Home ধর্ম দেশান্তরী হচ্ছেন হিন্দুরা

দেশান্তরী হচ্ছেন হিন্দুরা

572
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৭ নভেম্বর) :: চন্দ্রধর দাসের দোকানটি ছিল নাসিরনগর সদরের থানা রোডে। নাম মা লন্ড্রি এন্ড মোবাইল টেলিকম। বেশ ভালোই চলছিল। প্রতিদিন কমপক্ষে হাজার বারশো টাকার ব্যবসাও হতো।

কিন্তু ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলায় চন্দ্রধর দাসের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। এদিন তার বাড়িতেও হামলা হয়। ভয়ে দোকান বন্ধ করে পালিয়েছিলেন। আর এতেই পাল্টে যায় জীবনের সহজ-সরল গতিপথ।

যে সমাজে তিনি বড় হয়েছেন, ছোটবেলা গড়াগড়ি দিয়ে শরীরে যে রাস্তার ধুলো মেখেছেন- তার সবকিছুই একমুহূর্তে চন্দ্রধরের অচেনা হয়ে যায়। সেদিন হামলার পর থেকে যে কদিন দেশে ছিলেন সে ক’দিনই তার মন বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠেছিল।

যখনই খুব কাছের কাউকে একান্তে, নিরিবিলিতে পাশে পেয়েছেন তাকেই শুধিয়েছেন- এই দেশ আমার নয়, এই দেশ হিন্দুদের নয়। এই দেশে হিন্দুদের পেটালে, হিন্দুদের ঘরে আগুন লাগালে, ভেঙে দিলে কোনো বিচার হয় না। আমি এই পোড়া দেশে আর থাকব না, চলে যাব হিন্দুস্থানে।

এসব কথা যে সত্যি সত্যি ঘটিয়ে ফেলবেন চন্দ্রধর তা একটুও আঁচ করতে পারেননি রবীন্দ্র দেব (ছদ্মনাম)। মূল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই রবীন্দ্র দেব আলাপকালে বলেন, যে দোকানের ব্যবসার আয়ের মাধ্যমে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও মাকে নিয়ে হাসি-আনন্দে জীবনের অষ্টপ্রহর কেটে যেত সেই দোকানই অনেকটা পানির দরে কাউকে জানতে না দিয়ে হঠাৎ বিক্রি করে দিয়েছিলেন চন্দ্রধর দাস।

হতভাগা চন্দ্রধর শুধু দোকান নয়, বেচে দিয়েছিলেন আড়াই শতাংশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটিও। দোকান ও বাড়ি বিক্রি করে চন্দ্রধর দাস সন্তান ও মাকে সঙ্গে করে গত জুন মাসে সস্ত্রীক দেশান্তরি হয়ে চলে গেলেন ভারতের আগরতলায়।

যাওয়ার আগেরদিনের গোধূলিবেলায় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। দেখা হতেই হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন চন্দ্রধর। কেঁদেছিলেন চন্দ্রধরের মা ও স্ত্রী। সন্তান দুটো ৫ বছরের নিচে হওয়ার তারা দেশান্তরি হওয়ার দুঃখ বুঝতে পারেনি। তারা শুধু একবার বাবার দিকে আরেকবার মায়ের দিয়ে তাকিয়ে সময় পার করেছিল।

চন্দ্রধর স্ত্রীকে নিয়ে দেশান্তরি হওয়ার পর রোববার নাসিরনগরের কাশিপাড়ার ভিটেমাটি ছেড়েছেন সস্ত্রীক রথি দাস। চন্দ্রধর দাসের দেশান্তরি হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন রবীন্দ্র দেবের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও, আর রথি দাসের ভিটেমাটি ছাড়ার খবরটি নিশ্চিত করেন তারই আপন ছোটভাই রেবতি দাস।

‘কাশি’ শব্দটি শুনলেই হিন্দুদের পবিত্র তীর্থভূমি ‘গয়াকাশি’র কথা মনে জেগে ওঠে। সেখানে গেলে শরীরে যেন এক আলাদ পরশ লাগে। যে পরশ জীবনে অন্য অনুভূতি এনে দেয়। কিন্তু গতকাল নাসিরনগরের কাশিপাড়াতে গিয়ে কষ্টের অনুভূতি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি। পাড়ার প্রতিটি বাড়ি থেকেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেছে। যে শ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে একদলা কষ্ট।

পাড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চন্দ্রধর দাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সুরেশ চক্রবর্তী নামে এক ব্রাহ্মণ পরিবার এখন ভাড়া থাকছেন। বাড়িটির মালিক একজন মুসলমান। ক’দিন আগেও এই বাড়িতে চন্দ্রধর দাস থাকতেন। এখন ভাড়াটিয়া ব্রাহ্মণ দম্পতি। এই ব্রাহ্মণ পরিবারেরও রয়েছে করুণ ইতিহাস। কিঞ্চিৎ সুখে থাকার জন্য ক’দিন আগে নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন স্থানীয় আরেক মুসলমানের কাছে।

কতটুকু অসহায় হলে নিজের বাড়ি বিক্রি করে একই পাড়ায় ভাড়া থাকেন দম্পতি তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না।  খুব একটা আলাপ না করলেও তার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন তিনিও দেশান্তরি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কাশিপাড়ার একাধিক বাসিন্দা নীরবে যখন দেশান্তরি হওয়ার কথা বলছিলেন তখন তাদের চোখ থেকে জলের ধারা নেমে এক করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

শুধু চন্দ্রধর দাস নয়, এই পাড়ার সুনীল দাস, লিখিল চৌধুরী, সুশীল চৌধুরী ও বসন্ত চৌধুরীও ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। শুধু কাশীপাড়াই নয়, গাঙ্কুল পাড়া, মাকালপাড়া, দাসপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও বাগী গ্রামের হিন্দুরা দেশান্তরি হচ্ছেন। দেশান্তরি হওয়া হিন্দুরা ভারতের আগরতলা ও শিলচরেই বেশি ঠাঁই নিচ্ছেন বলে নাসিরনগরে থেকে যাওয়া তাদের প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন।

নাসিরনগর শহর থেকে পাড়ার একটু ভেতরে গলিপথ দিয়ে গেলেই পড়বে সুনীল দাসের বাড়ি। টিনের বেড়া দিয়ে ইংরেজি ইউ আকৃতিতে ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। যে ঘরে হাসি-আনন্দ যুক্ত হয়ে প্রাণোচ্ছল থাকার কথা ছিল সেই ঘরকেই গতকাল দেখা গেল- নিষ্প্রাণ। ঘরের সবকটি দরজা-জানালা বন্ধ।

প্রতিবেশীর কয়েকটি মোরগ এবং মুরগি সুনীল দাসের ঘরের খোলা বারান্দা এবং উঠানে আপনমনে পায়চারী করছে, আর মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে খাবার নিচ্ছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, গত মাসে সস্ত্রীক সুনীল দাস দেশান্তরি হয়েছেন। যাওয়ার আগে ভিটেমাটি বিক্রি করে গিয়েছেন কি না তা প্রতিবেশীরা নিশ্চিত করতে পারেননি।

কেন দেশ ছাড়ছেন নাসিরনগরের হিন্দুরা- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল- গতবছর ‘গণ্ডগোলের’ পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানকার হিন্দুরা চরম মানসিক নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে। বাজারে গেলে হিন্দুদের অহরহ কটু কথা শুনতে হয়। অনেকটা ভাটির এই জনপদ নাসিরনগরের সংখ্যালঘুরা মনে করেন, একদিন না একদিন তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতেই হবে। কোনো না কোনোভাবে ছাড়তে হবে সাতপুরুষের ভিটেমাটি।

সবমিলিয়ে নাসিরনগরে হিন্দুদের এই মুহূর্তে কোনো নিরাপত্তাবোধ নেই। একারণে তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। যারা এখনো ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে আছেন তারাও পূর্বপুরষের এই সম্পদ ছাড়ার পথ খুঁজছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশান্তরি হওয়ার খবরটি এলাকায় প্রচার হওয়ায় হিন্দুদের জমির দামও কমে গেছে। উপজেলা সদরের আশপাশে যেখানে একবছর আগে এক শতাংশ জমি বিক্রি হতো ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে সেখানে এখন হিন্দুদের জমি বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে। হিন্দুরা জমির দাম কম পাওয়ার জবাব অবশ্য কারো কাছ থেকেই পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাসিরনগরের একাধিক হিন্দু বাসিন্দা বলেছেন, এখানেও কাজ করে খেতে হচ্ছে। ওখানে গেলেও কাজ করেই খেতে হবে। পার্থক্য হলো- এখানে সারাদিন কাজ করার পর নির্যাতন সইতে হয়, ওখানে সারাদিন কাজের পর অন্তত নির্যাতনটুকু সইতে হবে না- ¯্রফে এই মনস্তাত্বিক বিষয় থেকেও অনেকে চলে যাচ্ছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ নাসিরনগর উপজেলা শাখার সভাপতি কাজল জ্যোতি দত্ত বলেন, গণ্ডগোলের পর গত একবছরে বেশ কিছুসংখ্যক নি¤œআয়ের হিন্দু নাসিরনগর ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের কি পরিমাণ জনসংখ্যা নাসিরনগর ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন তার পরিসংখ্যান দিতে পারেননি তিনি। শুধু বললেন, গণ্ডগোলের পর থেকে গত একবছরে বহু মানুষ গেছে আরো যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন দেব’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, নাসিরনগর ছেড়ে অনেক হিন্দু ভারতে চলে গেছেন। কেন এমনটি হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুসলমানরা হিন্দুদের মেরেছে। বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়েছে। এ ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। এরমধ্যেই হামলার মাসখানেক পর মৎস্য মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ছায়েদুল হক শহরের একটি মন্দিরে শুধু নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের হিন্দুদের নিয়ে বৈঠক করলেন।

অথচ নাসিরনগরে ব্রাহ্মণ, ঘোষ, দাস, সূত্রধর, কায়স্থ, পাল, সাহা সম্প্রদায়ের প্রচুর লোকের বাস। কিন্তু বৈঠকে মন্ত্রী এসব সম্প্রদায়ের কোনো লোককে ডাকেননি। ডাকেননি বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কোনো নেতাকর্মীকেও।

নমঃশুদ্রদের নিয়ে আয়োজিত ওই বৈঠকে হিন্দুদের নিরাপত্তার কথা কিছু না বলে মন্ত্রী কি কি উন্নয়ন করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, নির্যাতনের পর হিন্দুরা যেখানে বিচার হওয়ার অপেক্ষা করছে সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মৎস্য মন্ত্রী হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করলেন। মন্ত্রীর ভয়ে এখন এখানকার হিন্দুরা ওই ঘটনার প্রতিবাদ সভাও করতে পারে না। এতে স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়ায় তারা দেশ ছাড়ছেন।

নাসিরনগর শহর লাগোয়া অন্তত ১০টি পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের ওই গণ্ডগোলে আগুনে ঘর পোড়ার পাশাপাশি পুড়েছে হিন্দুদের মনও। রাতের আঁধারে বাড়িতে বাড়িতে আগুন হামলা আর লুটপাটের পর এখন আতঙ্কিত মানুষের ঘুম হারিয়ে গেছে। স্থানীয় হিন্দু পরিবারগুলোর একটাই দাবি-নিরাপত্তা চাই।

ফুলেশ্বরী রানী দাস নামের এক নারী সেই বিভীষিকা তুলে ধরে বলছেন, সেদিন রাতে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে। আতঙ্কিত মানুষ তখন দিগি¦দিক ছোটাছুটি করছিল।

আশপাশের মানুষের চিৎকারে সবাই ছুটে আসেন। আগুন নিভে যায়। কিন্তু সেই আগুনের আতঙ্ক আজও কাটেনি। আর কোনো দিন কাটবে বলেও মনে হয় না। এমন যদি হয় রাতে গোয়াল ঘরে আগুন না দিয়ে শোবার ঘরেই দিল, তখন কি হবে? প্রশ্ন ফুলেশ্বরীর।

নাসিরনগর সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ হিন্দু। তবু তাদের জীবনে এমন অবিচার এমন অন্যায় কোনো দিন দেখেননি বলে জানিয়েছেন প্রবীণ বাসিন্দারা। অনেকেই বলেছেন, উভয় ধর্মের মানুষে দীর্ঘদিন ধরে মিলেমিশে বসবাস করছেন।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার ধুয়ো তুলে গত বছর ৩০ অক্টোবর ইসলাম রক্ষার নামে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত নামের একটি সংগঠন স্থানীয় মাঠে সমাবেশ করে। তারা এর আগের দিনই পুরো নাসিরনগরে মাইকিং করে। সেই সমাবেশ থেকে নির্বিচারে হামলা হয় হিন্দু বাড়িগুলোর ওপর।

আক্রান্ত হওয়া পরিবার কিংবা বাড়িতে গিয়ে স্থানীয় হিন্দুদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, মনের ক্ষতের কথা। ঝরঝর করে কেঁদেছেন, কারও কারও বোবা কান্নার অশ্রæ বলে দিয়েছে এই ক্ষত কতটা গভীরে। তাদের প্রশ্ন- কেন এই হামলা, কেন এই অত্যাচার। কি দোষ তাদের, তাদের সন্তানদের?

মধ্য বয়স্ক সুশেন দাস বললেন, সেদিনের হামলায় ওরা শুধু আমাদের মেরেছে, বাড়ি লুট করেছে তা নয়, তারা বঙ্গবন্ধুর ছবি ভেঙেছিল, তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি রবীন্দ্রনাথের ছবিও, ভেঙে চুরমার করেছিল আমার সাধের হারমোনিয়ামটাকেও।

তিনি জানান, আমরা ভিক্ষা চাই না, করুণা চাই না- আমরা নিরাপত্তা চাই। যেন কেউ আমার বাড়ি, আমার ঘর, আমার হারমোনিয়ামটা ভেঙে না দেয়।

SHARE