Home কলাম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ : ব্যবহার ও অপব্যবহার

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ : ব্যবহার ও অপব্যবহার

98
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২ ফেব্রুয়ারী) :: বেশি পেছনে যাবো না। তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা থেকে শুরু করি। এই ধারা যখন সংযোজন করা হয়, তখন ‘ব্যবহার’ ও ‘অপব্যবহার’ নিয়ে কথা শুরু হয়। বোধ-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে, কিছু পড়াশোনা করে ‘আইন’ বোঝার চেষ্টা করি, ঠিক বুঝি না। বোঝার কথাও নয়।

আইনের মানুষ না হওয়ায় মনে করি, পুরোটা বোঝার দরকারও নেই। স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেকের ভিত্তিতে বিষয়টির ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’, ‘ঘোড়া আগে না গাড়ি আগে’– বাংলা ভাষায় কথাগুলো খুব ব্যবহার করা হয়।

এই আলোকে ৫৭ ধারা ও এখনকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ নিয়ে কিছু পর্যালোচনা। আইনের ধারা উল্লেখ করে লেখাটা ভারি করবো না। আইনটির ‘ব্যবহার’, ‘অপব্যবহার’ বিষয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করবো।

এক.
৫৭ ধারা যখন সামনে এলো, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো ‘অপব্যবহার’ হবে না। গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দের অনেকে সরকারের কথায় আশ্বস্ত হলেন। তারপর ৫৭ ধারায় গণমাধ্যমকর্মীদের নামে মামলা হতে থাকলো। গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দসহ অনেকে বলতে শুরু করলেন, আইনের ‘অপব্যবহার’ করা হচ্ছে। এ কথার অর্থ দাঁড়ায় ‘আইনটি ভালো, কিন্তু অপব্যবহার হচ্ছে’।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রেও বলা হচ্ছে ‘অপব্যবহার’ হবে না। যখন এই আইন প্রয়োগ শুরু হবে তখন বলা হবে ‘অপব্যবহার’ হচ্ছে। অমুক ওসি বা এসআই ‘বিএনপি-জামায়াত’। তিনি বা তারা আইনের ‘অপব্যবহার’ করে সংবাদকর্মীদের নাজেহাল-হয়রানি করছেন। গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দসহ অনেকের থেকে এমন আলোচনা শোনাটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। প্রশ্ন হলো, এটাকে ‘অপব্যবহার’ বলা হবে কেন?

দুই.
আইন করে সরকার। আইন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিয়ে একটি আইন করে। মন্ত্রিসভায় পাস হয়। জাতীয় সংসদে আলোচনা করে বা না করে পাস হলে, তা আইনে পরিণত হয়। পাস হওয়ার আগে কোনও কোনও ক্ষেত্রে খসড়া আইনটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কিছু আলোচনা-সংশোধন হয়, কখনো হয় না। সংসদে পাস হওয়ার পর আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়, অর্থাৎ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব পায় পুলিশ।

এই সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ৫৭ ধারা আইনে পরিণত হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে। বলা হচ্ছে এটা ‘খসড়া’ আইন। না এটা ‘খসড়া’র চেয়ে বেশি কিছু। বুঝতে হবে প্রধানমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রী এই আইনটি সংসদে পাস হোক, তা চাইছেন।

প্রধানমন্ত্রী চাওয়ার পরে, এই সংসদ সদস্যরা পাস করার আগে বড় কোনও সংশোধনী আনবেন, বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। এরপরও দেখছি, অনেকে বিশেষ করে গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দ বিশ্বাস করতে চাইছেন। এরাই আইনটি প্রয়োগ হওয়ার পর বলবেন ‘অপব্যবহার’ করা হচ্ছে।

৫৭ ধারায় ছিল, আছে ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারাতেও। স্পষ্টভাবে বলা আছে ‘পুলিশ যদি বিশ্বাস করে যে অপরাধ হয়েছে’ তাহলে মামলা নিতে পারবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অর্থাৎ গ্রেফতার  করবে। এই ক্ষমতা বা অধিকার, জিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।

সেই ক্ষমতা এবং অধিকার অনুযায়ী পুলিশ যদি বিশ্বাস করে যে, এটা অপরাধ এবং যদি ব্যবস্থা নেয় মানে একজন সাংবাদিক বা সম্পাদককে গ্রেফতার করে, এটা তো আইনের ‘অপব্যবহার’ নয়। এটা তো স্বাভাবিক ‘ব্যবহার’।

কথা যদি বলতে হয়, বলতে হবে, আইন করে যারা পুলিশকে ‘বিশ্বাস করার’, ‘গ্রেফতার  করার’ ক্ষমতা-অধিকার দিলো, তাদের বিরুদ্ধে। আইন করেছে সরকার, পুলিশ নয়। সরকার আইন করে, পুলিশকে সেই অনুযায়ী কাজ করতে বলেছে। ‘অপব্যবহার’ হচ্ছে বলে পুলিশকে দায়ী করার কোনও কারণ নেই। অথচ আমরা তাই করছি। কেন করছি?

দলীয় আনুগত্য এবং সুবিধা নেওয়ার কারণে সরকারের সমালোচনা করার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছি। লোক দেখানোর জন্যে একজন এসআই, ওসি বা এসপির সমালোচনা করে বলছি, তিনি বা তারা আইনের ‘অপব্যবহার’ করে সাংবাদিকদের হয়রানি করছেন।

বাস্তবে বিষয়টি মোটেই এত সরল নয়। সরকার আইন করে পুলিশকে দিয়ে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই সহজ কথাটা বুঝতে না পারলে, বুঝেও আনুগত্য বজায় রেখে তোষামোদ করলে, ‘অপব্যবহার’র অজুহাত দেখালে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকবে না।

তিন.
আরও পরিষ্কার করে বলি। সচিবালয় ছাড়া অধিকাংশ সরকারি, আধা সরকারি অফিসে ঢোকার অনুমতি প্রয়োজন হয় না। সরকারি একটি ব্যাংকে আপনি-আমি ইচ্ছে করলেই ঢুকতে পারি। ধরে নেই, সোনালী ব্যাংকে একটি বড় দুর্নীতি সংঘটিত হলো। একজন গণমাধ্যমকর্মী তথ্য সংগ্রহ করতে সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অফিসে গেলেন। দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে গোপনে। এক বা একাধিক সোর্সের মাধ্যমে। সোর্স তথ্য দেবে তার প্রধানতম শর্ত ‘সোর্সের নাম-পরিচয়’ কিছুই প্রকাশ করা হবে না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরে তথ্য-সংগ্রহের বিষয়টি কেমন দাঁড়াবে?

ক. সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় যাওয়ার আগে ম্যানেজারের কাছে লিখিতভাবে অনুমতি চাইতে হবে যে, ‘আমি ব্যাংকে প্রবেশ করার অনুমতি চাই’। দরখাস্ত গেটের দারোয়ানের কাছে দিতে হবে। ম্যানেজারের কাছে দরখাস্ত দেওয়ার জন্য ব্যাংকে প্রবেশ করলে, যদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সাংবাদিককে আটকে রেখে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে যে, বেআইনিভাবে ব্যাংকে প্রবেশ করেছে, তা হবে ১৪ বছরের জেল এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার মতো অপরাধ।

খ. এবার ধরে নেই, অনুমতি নিয়ে বৈধভাবে ব্যাংকে প্রবেশ করলেন গণমাধ্যমকর্মী। তথ্য গোপনে সংগ্রহ করা যাবে না। তার মানে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে গিয়ে তথ্য চাইতে হবে। প্রমাণ চাইতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ‘তথ্য প্রমাণ’ গণমাধ্যমকর্মীকে সরবরাহ করেন, তবে কি তিনি তা প্রকাশ করতে পারবেন? না, তাও পারবেন না, যদি না অভিযুক্ত ব্যক্তি ‘লিখিত অনুমতি’ দেন। ‘আমার দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন’– লিখিতভাবে এই অনুমতি না দিলে, রিপোর্ট প্রকাশের আগে (গোপনে সংগ্রহ) প্রকাশের পরে মামলা করতে পারবেন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি।

গ. ব্যাংকে প্রবেশ করে অথবা ব্যাংকে প্রবেশ না করে সোর্সের থেকে ‘তথ্য-প্রমাণ’ সংগ্রহ করা যেতে পারে। হ্যাঁ, পারে। এক্ষেত্রে যিনি অর্থাৎ যে সোর্স ‘তথ্য-প্রমাণ’ দেবেন, তিনি ‘সহায়তা’ করার অপরাধে অপরাধী হবেন। একই পরিমাণ শাস্তি তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এই প্রক্রিয়ায় আর যাই হোক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো দূরের কথা, সাধারণ সাংবাদিকতাও সম্ভব নয়। প্রেস রিলিজ জাতীয় ‘উন্নয়ন সাংবাদিকতা’ সম্ভব। হয়তো আইনের উদ্দেশ্য তেমনই।

চার.

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর থাকলে, বেসিক ব্যাংক বা হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ বা প্রকাশ করা যাবে কিনা, তা যদি কেউ বুঝতে না পারেন—কিছু বলার নেই। ৫ থেকে ১৪ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সংসদ সদস্যরা চাকরি দিচ্ছেন, এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাদের ‘মান-ইজ্জত’ থাকে না। সুতরাং আইনটি ‘মান-ইজ্জত’ ঠেকানো নিশ্চিত করবে। যেকোনও পর্যায়ের দুর্নীতিবাজরা, ইয়াবা সম্রাটরা তাদের কর্ম আইনি প্রটেকশনের ভেতরে থেকে চালিয়ে যেতে পারবেন।

পাঁচ.

আইনমন্ত্রীর ‘মনে হয়’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ৫৭ ধারা বাতিল করার পর তার উপলব্ধি হয়েছে ‘বাকস্বাধীনতা হরণের’ অনেক কিছু তার মধ্যে ছিল। বাতিলের আগে তার তেমন কিছু ‘মনে হয়নি’। এখন যেভাবে মনে হচ্ছে না, ৩২ ধারার ক্ষেত্রে। ৫৭ ধারার চেয়ে ৩২ ধারা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ও নিপীড়নমূলক। সাংবাদিকের একটি তথ্য সংগ্রহকে গুপ্তচরবৃত্তির মতো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নামক ‘কালো’ আইনটিতে।

‘৫৭ ধারা বাতিল বা আর থাকছে না’– এটা একটা বড় প্রতারণামূলক বক্তব্য। গণমাধ্যমনেতা ও কর্মীদের উপলব্ধিতে আসা দরকার, প্রতিবাদ আইন হয়ে যাওয়ার পরে করে কোনও উপকার পাওয়া যাবে না।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

SHARE