Home প্রযুক্তি হ্যাকিংয়ের হাত থেকে স্মার্টফোন বাঁচার উপায়

হ্যাকিংয়ের হাত থেকে স্মার্টফোন বাঁচার উপায়

298
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৩ নভেম্বর) :: দিনে দিনে স্মার্টফোন হয়ে উঠছে আমাদের প্রতিদিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রিয় স্মার্টফোনটি ছাড়া আমরা একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না। এই স্মার্টফোনটি দিয়েই আমরা কত রকমের কাজ করি।

এটিই আমাদের ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটস এপ ইত্যাদি বিভিন্ন সোস্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাপগুলোর মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে যুক্ত করে। শুধু তা-ই নয়, স্মার্টফোনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা-পয়সা লেনদেনও করা যায়।

কিন্তু আপনি জানেন কি, খুব সহজেই হ্যাক হয়ে যেতে পারে আপনার প্রিয় স্মার্টফোনটি? হ্যাক হয়ে যেতে পারে আপনার বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং একাউন্টগুলো! চুরি হয়ে যেতে পারে আপনার ফোনের ছবি, ভিডিও কিংবা মোবাইল ব্যাংক একাউন্টের তথ্য।

আজকাল প্রায়ই স্মার্টফোন হ্যাকিংয়ের খবর শোনা যায়। এসব হ্যাকিংয়ের অন্যতম প্রধান শিকার হচ্ছে নারীরা। হ্যাকাররা হ্যাক করছে তাদের স্মার্টফোন। এরপর তাদের ফোনের তথ্য বা ব্যক্তিগত ছবি চুরি করে ব্লাকমেইল করছে, দাবি করছে মোটা অংকের টাকা।

যেকোন মুহূর্তে হ্যাক হয়ে যেতে পারে আপনার স্মার্টফোনটি! Source: hackingloops.com

তাই এমন বিপদ এড়িয়ে চলতে আমাদের জানতে হবে স্মার্টফোন হ্যাকিং সম্পর্কে। জানতে হবে কীভাবে বাঁচা যায় হ্যাকিংয়ের হাত থেকে। আর এ সম্পর্কে আপনাদেরকে জানানোর জন্যই আজকের এই আয়োজন।

স্মার্টফোন হ্যাকিং

স্মার্টফোন হ্যাকিং হলো অবৈধভাবে কারো স্মার্টফোনে অনুপ্রবেশ করে সেই ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে একজন হ্যাকার ভিকটিমের ফোনটি বিভিন্ন উপায়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং এরপর ফোনটি থেকে তার নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করে।

স্মার্টফোনটি হ্যাক হয়ে যাওয়ার পর হ্যাকার ফোনটি দিয়ে যা খুশি তা-ই করতে পারে। কোনো ফাইল, ছবি, অডিও, ভয়েসকল, টেক্সট মেসেজ সবকিছুই হ্যাকার চুরি করে নিতে পারে ভিকটিমের ফোন থেকে।

হ্যাকার আপনার স্মার্টফোনটি হ্যাক করে খুব সহজেই চুরি করে নিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য; Source: technofaq.com

আমাদের দেশের মানুষ হ্যাকিংয়ের সাথে মোটামুটি পরিচিত হলেও স্মার্টফোন হ্যাকিং নিয়ে অনেকের মধ্যেই অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, স্মার্টফোন হ্যাক করা অনেক কঠিন একটি কাজ। এটা শুধু পৃথিবীর বড় বড় হ্যাকাররাই পারেন।

তাই এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবটি আসলে এমন নয়। আজকাল প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে অনেক নতুন নতুন অ্যাপ, নতুন নতুন সুবিধা পেয়েছি আমরা। ফলে আমাদের জীবন যেমন কিছুটা সহজ হয়েছে তেমনি পড়েছে অনেক ঝুঁকির মুখেও। তাই যেকোনো মুহূর্তে হ্যাক হয়ে যেতে পারে আপনার কিংবা আমার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি!

যেভাবে হ্যাক করা হয় স্মার্টফোন

একটি স্মার্টফোন অনেক ভাবেই হ্যাক হতে পারে। তবে বর্তমানে স্মার্টফোন হ্যাকিংয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় RAT বা Remote Administration Tool। RAT হচ্ছে এক ধরনের সফটওয়্যার বা অ্যাপ যা হ্যাকার যেকোনো উপায়ে ভিকটিমের কাছে পাঠায়। ভিকটিম এই সফটওয়্যারটি ইন্সটল করলেই হ্যাকার ভিকটিমের কম্পিউটার বা ফোনের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়।

অ্যাপটি যাতে আপনি আপনার ফোনে ইন্সটল করেন এজন্য হ্যাকার অ্যাপটিকে অন্য একটি নিরীহ চেহারার অ্যাপের সাথে যুক্ত করে করে দেয়। আপনি যখন নিরীহ অ্যাপটিকে ফোনে ইন্সটল করেন, ঠিক তখনই এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর RAT-টিও আপনারে ফোনে গোপনে ইনস্টল হয়ে যায়। RAT সহ নিরীহ অ্যাপটিকে বলা হয় ট্রোজান হর্স।

ছবির ট্রোজান হর্সের মতই বাহিরে নিরীহ কিন্তু ভিতরে ক্ষতিকর RAT-গুলো; Source: wikimedia.org

ট্রোজান হর্স বা ট্রয়ের ঘোড়া টার্মটি এসেছে বিখ্যাত গ্রীক মিথোলজি থেকে। গ্রীক মিথোলজির বর্ণনা অনুসারে, গ্রীক সৈন্যরা ট্রয় নগরী দখল করার জন্য বেশ বড়সড় একটি কাঠের ঘোড়া তৈরি করে তা ট্রয়ের কাছাকাছি একটি জায়গায় রেখে আসে। ট্রয় নগরবাসী গ্রীক সৈন্যরা ভয় পেয়ে চলে গেছে ভেবে তাদের ফেলে যাওয়া নিরীহ চেহারার ঘোড়াটি শহরের মধ্যে নিয়ে আসে। কিন্তু গ্রীক সৈন্যদের রেখে যাওয়া ঘোড়াটি দেখতে নিরীহ চেহারার হলেও এর ভিতরে লুকিয়ে ছিলো গ্রীক সৈন্যরা।

রাতে শহরের মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে ঘোড়ার ভিতর থেকে গ্রীক সৈন্যরা বের হয়ে দখল করে নেয় পুরো ট্রয় নগরী। এভাবে ট্রয় নগরীর পতন হয়। স্মার্টফোনের এই ট্রোজান হর্সটিও ঠিক একইভাবে কাজ করে। নিরীহ দর্শন অ্যাপটি থেকেই বের হয়ে আসে ক্ষতিকর RAT আর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ভিকটিমের ফোনটির। সমস্ত প্রক্রিয়াটি ঘটে এভাবে-

মনে করুন, আমাদের ভিকটিম মজার কোনো গেম খেলতে পছন্দ করেন। এখন এই ভিকটিমের ফোন হ্যাক করার জন্য-

  • প্রথমে হ্যাকার ভিকটিমের পছন্দের কোনো গেমের সাথে তার নিজের কনফিগার করা RAT-টি যুক্ত করে।
  • এরপর হ্যাকার এই ক্ষতিকর RAT যুক্তটি অ্যাপটি কোনোভাবে ভিকটিমের ফোনে ইনস্টল করায়। এক্ষেত্রে হ্যাকার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্য নিতে পারে। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে হ্যাকার আপনাকে কোনোভাবে অ্যাপটি ইনস্টল করতে প্রলুব্ধ করবে। আমাদের উপরের ভিকটিমের ক্ষেত্রে ধরুন হ্যাকার ভিকটিমকে বললো, “এসে গেছে এ বছরের সবচেয়ে মজার গেম “X”। গেমটি খেলতে অনেক মজার, সাইজেও অনেক ছোট। আপনার সব বন্ধুরাও খেলছে এটি। আপনিও তাদের সাথে যোগ দিতে এখনই গেমটি ডাউনলোড করে ইনস্টল করে নিন এখান থেকে- (ট্রোজান হর্সটির লিংক)”
  • ভিকটিম যখন উপরের ফাঁদে পা দিয়ে গেমটি তার ফোনে ইনস্টল করবেন ঠিক তখনই গেমের সাথে সাথে তার ফোনে ইনস্টল হয়ে যাবে হ্যাকারের পাঠানো RAT। এক্ষেত্রে RAT-টির কোনো আইকন ভিকটিমের অ্যাপ লিস্টে থাকবে না। ভিকটিম RAT-টি ফোনের কোথাও খুঁজে পাবেন না।
  • ভিকটিমের ফোনে একবার RAT ইনস্টল হয়ে গেলেই হ্যাকারের উদ্দেশ্য সফল। এখন ভিকটিম তার ফোনের ইন্টারনেট চালু করলেই হ্যাকারের কন্ট্রোল প্যানেলে ভিকটিমের ফোনটি দেখতে পাবে। আর সেই সাথে পেয়ে যাবে ভিকটিমের ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

হ্যাকার RAT দিয়ে কী কী কাজ করতে পারে

একটি এন্ড্রয়েড RAT এর কন্ট্রোল প্যানেল; Source: droidjack.net

  • হ্যাকার ভিকটিমের ফোনের সকল ফাইল দেখতে ও কপি করে নিতে পারবে।
  • ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারবে।
  • ফোনের সকল SMS ও ইমেইল পড়তে পারবে। ফলে ভিকটিমের ইমেইল একাউন্ট, ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি একাউন্ট খুব সহজে হ্যাক করতে পারবে হ্যাকার।
  • ফোনে সেভ করা সকল ফোন নাম্বার দেখতে ও কপি করতে পারবে।
  • ফোনের সকল ছবি, ভিডিও দেখতে ও কপি করতে পারবে।
  • ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে ভিকটিম যে অবস্থায় ফোন ব্যবহার করছে সেই অবস্থার লাইভ ছবি ও ভিডিও রেকর্ড করে নিতে পারবে।
  • ভিকটিমের সকল ভয়েস কল রেকর্ড করতে পারবে ও শুনতে পারবে।
  • ফোনের যেকোনো অ্যাপ ইনস্টল, আনইনিস্টল ও ওপেন করতে পারবে।
  • ফোন থেকে ভিকটিমের অজান্তেই অন্য নাম্বারে কল ও মেসেজ পাঠাতে পারবে।
  • ভিকটিমের ফোনের মডেল ফোন, নাম্বার ইত্যাদি তথ্য জানতে পারবে।
  • সবশেষে, হ্যাকারের উদ্দেশ্য সফল হয়ে গেলে ভিকটিমের ফোন থেকে ক্ষতিকর RAT-টি রিমুভ করে নিতে পারবে। এতে ভিকটিমের ফোনে আর হ্যাকারের কোন চিহ্ন থাকবে না।

তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝেছেন শুধু একটি অ্যাপ ইনস্টলের মাধ্যমে হ্যাকার আপনার ফোনটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিতে পারে। আবার সবশেষে নিজের দুষ্কর্মের চিহ্নটাও সরিয়ে ফেলতে পারে ফোন থেকে। তাই এর থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সতর্ক হতে হবে। এখন চলুন জেনে নেই হ্যাকিংয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে কী কী করতে পারি আমরা।

হ্যাকিংয়ের হাত থেকে বাঁচার উপায়

ফোনটি অন্যের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে প্যাটার্ন কিংবা পাসকোড দিয়ে লক করে রাখুন; Source: imore.com

  • কোনোভাবেই অপরিচিত বা সন্দেহজনক কোনো সোর্স থেকে কোনো অ্যাপ ফোনে ইনস্টল করা যাবে না। কোনো অ্যাপ ইনস্টল করতে এন্ড্রয়েড ফোনের জন্য গুগল প্লে স্টোর আর আইফোনের জন্য অ্যাপস্টোর ব্যবহার করুন। আর যদি ফোনে প্লে স্টোর না থাকে সেক্ষেত্রে apkmirror, apk-dl এর মত নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
  • ফোনের ওয়াইফাই ও ব্লুটুথ কখনোই অপ্রয়োজনে চালু রাখবেন না। আমরা প্রায় সবাই এক ফোন থেকে অন্য ফোনে কোনো কিছু আদান প্রদান করতে ‘শেয়ারইট’ অ্যাপটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু অনেক ফোনে এই অ্যাপটি ব্যবহার শেষ হওয়ার পরও ওয়াইফাই কিংবা হটস্পট চালু থাকে। তাই এই অ্যাপ ব্যবহার শেষে ওয়াইফাই চালু থাকলে অফ করে নিন।
  • ফেসবুক, হোয়াটস এপ প্রভৃতি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে প্রাপ্ত কোনো অপরিচিত লিংক থেকে কিছু ডাউনলোড করবেন না।
  • হ্যাকিংয়ের প্রক্রিয়াটি ঘটার জন্য ভিকটিমের ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ চালু থাকা প্রয়োজন। তাই প্রয়োজন ছাড়া ইন্টারনেট চালু না রাখলে এড়াতে পারবেন ফোন হ্যাক হওয়ার সম্ভবনা।
  • ফোনে এন্টিভাইরাস ইনস্টল করে রাখতে পারেন। যদিও এই ধরনের হ্যাকিং প্রতিরোধে এন্টিভাইরাসগুলো খুব একটা কাজে আসে না।
  • ফোনটি প্যাটার্ন কিংবা পাসকোড দিয়ে লক রাখুন। হ্যাকিং এড়াতে ফিংগারপ্রিন্ট লক কিংবা ফেসলক পদ্ধতিগুলো খুব একটা কাজের না। কারণ জরুরী প্রয়োজনে হ্যাকার খুব সহজেই আপনার ব্যবহারিত জিনিস থেকে আপনার ফিংগার প্রিন্ট নকল করে ফিংগার প্রিন্ট লক এবং আপনার যেকোনো ছবি দিয়ে ফেস লক খুলতে পারবে।
  • অপরিচিত ফ্রি পাবলিক ওপেন ওয়াইফাই হটস্পটগুলোতে ফোন কানেক্ট করবেন না। কারণ ওয়াইফাই হটস্পটে কানেক্টেড ফোনগুলো হ্যাকার ‘ম্যান ইন দি মিডল’ পদ্ধতিতে হ্যাক করতে পারে।
  • শেষ কথা, ফোনে এমন কোনো স্পর্শকাতর কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি রাখবেন না যেগুলো অন্যের হাতে পড়লে আপনার ক্ষতি হতে পারে।

উপরের নিয়মগুলো মেনে চললে আমরা সহজেই আমাদের স্মার্টফোনটিকে বাঁচাতে পারবো হ্যাকিংয়ের হাত থেকে। আর তার সাথে আমাদেরকে স্মার্টফোন ব্যবহারে হতে হবে আরেকটু বেশি সতর্ক।

SHARE