোপেনেম অ্যান্টিবায়োটিক, ২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর ব্যবস্থাপত্রে লেখা হয় সেফিপাইম ও বাকি ২ দশমিক ৫ শতাংশের সেফোট্যাক্সাইম।

ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে গবেষকরা ওই ৮০ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করেন ২০১২ সালের ১৩ থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত। সংগৃহীত এ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি গবেষণা প্রতিবেদনটি চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেডিকেল জার্নাল ডাভ মেডিকেল প্রেসে গৃহীত হয়। ২০১২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হলেও পরিস্থিতি এখনো একই রকম বলে মনে করছেন গবেষকরা।

SHARE