Home ধর্ম হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ইতিহাস

হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ইতিহাস

1091
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১ নভেম্বর) :: হিন্দুধর্ম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ধর্ম তবে হিন্দু নামটি আধুনিকালের দেওয়া। এর প্রাচীন নাম হল সনাতন ধর্ম। আবার এই ধর্ম বৈদিক ধর্ম নামেও পরিচিত। এই ধর্ম বেদ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

(খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০০-২৬০০) অব্দের দিকে যখন হাপ্রান যুগ ছিল ঠিক সেই সময়ই এ ধর্মের গোড়ার দিক।

অনেকের মতে খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ অব্দ। কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে অর্থ জাতিগোষ্ঠি ইউরোপের মধ্য দিয়ে ইরান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০-২৪০০ অব্দের মধ্যে তারাই ভারতে বেদ চর্চা করতে থাকে এবং তারা সমগ্র ভারতে তা ছড়িয়ে দেয়। আর্য জাতিগোষ্ঠিরা অনেক নিয়ম কানন মেনে চলত।

তারা চারটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল এরা হলঃ ব্রাক্ষন,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শদ্র। এই সম্প্রদায়গুলো তৈরি করার অন্যতম কারন হল কাজ ভাগ করে নেওয়া এক এক সম্প্রদায় এর লোক এক ধরনের কাজ করবে।

অনেকের মতে হিন্দু শব্দটি আর্যদেবকে আফগানিস্তানের বাসিন্দা বা আফগানেরা দিয়েছে তারা সিন্দু নদের তীরবর্তী সনাতন ধর্মের সাধু সন্ন্যাসিদেরকে হিন্দু বলত আর এই ভাবেই হিন্দু নামটি এসেছে।

বৈদিক সভ্যতায় অর্থ্যাৎ ঐ আমলে কোন মূর্থি পূজা করা হতো না। সেই সময়ে হিন্দুদের প্রধান দোতা ছিলেন ইন্দ্র ,বরুন ,অগ্নি এবং সোম । তখন কার ঈশ্বর আরাধনা হত যজ্ঞ এবং বেদ পাঠের মাধ্যমে। সকল কাজের আগে যজ্ঞ করা ছিল বাজ্জনীয়। সে আমলে কোন মূতি বা মন্দির ছিল না।

হিন্দু ধর্মের দেবতা ও অবতারগনঃ-

ইন্দ্র

ইন্দু পূরানে স্বর্গের দেবতাদের রাজা। তার রানীর নাম শষীদেবী এবং হাতীর নাম ঐরাবত। তার বাহন পুষ্পক রথ। মূলত ইন্দ্র কোন বিশেষ দেবতা নন। যিনি স্বর্গের রাজা হন তিনিই ইন্দ্র। ইন্দ্রের বিশেষ অস্ত্র হল বজ্র।

অগ্নি
অগ্নি হলেন একজন হিন্দু দেবতা। তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদিক দেবতা। অগ্নি আগুনের দেবতা এবং যজ্ঞের গ্রহীতা। অগ্নিকে দেবতাদের বার্তাবহ মনে করা হয়। তাই হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যজ্ঞকালে অগ্নির উদ্দেশ্যে আকুতি প্রদান করলে সেই আহুতি দেবতাদের কাছে পৌছে যায়। অগ্নি চিরতরুন, কারন আগুন প্রতিদিন নতুন করে জ্বালানো হয় এবং তিনি অমর।

নারায়ন
নারায়ন হলেন বৈদিক সর্বোচ্চ উপাস্য। বৈষবধর্শে তাকে “পুরুষোত্তম” বা শ্রেষ্ট পুরুষ মনে করা হয়। তিনি বিষ্ণু বা হরি নামেও “পুরুষোতম” বলা হয়েছে। পরম উপাস্যের ব্যাপী সত্ত্বাটি নারায়ন নামে পরিচিত। তিনিই ঋগেদের পুরুষসূত্রে উল্লেখিত পুরুষ। যজুবেদের নারায়ন সূক্তের পঞ্চম শ্লোকে নারায়নকে ব্রক্ষান্ডের ভিতরে ও বাইরের সব কিছুর মধ্যে পরিব্যাপ্ত সত্বা বলে উল্লেখ্য করা হয়েছে।

নারায়ন শব্দের অর্থ যিনি জলের উপর শয়ন করে। হিন্দুশাস্ত্রমতে জল প্রথম সৃষ্ট বস্ত, তাই সৃষ্টিকর্তা নারায়ন জলেই বাস করেন। সংস্কৃত ভাষায় “নর” শব্দের অর্থ মানুষ। তাই নারায়ন শব্দের অন্য অর্থ হল “মানুষ যেখানে আশ্রয় গ্রহন করে। ভাগবত পূরানে নারায়নকে বলা হয়েছে পরব্রক্ষ বা সর্বোচ্চ উপাস্য। পূরান মতে, তিনি অসংখ্যা জগৎ সৃষ্টি করে। প্রতিটি জগতে জগদীশ্বর রূপে প্রবেশ করেছেন।

ব্রক্ষা রূপে রজ

গুন অবলম্বন করে তিনি চোদ্দটি জগৎ সৃষ্টি করেছেন। বিষ্ণু রুপে সত্ব গুন অবলম্বন করে তিনি সেগুলো রক্ষা করেন এবং শিব রুপে তমঃ গুন অবলম্বন করে তিনি তা ধ্বংস করেন, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী ত্রিমূতি ও নারায়ন অভিন্ন। নারায়নের অপর নাম “ মুকুন্দ” এই মব্দের অর্থ যিনি জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি প্রদান করেন।

ব্রহ্মা
ব্রহ্ম হিন্দুধর্মের সৃষ্টির দেবতা। বিষ্ণু ও শিবের সঙ্গে তিনি ত্রিমূর্তিতে বিরাজমান। তিনি অবশ্য হিন্দু বেদান্ত দর্শনের সর্বোচ্চ দিব্যসত্বা ব্রক্ষের সমরুপ নন। বরং বৈদিক দেবতা প্রজাপতিকে ব্রক্ষা সমরুপ বলা চলে। বিদ্যাদেবী সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী। সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রহ্মা প্রজাপতিদের সৃষ্টি করেন। এই প্রজাপতিরাই মানব জাতির আদি পিতা। মনুসংহিতা গ্রন্থে এই প্রজাপতিদের নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরস, পুলস্ত,পুলহ, ক্রভুজ, বশিষ্ঠ, প্রচেতস বা দক্ষ ভৃগু ও নারদ। সপ্তষি নামে পরিচিত সাত মহান ঋষির শ্রষ্টা ব্রহ্মা। এরা তাকে বিশ্বসৃষ্টির কাজে সহায়তা করেন। তার এই পুত্রগন তার শরীর থেকে জাত হননি, হয়েছেন তার মন থেকে। এই কারনে তাদের মানসপুত্র বলা হয়।

সরস্বতী

জ্ঞান, সঙ্গীত ও শিল্প করতর হিন্দু দেবী ঋগেদে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন পত্নী এবং লক্ষী ও পারবতীর সঙ্গে একবেগে ত্রিদেবী নামে পরিচিত। এই ত্রিদেবী যথাক্রমে ত্রিমূর্তি সৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষা, পালনকর্তা বিষ্ণু ও সংহার কর্তা শিবের পত্নী। হিন্দুদের বিশ্বাস সরস্বতী প্রাচীনতম হিন্দু ধর্মগ্রন্থবেদ প্রসব করেন।

বিষ্ণু

বিষ্ণু হিন্দু বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা আদি শংকর। পন্ডিতদের মতে বিষ্ণু ইশ্বরের পাঁচটি প্রধান রুপের অন্যতম। বিষ্ণুকে পরমাত্মা ও পরমেম্বর বলে ঘোষনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থে তাকে সর্বজীব ও সর্ববস্তুতে পরিব্যপ্ত সত্বা, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তথা অনাদি অনন্ত সময়ের প্রভু, সকল অস্তিত্বের সূষ্টা ও ধ্বংসকারী, বিশ্বচরা চরের ধারক ও শাসক এবং বিশ্বের সকল বস্তুর উৎসপুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরানে বিষ্ণুর দশাবতারেরও বর্ণনা রয়েছে। বিষ্ণুর এই দশ প্রধান অবতারের মধ্যে নয় জনের জন্ম অতীতে হয়েছে এবং এক জনের জন্ম ভবিষ্যতে কলিযুগের শেষলগ্নে হবে বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বিষ্ণু সহ্রানামে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার উক্তিতে বিষ্ণুর সহ কোটি যুগ ধারিনে বলে উল্লেখ্য করা হয়েছে। এর অর্থ বিষ্ণুর অবতারগন সকল যুগেই জন্মগ্রহন করে থাকেন। ভগবতী গীতা অনুসারে ধর্মের পালন এবং দুষ্টের দমন ও পাপীর প্রানের জন্য বিষ্ণু অবতার গ্রহন করেন। হিন্দুদের প্রায় সকল শাখাসম্প্রদায়ে বিষ্ণুকে বিষ্ণু বা রাম, কৃষ্ণ প্রমুখ অবতারের রুপে পূজা করা হয়।

লক্ষী
লক্ষী হলেন একজন হিন্দু দেবী , তিনি ধনসম্পদ আধ্যাতিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। তিনি বিষ্ণুর পত্মী। তার অপর নাম মহালক্ষী। লক্ষী ছয়টি বিশেষ গুনের দেবী। তিনি বিষ্ণুর শক্তির উৎস। বিষ্ণু রামও কৃষ্ণ রুপে অবতার গ্রহন করেন, লক্ষী সীতা ও রাধা রুপে তাদের সঙ্গিনী হন। কৃষ্ণের দুই স্ত্রী রুক্সিনী ও সত্যভামাও লক্ষী অবতার রুপে কর্পিত হন। লক্ষী পূজা অধিকাংশ হিন্দুর গৃহেই অনুষ্ঠিত হয়। দীপাবলি ও কোজাগরী পূর্নিমার দিন তার বিশেষ পূজা হয়। বাঙ্গালী হিন্দুরা প্রতি বৃহস্পতির লক্ষীপূজা করে থাকেন।

শিব

শিব একজন হিন্দু দেবতা। তিনি ত্রিমূর্থির অন্যতম। ত্রিমূর্তির শিব ধ্বংসের প্রতীক। হিন্দুধর্মের শৈব শাখা সম্প্রদায়ের মতে, শিবই হলেন সর্বোচ্চ ঈশ্বর। যে সকল হিন্দুধর্মাবলম্বী শিবকেই প্রধান দেবতা মনে করে তার পূজা করেন তারা শৈব নামে পরিচিত। শিবকে সাধারণত বিমূর্ত শিবলিঙ্গের রুপ পূজা করা হয়। তার মূর্তির মধ্যে ধ্যানমগ্ন অবস্থা বা মায়াসুরের পিঠে তান্ডবনৃত্যরত অবস্থায় মূর্তি বেশি প্রচলিত। শিব অপর দুই প্রদান হিন্দু দেবতা গনেশ ও কার্তিকের পিতা।

পার্বতী

পাবর্তী হলেন হিন্দু দেবী দুর্গার একটি রুপ। তিনি শিবের স্ত্রী এবং আদি পরাশক্তির এক পূর্ণ অবতার। অন্যান্য দেবীরা তার অংশ থেকে জাত বা তার অবতার। পরবর্তী মহাশক্তির অংশ। তিনি ঘৌরি নামেও পরিচিত পারবর্তী শিবের দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে তিনি শিবের প্রথমা স্ত্রী দাক্ষায়নীরই অবতার। তিনি গনেশ ও কার্তিকের মা। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে তাকে বিষ্ণুর ভগীনী মনে করা হয়। পাবর্তী হিমালয়ের কণ্যা। শিবের পাশে তার যে, মূর্তি দেখা যায় সেগুলো দ্বিভূজা। সাধারণত তাকে দয়াময়ী দেবীর রুপেই দেখা হয়। তবে তার কয়েকটি ভয়ংকরী মূর্তিও আছে। তার দয়াময়ী মূর্তিগুলো হল কাত্যায়নী, মহাগৌরী, কমলাত্মিকা, ভুবনেশ্বরী ও ললিতা। অন্যদিকে তার ভয়ংকারী রুপগুলো হল দূর্গা, কালী, তারা চন্ডী, দশমহাবিদ্যা ইত্যাদি।

দাক্ষয়নী

দাক্ষায়নী হিন্দুধর্মে বৈবাহিক সুখ ও দাম্পত্যজীবনের দেবী। হিন্দু নারীরা সাধারণত স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় সতীর পূজার করে থাকেন। সতী দেবীর এক রুপ। তিনি শিবের প্রথমা স্ত্রী। হিন্দু পুরান অনুসারে তিনি তপস্বীয় জীবনযাত্রা থেকে শিবকে বের করে আনেন এবং গৃহী করেন। দক্ষষজ্ঞের সময় স্বামীর অসম্মান সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। পরে হিমালয়ের গৃহে কন্যা পাবর্তীর রুপে জন্ম নিয়ে পুনরায় শিবকে বিবাহ করেন। দাক্ষায়নীর অপরাপর নামগুলো হল উমা, অপর্না, শিবকামিণী ইত্যাদি।

SHARE