Home কক্সবাজার কক্সবাজার সৈকতের সর্বনাশ করছে অপরিকল্পিত ৭০০ বহুতল ভবন : ঝুঁকিতে পরিবেশ ও...

কক্সবাজার সৈকতের সর্বনাশ করছে অপরিকল্পিত ৭০০ বহুতল ভবন : ঝুঁকিতে পরিবেশ ও প্রকৃতি

504
SHARE

আব্দুল কুদ্দুস রানা,প্রথম আলো(৪ জানুয়ারী) :: কক্সবাজারের পরিচিতি দুনিয়াজোড়া। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত এখানেই। কাগজে-কলমে স্বীকৃতি না থাকলেও দেশের প্রধান পর্যটন শহর কক্সবাজার। সাগর উপকূলের ভূ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই এই শহরটি গড়ে উঠেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এখানকার পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। প্রকৃতির সঙ্গে অবিচারের কারণে সর্বনাশ হতে চলেছে কক্সবাজারের।

শুধু শহরের রূপ দিতে গিয়েই কক্সবাজার সৈকতের কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যেই যেনতেনভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০০ বহুতল ভবন। ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই শহরে ভবন রয়েছে আরও ৩ হাজার ২০০টি।

কক্সবাজার পৌরসভার মোট আয়তনের ৩০ শতাংশই (প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটার) পাহাড়ি এলাকা। ভবন করার জন্য সমতলে ভূমির পরিমাণ কমতে থাকায় স্বভাবতই মানুষের নজর পড়েছে পাহাড়ে। শহরের ছোট-বড় ১২টি পাহাড় কেটে এবং পাহাড়ের বন উজাড় করে তৈরি হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি। এর মধ্যে প্রশাসনের হিসাবে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর রয়েছে ৬০০টি।

সৈকত ও শহর এলাকায় নির্মিত ৯০ শতাংশ হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস নির্মাণে পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব।

পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংসের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রতি বর্ষায় এখন শহরে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। গত বছর শহরের তিনটি এলাকায় পাহাড়ধসে মারা গেছেন আটজন। এ বছরও ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি ভেঙে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। পাহাড় নিধন, পাহাড়ের জলাধার নষ্ট করা এবং গাছপালা উজাড়ের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়া।

কক্সবাজারের ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে ২০১২ থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত তিন বছর মাঠপর্যায়ের একটি গবেষণায় যুক্ত ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখা। বাপার তথ্য অনুযায়ী, শহরের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রায় ৩৪ হাজার নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। আরও ১২ হাজার নলকূপ থেকে লবণাক্ত পানি বের হচ্ছে। পৌরসভায় মোট নলকূপ রয়েছে ৬০ হাজার ৩০০টি।

২০ বছর আগেও মাটির মাত্র ১০-১২ ফুট নিচে গেলেই সুপেয় পানি পাওয়া যেত। এখন কোথাও ৩০০ ফুট, কোথাও ৭০০ ফুট মাটির নিচেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পৌরসভায় দৈনিক খাওয়ার পানির চাহিদা ২০ লাখ গ্যালন। পৌর কর্তৃপক্ষ ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করে ৩ লাখ ২৪ হাজার গ্যালন পানি সরবরাহ করলেও শহরের বড় অংশে পানির তীব্র সংকট চলছে।

কক্সবাজার পিপলস ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, শহরের চার শতাধিক হোটেলে গভীর নলকূপ থেকে প্রতিদিন এক কোটি লিটার পানি তোলা হয়। শহরের আবাসিক এলাকায়ও প্রায় সমপরিমাণ পানি তোলা হয়।

কক্সবাজার শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে গবেষণা করছেন ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক আশরাফ আলী সিদ্দিকী। তিনি বলেন, কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে। পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, দুই দশক ধরে অপরিকল্পিতভাবে কক্সবাজারে বহুতল ভবন বানানোর প্রতিযোগিতা চলেছে। পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছয়তলা ভবনের অনুমতি নিয়ে ১০ থেকে ১৩ তলা ভবনও তোলা হয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করলেও এর সঠিক সংখ্যা কত, তা কক্সবাজার পৌর কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেনি। সৈকতের পাশে সারি সারি বহুতল ভবন গড়ে তোলা হলেও পর্যটকদের জন্য সাগর দর্শন ছাড়া বিনোদনের অন্য কোনো সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি।

পর্যটন শহর গড়ে তোলার জন্য ভূমির যৌক্তিক ব্যবহারের বিষয়টি কখনো কারও মাথাতেই ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, সৈকতের ঝাউবন বলে এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই।

কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুর রহমান বলেন, বাঁকখালী নদী এবং সাগরে যাতে আবর্জনা না ফেলা হয়, সে জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য সংরক্ষণাগার করার উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। শহরের পাশের রামু উপজেলার চেইন্দা নামক এলাকায় এ জন্য দুই একর জমি অধিগ্রহণ করেছেন তাঁরা।

অপরিকল্পিত ভবনে কক্সবাজার ছেয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১২ সালের পর থেকে পৌর কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না। এর আগে সাত শতাধিক ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হলেও তৈরি হয়েছে তিন হাজারের বেশি বহুতল ভবন। ছয়তলা ভবন নির্মাণের কথা বলে ১৩তলা ভবন করার প্রমাণও পেয়েছেন তাঁরা। এখন ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব নবগঠিত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক)।

গত বছরের ১৭ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। কার্যক্রম শুরু করার পর এ পর্যন্ত ৪৪টি ভবনের নকশা অনুমোদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

কউকের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, আগে যা ঘটেছে তা নিয়ে বলে আর কী হবে। এখন তাঁর লক্ষ পরিকল্পিত, আধুনিক ও আকর্ষণীয় পর্যটন শহর হিসেবে কক্সবাজারকে গড়ে তোলা।

কক্সবাজার শহরের রাস্তাগুলো অপ্রশস্ত। পথচারীদের নিরাপদে হাঁটার জন্য ফুটপাত বলে তেমন কিছু নেই। স্বাধীনতার আগে শহরের মাঝখানে ১৭ ফুট প্রস্থের যে প্রধান সড়ক (বাস টার্মিনাল থেকে হলিডে মোড় পর্যন্ত আট কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক) তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনো আগের অবস্থাতেই রয়েছে। এই সড়কে সারাক্ষণ যানজট লেগে থাকে। ১২ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা (টমটম) দাপিয়ে বেড়ায় শহরজুড়ে। এর মধ্যে ১০ হাজার রিকশারই চলার অনুমতি নেই। এ ছাড়া আড়াই হাজারের বেশি অটোরিকশা চলে শহরে।

শহরের ১১৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা সড়ক মাত্র ২৭ কিলোমিটার। ইটের রাস্তা ২০ কিলোমিটার। বাকি রাস্তা এখনো কাঁচা। ১৬৪ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে (নালা) ১৪৫ কিলোমিটারই এখনো কাঁচা। সামান্য বৃষ্টিতে নালা উপচে শহরে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। এরপর পর্যটন শহর বলে আর বড়াই করার কিছু থাকে না।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভার লোকসংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৭ জন। এখন তা ৩ লাখ ছাড়িয়েছে। এত মানুষকে সেবা দেওয়ার ক্ষমতা পৌর কর্তৃপক্ষের নেই বলে মন্তব্য করেন কক্সবাজার আইন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ এবং প্রবীণ সাংবাদিক প্রিয়তোষ পাল। তাঁরা বলেন, বছরে কয়েক লাখ পর্যটক এই শহরে বেড়াতে আসেন। তাঁদের সেবা দেওয়া জন্য পৌরসভার বাজেটে আলাদা কোনো বরাদ্দ থাকে না। শহরের ৯৫ শতাংশ হোটেল-মোটেলের নিজস্ব গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা নেই।

পর্যটকদের বিষয়টি মাথায় রেখে সৌন্দর্যবর্ধন এবং সড়ক চওড়া করার একটি উদ্যোগ নিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। শহরের প্রধান সড়কের হলিডে মোড় থেকে বিমানবন্দর এবং হলিডে মোড় থেকে কলাতলী হয়ে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত রাস্তা চওড়া করা এবং কক্সবাজারে বাঁকখালী নদীর দক্ষিণ পাড় দিয়ে ১৫০ ফুট চওড়া সবুজ বেষ্টনীসহ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেছেন কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক শিক্ষক শিউলী ভৌমিক। তিনি বলেন, পর্যটন বিকাশে সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও কম।

থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতের মতো কক্সবাজার, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন (ইটিজেড) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা থাকলেও কোনো সরকার সে সুযোগ কাজে লাগায়নি বলে মন্তব্য করেছেন পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, সৈকতে হকার, ভিখারিসহ অনাকাঙ্ক্ষিত লোকের উৎপাতও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ১০০-তে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত যদি ৮০ পায়, তাহলে ব্যবস্থাপনার জন্য টেনেটুনে ১৫ নম্বর পাবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল। তিনি বলেন, হোটেল-মোটেলের নামে সৈকতের পাশে গড়ে তোলা স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে।

কক্সবাজার নিয়ে পরিকল্পনা না থাকার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এত বছর পরও শিশুদের জন্য পার্ক, পুরাকীর্তি প্রদর্শনের ব্যবস্থা, সমুদ্র ও মৎস্যভিত্তিক জাদুঘর গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ সরকারি-বেসরকারি কোনো খাত থেকেই নেওয়া হয়নি। সাগরে গোসল, হোটেলে আড্ডা এবং শুঁটকি বা আচার কেনাতেই পর্যটকের আনন্দ সীমাবদ্ধ।

এই অধ্যাপক বলেন, যাঁরা বিশাল বিশাল হোটেল-মোটেল নির্মাণ করেছেন, তাঁদের হাত খুবই লম্বা। এখন যদি এসব হোটেল-মোটেলকে গাড়ি রাখার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে বলা হয় কিংবা স্থাপনা ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হয়, প্রভাবশালী মালিকেরা কউকের এই নির্দেশ কি আদৌ মানবেন?

SHARE