Home শিক্ষা দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে

132
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১৮ ডিসেম্বর) :: বেসরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে প্রায় প্রতি বছরই। গত বছরও নতুন করে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছে বেসরকারি চারটি বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও পুরনোরাই শিক্ষার্থী ধরে রাখতে পারছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ১৩ হাজার।

সদ্য প্রকাশিত ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৬ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার ১৩০। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ১৫৭।

নতুন চারটিসহ গত বছর শিক্ষার্থী ভর্তি করে ৮৬টি বিশ্ববিদ্যালয়। পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই ৩০টিতে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে শিক্ষার্থী কমেছে। প্রথম সারির বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে এর মধ্যে।

দেশে প্রথম সারির পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টিও গত বছর শিক্ষার্থী হারিয়েছে। ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ছিল মোট ১০ হাজার ৩৪৪ জন। ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৯৫ জনে। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী হারিয়েছে ৭৪৯ জন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির স্টুডেন্টস অ্যাফেয়ার্স পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক মনজুর এইচ খান বলেন, নানা কারণে ২০১৬ সাল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য খুব একটা ভালো যায়নি। এর প্রভাব আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতে পড়েছে। তবে এআইইউবির ক্ষেত্রে প্রভাবটা খুব বেশি নয়।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে বেসরকারি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। শিক্ষার্থী হারিয়েছে তারাও। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৫৭২। গত বছর শিক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২৭৪ জনে। অর্থাত্ শুধু স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ই গত বছর শিক্ষার্থী হারিয়েছে ১ হাজার ২৯৮ জন।

শিক্ষার্থী কমেছে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আরেক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশা বিশ্ববিদ্যালয়েও। ২০০৬ সালে রাজধানীর শ্যামলীতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০১৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ৯৭১। গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৭৩ জনে। অর্থাত্ এক বছরেই বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী হারিয়েছে প্রায় ৫০০ জন।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মণ বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ে বিশেষায়িত অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় আবাসনসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা রয়েছে, যেটা আমাদের নেই। এছাড়া যোগ্য শিক্ষকের একটি বড় সংকট রয়েছে। অনেক সময় খণ্ডকালীন শিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছে। আমাদেরও কমেছে, এটি অস্বীকারের কিছু নেই।

৫০০-এর মতো শিক্ষার্থী কমেছে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ের। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৪ হাজার ৬১৬ জন শিক্ষার্থী থাকলেও গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১২৪ জনে।

২০১৬ সালে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন মেসবাহউদ্দিন আহমেদ। শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বেশকিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। পুরনোগুলোয়ও নতুন বিভাগ খোলায় আসন সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থায়ী ক্যাম্পাস, শিক্ষক নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে নিয়মনীতির মধ্যে আসতে পারছে না। এসবের একটা প্রভাব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে পড়েছে বলে মনে হয়।

১ হাজার ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থী কমছে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৪ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী থাকলেও গত বছর তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬ জনে।

সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও কিছু শিক্ষার্থী হারিয়েছে বেসরকারি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশও। ২০১৫ সালের ৫ হাজার ৫৪৭ জন থেকে ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭৯ জনে।

বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে আরো যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে সেগুলোর মধ্যে ইস্টার্ন, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ও ইবাইস ইউনিভার্সিটি।

এছাড়া সিটি, প্রাইম, সাদার্ন, বিইউবিটি, ইউআইটিএস, প্রাইমেশিয়া, ভিক্টোরিয়া, ইস্ট ডেল্টা ও অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী কমার একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানান ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার মৌলিক সুবিধাদি গড়ে না ওঠা, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে না পারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী কমেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা খুব সচেতন। শিক্ষার মানের পাশাপাশি ভাবমূর্তির বিষয়টিও তারা বিবেচনায় রাখেন। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে উচ্চশিক্ষার উন্নত পরিবেশ সৃষ্টির তাই বিকল্প নেই।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল। ২০১১ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার ৮২২। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬৪০। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৩ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৭৩৬, ২০১৪ সালে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৩০ ও ২০১৫ সালে সাড়ে তিন লাখ। ২০১৬ সালে এসে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশে উচ্চশিক্ষা প্রসারের নামে মানহীন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বেশকিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এসেছে। ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী টানতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পাশাপাশি জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাবমূর্তির সংকটেও পড়েছে। এসবের প্রভাব শিক্ষার্থী ভর্তিতে পড়তে পারে। দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য এটি গভীর সংকট।

কয়েক বছর ধরে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখিতাও বাড়ছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মোট ৩৩ হাজার ১৩৯ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ২৪ হাজার ১১২। এ হিসাবে এক বছরে বিদেশগামী শিক্ষার্থী বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

SHARE