Home কক্সবাজার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর মংডু সফর

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর মংডু সফর

195
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১১ ফেব্রুয়ারী) :: আজ থেকে প্রায় ছুঁই ছুঁই ১০০ বছর আগের কথা। তখনো তিনি ‘পথের পাঁচালী’র লেখক হিসেবে আবির্ভূত হননি। দু-চারটি ছোটগল্প লিখেছেন মাত্র। ১৯২২ সালের ১৭ জুলাই হরিনাভি-স্কুলের চাকরি ছেড়ে কলকাতার ৪১, মির্জাপুর স্ট্রিটের মেসে ঠাঁই গড়েছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মাঝে মাঝে চাকরি খুঁজে বেড়ান। সেই বছরেই শারদীয়া ছুটির কিছু আগে প্রখ্যাত মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী কেশোরাম পোদ্দারের ‘গোরক্ষা সমিতি’র ভ্রাম্যমাণ প্রচারকের চাকরি পেলেন তিনি। বেতন মাসে মাত্র ৫০ টাকা। গরুর উপযোগিতা প্রচার করাই ছিল তার চাকরির প্রধান কাজ।

এ চাকরির সুবাদে তিনি তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ভ্রমণ করেছিলেন। চট্টগ্রাম ভ্রমণের ধারাবাহিকতায় তিনি নিম্ন বার্মার আরাকান অঞ্চলের মংডুসহ বিস্তীর্ণ এলাকা দেখার সুযোগ পান। নিবিড় অরণ্য, গভীর বনানী, পাহাড় সবসময় তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। তাই মংডু বেড়ানোর প্রধান আকর্ষণ ছিল আরাকান-ইয়োমা রেঞ্জের নিবিড় অরণ্যের দর্শন। এ ভ্রমণকাহিনী লিপিবদ্ধ রয়েছে তার দিনলিপির ঢঙে লেখা ‘অভিযাত্রিক’-এ।

আগেই বলা হয়েছে, ১৯২২ সালের শারদীয়া পূজার একটু আগে তিনি ভ্রাম্যমাণ প্রচারকের চাকরি পেয়েছিলেন। ছুটির আগেই তিনি পূর্ববঙ্গের পথে ট্রেনযোগে কুষ্টিয়ার পথে পা রাখলেন। এ প্রচারকাজের সূত্রেই তিনি কিছুদিনের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে এসে গোরক্ষা সমিতির এক সদস্যের গৃহে অতিথি হিসেবে উঠেছিলেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এ অতিথিপরায়ণ পরিবারটির আপনজন হয়ে উঠলেন বিভূতিভূষণ। তার পরবর্তী গন্তব্য স্থান কক্সবাজার। কক্সবাজার এসে মংডু যাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আর আরামদায়ক নৌপথ খুঁজে পেলেন তিনি। সেই সময়ে কক্সবাজার থেকে প্রতি শুক্রবার বার্মার মংডু যাওয়ার জন্য স্টিমার সার্ভিসের ব্যবস্থা ছিল।

এসব স্টিমার সাধারণত শুঁটকি মাছ ও যাত্রী নিয়ে মংডু, কক্সবাজার যাতায়াত করে। বিভূতিভূষণ এমন এক শুক্রবারে কক্সবাজার থেকে ‘নীলা’ নামের একটি স্টিমারে চেপে মংডু রওনা দিলেন। তিনি লিখেছেন যে, এসব স্টিমারের খোলে শুঁটকি বোঝাই না থাকলে জাহাজের ডেকে ভ্রমণ বেশ আরামদায়ক হয়। বিভূতিভূষণের যাত্রার সময়ে নীলা স্টিমারে সৌভাগ্যবশত কোনো শুঁটকির কার্গো ছিল না।

উপকূল আছড়ে স্টিমার চলছে। সুতরাং একদিকে সবুজ বনশ্রেণী, জেলে ডিঙির বহর, সারি সারি কাঠের বাড়ি, বৌদ্ধ মন্দির, মাঝে মাঝে নদীর মোহনা— এসব দেখতে দেখতে বিকালবেলা মংডুতে পৌঁছলেন তিনি।

সেকালের ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পূর্ব প্রান্তে ব্রহ্মদেশ বা বার্মা। বার্মা সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশ হলেও ইংরেজরা সে দেশ জয় করার পর ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করে একই দেশ হিসেবে তখন শাসন করেছে। ভারতের পূর্ব উপান্ত্য হওয়ায় সেকালের ভারতবাসীর পক্ষে ওদেশে যাতায়াতের দ্বারও ছিল অবারিত। পাসপোর্ট-ভিসার কোনো প্রয়োজন হতো না। মংডু নিম্নবার্মার সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত। আরাকান প্রদেশের একটি সাবডিভিশন বা মহকুমা।

বার্মাদের মগ বলা হয় না। যদিও মগদের বসবাস ছিল বার্মার এক অংশে। বার্মার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে  আরাকান, যেখানে আরাকান ইয়োমা গিরিশ্রেণী। এর কিছুটা অংশ হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। উত্তরে আর উত্তর-পশ্চিম সীমানায় হলো চট্টগ্রাম, মণিপুর, আসাম— ওই আরাকানবাসী বৌদ্ধদেরই বলা হতো মগ। মগ নামের উত্পত্তি নিয়ে গবেষক মহলে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। কিন্তু মগ নামের সঙ্গে যে বিভীষিকা ও অরাজকতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেকালে এই মগরা ছিল দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর জলদস্যু।

পুর্তগিজ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের সঙ্গে এরা কখনো একজোটে আবার কখনো বা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দস্যুবৃত্তি চালাত। বাংলাদেশের খুলনা, যশোর, নোয়াখালী, সুন্দরবন প্রভৃতি অঞ্চলে মগরা অত্যাচার ও লুটতরাজের তাণ্ডব সৃষ্টি করে। পরে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলার সুবেদার শায়েস্ত খানের নেতৃত্বে মোগল সৈন্য ও  নৌবাহিনী  চট্টগ্রাম দখল করে মগ ও পর্তুগিজদের অত্যাচার থেকে বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৫ সালে সারা বার্মাদেশ তৃতীয় বর্মাযুদ্ধের পর ব্রিটিশরাজে পরিণত হয়। স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালে।

ঘরের কাছে হলেও মংডুতে পা দিয়ে বিভূতিভূষণ বুঝলেন মংডু একেবারে খাস ব্রহ্মদেশ— অনেক আগেই বাংলাদেশ ছাড়িয়ে এসেছেন। শরত্চন্দ্রের মতো তিনি অবশ্য প্রথম দর্শনেই বলেননি, বার্মা স্ত্রী স্বাধীনতার দেশ। তবে চুরুট মুখে মংডু নারীদের রাস্তাঘাটে সসংকোচে চলতে দেখে এমন ইঙ্গিতই তিনি করছেন তার লেখায়। ‘বর্মি মেয়েরা মোটা মোটা এক হাত লম্বা চুরুট মুখে দিয়ে জল আনতে যাচ্ছে; টকটকে লাল রেশমি লুঙ্গি পরা যুবকরা সাইকেলে চড়ে চলাফেরা করছে।’

মংডুতে কোথায় থেকেছিলেন, তা বিভূতিভূষণ উল্লেখ করেননি। হতে পারে গোরক্ষা সমিতির কোনো সদস্যের গৃহে অথবা কোনো পূর্বপরিচিত বাঙালির বাসায়। তখন মংডুতে অনেক বাঙালি পরিবার ছিল। বাঙালিরা ইংরেজি ভাষায় মোটামুটি কাজ চালানোর মতো দক্ষতার গুণে ব্রিটিশ ভারতের সব জায়গায় ছোট ও মাঝারি সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ বার্মায় এই একই চিত্র। প্রায়োগিক ইংরেজি জ্ঞান থাকায় বর্মি মুল্লুকে বাঙালিরা (পড়ুন হিন্দু বাঙালি) ‘ইংরেজির বিদ্যার জাহাজ’ বলে সম্মান পেত। ছোট বড় বেসরকারি সওদাগরি অফিসে, পোস্ট অফিসে ইত্যাদি কর্মসূত্রে হিন্দু শিক্ষিত বাঙালিরা করে খেতে পারতেন। তবে তাদের বেশির ভাগই পরিবার-পরিজন দেশে রেখে আসতেন। রিপন কলেজের ডিসটিংশনসহ বিএ পাস বিভূতিভূষণের ইংরেজি ভাষা ভালো রপ্ত ছিল। মংডুতে পা দিয়েই ইংরেজি জানার দরুন তার যিকঞ্চিৎ অর্থাগমের ব্যবস্থা হয়েছিল বিনা প্রচেষ্টায়। একদিন মংডু পুরনো পোস্ট অফিসের রাস্তা দিয়ে সমুদ্রের ধারে যাচ্ছিলেন তিনি।

এমন সময় এক বৃদ্ধ মুসলমান মাল্লা তাকে অনুরোধ জানাল একখানা দরখাস্ত লিখে দিতে ইংরেজিতে। এ মাল্লা বিভূতিভূষণকে তার সঙ্গে কাছের একটি টিনের বাংলো ঘরে নিয়ে গেল। মনে হলো সেখানে অনেক জাহাজী মাল্লা আবাস গেড়েছে। তিনি লিখছেন, ‘আমার হাতে তখন পয়সার সচ্ছলতা নেই, দরখাস্ত লিখতে ওরা আট আনা পারিশ্রমিক দিলে, আমিও তা নিয়েছিলাম।’

দরখাস্ত লিখে চলে আসার সময় সেই বৃদ্ধ মাল্লাটি তাকে জানাল যে, একজন বর্মি সাহেব বিভূতির সঙ্গে কথা বলতে চান; সাহেব ভেতরের ঘরে থাকেন। তিনি সেই মাল্লার সঙ্গে সঙ্গে ডেরায় গেলে একজন বৃদ্ধ বর্মি ভদ্রলোক হাসিমুখে তাকে ভাঙা চাটগাঁর বুলিতে বললেন, ‘আসুন বাবু, আপনাকে একটু দরকার আছে।’

যে ঘরে বর্মি সাহেব তাকে নিয়ে গেলেন, সে ঘরে ‘তিন-চারটি সুবেশা তরুণী বসে ছিল, সবাই বেশ সুশ্রী।’ প্রত্যেকের সামনে একটা ছোট বাটি, তাতে সাদা মতো কী যেন গুঁড়ো। একটু পরেই মেয়েরা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

বৃদ্ধ এবার তাকে কেন ডেকেছেন তা খুলে বললেন। বাঙালির ইংরেজি জ্ঞানের বাস্তব উপযোগিতা ও কদর বোঝা গেল এবার। বর্মি ভদ্রলোক কাঠের ব্যবসা করেন, বাজারে কাঠের আড়ত আছে। তার নাম মৌংপে। একজন বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোক তার আড়তে ইংরেজি চিঠিপত্র লিখতেন, আর তার মেয়েদের ইংরেজি পড়াতেন, তিনি দেশে চলে গেছেন দুই মাস আগে। তার ফেরার নামগন্ধ নেই। চিঠি লিখলেও জবাব দেন না, অথচ বর্মি সাহেবের জরুরি চিঠি দু-তিনখানার উত্তর অবিলম্বে না দিলে নয়। এক খালাসির দরখাস্ত লিখছিলেন শুনে তিনি বিভূতিভূষণের সাহায্যপ্রার্থী। বিভূতিভূষণ যদি তাকে চিঠিগুলো ইংরেজিতে লিখে দেন, তবে তিনি বাঙালি বাবুকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবেন।

বিভূতিভূষণ আনন্দে রাজি হলেন। তিনি যে কয়েক দিন এখানে থাকবেন, মৌংপের চিঠি লিখে দেবেন, যা ইচ্ছে হয় পারিশ্রমিক দেবেন, সে বিষয়ে কিছু বক্তব্য নেই বিভূতিভূষণের। একটু পরে ভদ্রলোকের মেয়েরা চা নিয়ে এল। ভদ্রলোক বাঙালি বাবুর সঙ্গে মেয়েদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবাই বাংলা বলতে পারে বটে, কিন্তু তাদের বাংলা বোঝা নবাগত বাঙালি বাবুর পক্ষে বড় কষ্টকর হয়ে উঠছিল। কথাটা বিভূতিভূষণ তাদের বিনীতভাবে বুঝিয়ে বললেন। তাদের বাবা বর্মি ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন বিভূতিবাবুর বক্তব্য।

বাঙালি অতিথি বাটিতে সাদা গুঁড়ো দেখিয়ে জানতে চাইলেন, এগুলো খাওয়ার জিনিস কিনা। মেয়েরা যে ভদ্রতার খাতিরে অতিকষ্টে হাসি চেপে গেল, তা তাদের নিজেদের মধ্যে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় থেকে বিভূতিভূষণ সহজে বুঝতে পারলেন।

বড় মেয়েটি জানাল, এটা তানাখা। চন্দনকাঠের পাউডার, মুখে মাখে। বাঙালি অতিথিকে প্রশ্ন করে মৌংপে যখন জানলেন যে, তিনি দিন পনেরো মংডু থাকবেন, তখন তিনি তাকে রোজ সন্ধেবেলা তার গৃহে আসার অনুরোধ করলেন। তার বক্তব্য— বিভূতি এখানে চা খাবেন আর তার মেয়েদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথাবার্তা কইবেন। এতে ওদের শেখা হয়ে যাবে (স্পোকেন ইংলিশ)। আড়তের চিঠিপত্রও সে সময় লিখিয়ে নেয়া যাবে। ১ টাকা করে দেয়া হবে এ কাজের জন্য। বিভূতিভূষণ রাজি হলেন, ১ টাকা করে নিতেও তার আপত্তি নেই। তবে ২ ঘণ্টার বেশি তার পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না। কারণ তার নিজের অফিসের কাজ করতে হবে।

একদিন সমুদ্রের ধারে বিভূতিভূষণের দেখা হলো তার বন্ধু চট্টগ্রামবাসী সুকবি ও সুলেখক সুরেন্দ্র নাথ ধরের সঙ্গে। তিনিও মংডুতে বেড়াতে এসেছেন। দুজনে মিলে ঠিক করলেন— বেড়াতে যাবেন আরাকান-ইয়োমা রেঞ্জে। ওই দিকে নিবিড় সেগুন বন। সুরেন ধরের পায়ে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যেস অনেকদিন থেকেই। তাই বিভূতিভূষণের তার সঙ্গে আরাকানের ঘন বন দেখার ইচ্ছে জেগে উঠল।

সন্ধেবেলা মৌংপের বাড়ি গিয়ে মংডুর বাইরে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলায় তিনি অনেক ভয় দেখালেন। তাদের গন্তব্য স্থান আরাকান-ইয়োমা পর্বতশ্রেণী বন্য জন্তুসংকুল, দুষ্প্রবেশ্য ও প্রায় বসতহীন। মৌংপে জানালেন, ওখানে তাদের যথেষ্ট ফরেস্ট ইজারা করা আছে। ব্যবসা উপলক্ষে অনেকবার সেখানে গেছেন। আরাকান-ইয়োমা ফরেস্ট রেঞ্জ অত্যন্ত দুর্গম জায়গা। দুজন মাত্র লোকের পক্ষে সেখানে যাওয়া নিতান্ত দুঃসাহসের কাজ ছাড়া কিছু নয়। কথায় কথায় তিনি আরো বললেন, সেখানে গাড়ি যায় না, যেতে হয় হাতির পিঠে। কাঠ বয়ে আনার জন্য তাদের হাতি আছে জঙ্গলে, তার নিজেরই আছে দুটি হাতি। তার বড় মেয়েও তার সঙ্গে হাতিতে করে সেখানে একবার গিয়েছিল।

তিনি অবশ্য তার বাঙালি বাবুকে হাতির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। কিন্তু নদী পেরিয়ে সেসব হাতি এদিকে আসে না। চিঠি লিখে আনতে গেলে ১৫ দিন দেরি হয়ে যাবে। অগত্যা হাতির ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা বাদ দেয়া হলো।

মৌংপে সাহেব উঠে গেলে মেয়েটি বলল, যেহেতু ১০-১৫ দিনের বেশি সময় হাতে নেই বিভূতিভূষণের, সেজন্য তার আরাকান-ইয়োমা রেঞ্জ দেখার পরিকল্পনা তাকে ছাড়তে হবে। পায়ে হেঁটে গেলে এক মাসের মধ্যে ওখান থেকে ফেরা সম্ভব হবে না। মেয়েটি তাকে একটি বিকল্প ব্যবস্থার হদিস দিল। আর একটা পথ আছে— দেবার আর আরাকান-ইয়োমার মাঝখান দিয়ে সে রাস্তা চীন দেশ পর্যন্ত গেছে। এ পথে বর্মি গভর্মেন্টের ডাক যায় মংডু থেকে। বিভূতি বাবু মেল ভ্যানে (ডাকগাড়ি) সিংজু পর্যন্ত যেতে পারবেন, সেখান থেকে হেঁটে বাকি পথ যাবেন। মেয়েটি আরো বলল যে, সে ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। কিন্তু মেল ভ্যানে দুজন লোক নেবে না।

এরই মধ্যে সুরেন ধরও যেতে পিছিয়ে গেলেন। তার পক্ষে ১১ টাকা ভাড়া দিয়ে ডাকগাড়িতে যাওয়া সম্ভব না। অগত্যা বিভূতিভূষণ একাই ডাকগাড়িতে করে সিংজু রওনা দিলেন।

মংডু ছাড়িয়ে প্রথম ৫০-৬০ মাইল যেতে যেতে বিভূতিভূষণের মনে হলো যেন তিনি বাংলাদেশের নোয়াখালী বা ময়মনসিংহ জেলার ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। এমনকি আম-কাঁঠালের বাগানও চোখে পড়ে তার। ছোট-বড় গ্রাম সর্বত্র। বৌদ্ধ মন্দির, প্রত্যেক গ্রামেই আছে। আর আছে ছোটখাটো দোকানওয়ালা বাজার। দু-তিনটি চা বাগানও তার চোখে পড়ে। সিংজু পৌঁছে গেলেন প্রায় সন্ধ্যার সময়— সেই ডাকগাড়ির চালক হিন্দুস্তানি, তার সঙ্গে বিভূতিভূষণের ভাব হয়ে গেছে ততক্ষণে, রাতে তার তৈরি মোটা হাতরুটি খেয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। পরদিন সকালে মেল পিয়ন ডাকব্যাগ নিয়ে জঙ্গলের পথে অনেক দূর যাবে। তার সঙ্গে সিংজু থেকে বের হয়ে আকিয়াবে হাঁটা পথে যাত্রা শুরু করলেন।

আকিয়াব থেকে আরাকান-ইয়োমার পর্বতমালা বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। সমুদ্র উপকূলের সঙ্গে সঙ্গে আরাকান-ইয়োমা পর্বতমালা সমান্তরালভাবে আকিয়াব থেকে রেঙ্গুন পর্যন্ত চলে গেছে। পথে যেতে যেতে বিভূতিভূষণ এ অঞ্চলের বড় নদী সিতাং এবং তার শাখা-প্রশাখা পার হলেন। চেহারার দিক থেকে এখানকার অরণ্য প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাছের গুঁড়িতে গুঁড়িতে নানা রকমের পরগাছা। পরগাছায় অদ্ভুত সব রঙিন ফুল। আবার কোথাও ট্রি-ফার্ন।

বাংলাদেশের পরিচিত কোনো আগাছা, যেমন— শেওড়া ভাটা, কাল কাসুন্দি প্রভৃতি এদিকে একেবারে নেই। সর্বত্র অসংখ্য সবুজ বনটিয়ার ঝাঁক। বড় বড় বেতঝোপ। বিভূতিভূষণ ব্রহ্মদেশের এ অঞ্চলে রাবারের বাগান প্রথম দেখলেন। লিখেছেন, আগে রাবারের বাগান বলে বুঝতে পারেননি; বড় বড় গাছ, অনেকটা কাঁঠালপাতার মতো পাতা। গাছের গায়ে নম্বর মারা— কোনো কোনো বাগান কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা।’

আরাকান-ইয়োমার নিবিড় অরণ্য দেখার আশায় পথ হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে এল। এক জায়গায় ডাকপেয়াদার থাকার জন্য বনের মধ্যে ছোট খড়ের ঘর। বিভূতিভূষণের সঙ্গে যে ডাকপেয়াদা এসেছিল, সে আর এর বেশি যাবে না। রাতে তিনি ডাকপেয়াদার সঙ্গে সেই ঘরেই রইলেন। সকালে অন্যদিকের ডাকপিয়ন এসে এর কাছ থেকে ডাকব্যাগ নিয়ে যাবে, এ পেয়াদা নবাগত পিয়নের ব্যাগ নিয়ে চলে আসবে সিংজুতে।

পথের ধারে কাটানো সেই রাতটি বিভূতিভূষণের কাছে বড় অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে। দুধারে আরাকান-ইয়োমার পর্বতমালা, সানুদেশে নিবিড় অরণ্য, স্তব্ধতা ভঙ্গ করে পার্বত্য ঝরনার গান, অপরিচিত পাখির ডাক, বিভূতিভূষণের মনে হচ্ছিল এখানেই বুঝি পৃথিবীর একদিকের শেষ।

অনেক রাতে ডাকপেয়াদা এসে পৌঁছল। নতুন ডাকপেয়াদার নাম কাচিন, একটু একটু ইংরেজি জানে। লোকটির চেহারা এমন কর্কশ ও রুক্ষ যে, পথেঘাটে দেখলে ডাকাত বলে ভুল হওয়ার কথা। তার সঙ্গে সারা দিন কাটাতে হবে ভেবে প্রথমে বিভূতিভূষণ ইতস্তত করছিলেন, শেষ পর্যন্ত সকালবেলা তার সঙ্গেই নতুন পথে পা দিলেন। এবার পথ নিবিড় জঙ্গলে ভরা।

বন আরো ঘন, দুধারে বড় বড় বনস্পতি। মানুষ নেই, জন নেই, ঘরবাড়ি নেই, মাঠ নেই— একটুকু ফাঁকা স্থান নেই। কেবল নিবিড় জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে আকিয়াব থেকে প্রোমে যাওয়ার রাস্তা এঁকেবেঁকে চলছে। বড় বড় গাছের মাথা যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে— একেকটা গাছ প্রায় দেড়শ ফুট। বিস্ময়ে অভিভূত বিভূতিভূষণ লিখেছেন,

‘প্রকৃতি এখানে যেন ভৈরবীর বেশে দর্শকদের মনে ভীতি ও শ্রদ্ধার ভাব জাগিয়ে দেয়।’

একটি ছোট নদী পার হয়ে আবার ঢুকে পড়লেন বনের মধ্যে। বেলা প্রায় ১০টায়ও পাতার ঘন আস্তরণ ভেদ করে সূর্যের আলো নিচে নামে না। এবার প্রোম রোড পাহাড়ের উপর উঠছে। খুব বড় বড় ঘাস— হুগলা বা নলজাতীয়, তার মধ্যে দিয়ে পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা। মাঝে মাঝে আবার খুব চওড়া হয়ে এসেছে। ডাকপিয়ন সাবধান করে দিল, এখানে বুনোহাতির খুব ভয়। তার মুখে শোনা গেল, এ বনের মধ্যে গভর্নমেন্টের হাতি-খেদা আছে।

বছরে অনেক হাতি নাগা পাহাড়ের লিদু উপত্যকা থেকে এখানে আসে বার্মা ও আসাম সীমান্তের পাহাড়শ্রেণী ডিঙিয়ে— হাতির নাকি অগম্য স্থান নেই। কোনো উঁচু পাহাড়ই তার পথ রোধ করতে পারে না। বিকাল ৪টা বাজতে না বাজতেই বনে সন্ধ্যা নেমে এল। দুপুর থেকে ৪টার মধ্যে তারা খুব বেশি পথ অতিক্রম করেননি। বড়জোর আট মাইল। সকাল থেকে এ পর্যন্ত বিভূতিভূষণের মনে হলো ১৫ মাইলের বেশি পথ এগোতে পারেননি। খুব সতর্ক হয়ে চলতে হয় বলে বনের মধ্যে পথ এগোয় না।

বিকাল ৫টার মধ্যেই রীতিমতো অন্ধকার নেমে এল। তাদের আশ্রয়ের ঘর এখনো কত দূরে, তার ঠিকানা নেই। অথচ সঙ্গী ডাকপিয়ন বলছে— সামনেই ঘর। এ পথে ডাকপিয়ন সশস্ত্র চলে, তাই কতকটা রক্ষা। বিভূতিভূষণের সঙ্গী দেখতে বেঁটেখাটো কিন্তু তার দেহ যেন ইস্পাতের তৈরি। যেমন সাহসী, তেমনি আমুদে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কত রকমের হাসির গল্প করতে করতে এসেছে সারা পথ।

বনের মধ্যে যখন পথ দেখা যায় না, তখন আশ্রয় মিলল। পার্বত্য পথের ধারে। আবার খড়ের ঘর।

এত বড় নির্জন বনের মধ্যে তারা মোটে দুজন মানুষ। রাতে রান্না হলো শুধু ভাত। অন্য কোনো উপকরণ নেই— নুন পর্যন্ত না। এ দেশের লোকের নুন না হলেও চলে। এর আগেও বিভূতিভূষণ দেখেছেন যে, নুনকে এরা রান্নার একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ বলে আদৌ মনে করে না। সারা দিন হাঁটার পর শুধু ভাতই অমৃতের মতো লাগল।

রাতে শুয়ে শুয়ে ডাকপিয়নের মুখে শিকারের গল্প, বাঘের অত্যাচার আর তার ব্যক্তিগত জীবনের গল্প— অনেক রাত পর্যন্ত শুনলেন বিভূতিভূষণ।

প্রশ্ন করে জানলেন ডাকপিয়ন ইংরেজি শিখেছে প্রোমের মিশনারি স্কুল থেকে। তার সংসারে কেউ নেই। ১০ বছর হলো মা মারা গেছেন; তার বাড়িও নেই। ডাকপিয়নের কাজ করেই তার জীবিকা চলে। সিংজুতে বাসা নিয়ে থাকে। কথায় কথায় সে জানাল, তার ইচ্ছে বিয়ে করে কিন্তু সামান্য মাইনে পায় বলে সাহসে কুলোয় না।

বিভূতি তাকে বোঝালেন যে, এ দেশে তো তার চেয়ে কম মাইনে পেয়েও লোক বিয়ে করছে। মংডুতে তো সামান্য ফেরিওয়ালাকে সস্ত্রীক জিনিস ফেরি করতে প্রায়ই দেখা যায়। এর উত্তরে কাচিন যা বলল, তা বেশ অর্থপূর্ণ। ডাকপিয়নের বক্তব্য— ওরা লেখাপড়া জানে না, তাই অমন করে; কিন্তু একজন কাচিন ইংরেজি স্কুলে তিন-চার বছর পড়ে তো ওদের মতো ব্যবহার করতে পারে না! কবে যে তার প্রণয়িনীকে বিয়ে করতে পারবে ডাকপিয়ন তা জানে না।

লেখকের বক্তব্য

[বার্মা মুল্লুকে ইংরেজি লেখাপড়ার চল হয় বাংলাদেশের অনেক পরে। বাংলাদেশে যেমন ইংরেজি শেখার অভিঘাতে সমাজে একটি দৃঢ় বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল, বর্মায়ও তা-ই ঘটেছে। ওই ডাকপিয়ন কাচিন সামান্য ইংরেজি শেখার গুণে নিজেকে তার সমগোত্রীয় মানুষদের চেয়ে পৃথক ভাবতে শিখেছে।]

রাত পোহালে এদিকের ডাকপেয়াদা সেই খড়ের ঘরে হাজির হলো। ঠিক করা ছিল বিভূতিভূষণ তার সঙ্গে মারউক উ পর্বত পর্যন্ত ১৯ মাইল পথ হেঁটে যাবেন। কিন্তু কাচিন কথায় কথায় বলেছিল যে, পাহাড়-জঙ্গলের পথ এখানেই শেষ হয়ে গেল; এরপর আর বেশি জঙ্গল নেই। কেবল চোখে পড়বে রাবারের বন আর ধানক্ষেত। আবার জঙ্গল আছে মান্দালে ছাড়িয়ে গোয়েটেক সেতু পার হয়ে উত্তর-পূর্ব চীন সীমান্তে। সেদিকের বন অত্যন্ত নিবিড়, সে পথ অনেক বেশি দুর্গম।

এর পরের নবাগত ডাকপিয়ন খাস বর্মি ভাষা ছাড়া আর কিছুই জানে না। তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হলো না বিভূতিভূষণের। অবশেষে কাচিন তার সঙ্গে আলাপ করে বিভূতিভূষণকে জানাল যে, সাত মাইল পর্যন্ত এ রকম জঙ্গল আর পাহাড়। তার পরেই বার্মা রাবার কোম্পানির বড় একটা বাগান দু-তিন মাইল, তার পরে ধানের ক্ষেত আর বসতি। ঠিক হলো বিভূতিভূষণ এ নতুন পেয়াদার সঙ্গে সাত মাইল পর্যন্ত যাবেন। এরপর জঙ্গল না থাকায় হারিয়ে গেল তার আগ্রহ।

এ পথটির একটি চমত্কার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন বিভূতিভূষণ তার জাদুকরী ভাষায়: বনের মধ্যে সাদা সাদা কি এক ধরনের ফুল ছোট-বড় সব গাছের মাথা ছেয়ে ফেলেছে। কোনো লতার ফুল হবে কিন্তু লতা তার চোখে পড়ল না। খুব ঘন সুগন্ধ সে ফুলের। যে গাছের মাথায় সেই ফুলের মেলা, তার তলা দিয়ে যাওয়ার সময় উগ্র সুবাসে মাথার মধ্যে যেন ঝিমঝিম করে। বিভূতি ইচ্ছে করে খানিকটা দাঁড়িয়ে থাকলেন। মনে হলো যেন শরীর টলছে।

পথের ধারে একটি পাহাড়ি নদী, রাস্তাটা বনের মধ্যে ঘুরেফিরে নদীর ধারে এসে হঠাৎ খানিকটা ঢালু হয়ে নেমে নদীগর্ভে ঢুকেছে। সেই দিকটা এপার থেকে দেখাচ্ছে যেন চীনা চিত্রকরের হাতে আঁকা ছবির মতো। নদী চওড়া হবে হাত কুড়ি কি বাইশ। হেঁটে পার হতে হয়, হাঁটুজলের বেশি নেই কোথাও। এমন সময় বিভূতিভূষণ দেখলেন, ওপার থেকে পাঁচ-ছয়জন লোক একজন সম্ভ্রান্ত ব্রহ্মদেশীয় মহিলাকে সিডান চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে নদীতে নামাল (সিডান চেয়ার = চেয়ারের মতো বসে যাওয়ার পালকি)।

শোনলেন যে, এ দেশে সিডান চেয়ারের প্রচলন নেই; রাবার বাগানওয়ালা ধনী লোকেরা চীন ও মালয় উপদ্বীপ থেকে এটি আমদানি করেছে। মহিলাটি যখন ডাল পার হয়ে এলেন চেয়ারে বসে, তখন বিভূতিভূষণ দেখলেন— সাধারণ বার্মিজ মেয়ের তুলনায় তিনি অনেক বেশি সুশ্রী।

এপারে এসে সিডান চেয়ারের বাহকরা চেয়ার নামিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে আবার চেয়ার নিয়ে চলে গেল।

পরে সিংজুতে জিজ্ঞেস করে বিভূতিভূষণ জেনেছিলেন যে, এ যাত্রী মহিলা বার্মিজ নন, সানদেশীয় মেয়ে। সান নারীরা সাধারণত ব্রহ্মদেশীয় মেয়েদের চেয়ে অনেক সুন্দরী। মহিলাটি জনৈক ইউরোপীয় রাবার বাগানের মালিকের বিবাহিতা পত্নী। অনেক টাকার মালিক ওর স্বামী।

সেই দিনই বিভূতিভূষণ সিংজুতে ফিরে এলেন। ফিরতি পথে আবার সেই বনানী, সেই খড়ের ঘরে রাত্রিবাস শেষে নিরাপদেই, সুস্থ দেহে আবার মংডুতে ফিরে এলেন তিনি।

মংডুতে পৌঁছে মৌংপের সঙ্গে তিনি দেখা করতে গেলেন সন্ধেবেলা। মৌংপের বাড়ির সবাই তাকে পেয়ে খুব খুশি। মেয়েরা এ দেশের ভাষায় গান গেয়ে শোনাল। বিভূতিভূষণের কাছে ভ্রমণের গল্প শুনে রাতে তাকে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাল। বিভূতিভূষণ লক্ষ করেছেন, এখানকার লোকেরা যাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করে, তার সঙ্গে তাদের ব্যবহার নিঃসংকোচ হয়। আপনজনের মতো ব্যবহার করে।

বিভূতিভূষণ কখনো এদেশীয় খাবার খাননি, তাই তার ভয় ছিল হয়তো এমন সব খাবার পরিবেশন করা হবে, যা মুখে তোলা শক্ত হয়ে উঠবে। খাওয়ার সময় অবাক হয়ে দেখলেন, এমন কোনো খাবার তার জন্য হাজির করা হলো না, যা তার অপরিচিত।

মিষ্টি পোলাও, মাংস, মাছ, মায় সন্দেশ ও রসগোল্লা পর্যন্ত। বিভূতিভূষণ বড় মেয়েটিকে বললেন যে, তাদের বাড়ির রান্না ভারি চমত্কার— বাংলাদেশের রান্নার মতোই ধরন। মেয়েটি হেসে তাকে জানাল, এর একটাও তাদের বাড়ির রান্না নয়। তিনি এ দেশের রান্না মোটেই খেতে পারবেন না। তাই বাঙালি বাবুর্চি দিয়ে এসব পদ রান্না করানো হয়েছে। মিষ্টিও এসেছে মংডুর বাঙালি হিন্দু ময়রার দোকান থেকে। তবে তারা পোলাওটা রাঁধতে পারে। আর মংডু বাংলাদেশের কাছেই, বাঙালি খাবারের এখানে চল আছে।

পরদিন বিভূতিভূষণ মৌংপে ও তার মেয়েদের একটি বাঙালি হোটেলে নিমন্ত্রণ করলেন। দিনলিপিতে তিনি লিখেছেন, এ পরিবারটির সঙ্গে এত আলাপ হয়ে গিয়েছিল যে, সাতদিন পরে যখন মংডু ছেড়ে চলে আসেন, তখন তার সত্যি কষ্ট হয়েছিল। আসার সময় মৌংপে তার মেয়েদের নিয়ে জাহাজঘাটে তাকে বিদায় দিতে এলেন। মৌংপে সুন্দর চন্দনকাঠের ছোট বাক্সভর্তি সমুদ্রের কড়ি, ঝিনুক উপহার দিলেন তার অতিথিকে।

মংডু থেকে আবার চট্টগ্রামে এসে তার পূর্বপরিচিতের বাড়িতে উঠলেন বিভূতিভূষণ। সবাই ওকে পেয়ে খুব খুশি। বিভূতিভূষণের কাছেও এ পরিবারটি এত আপন হয়ে উঠেছিল যে, তার মনে হচ্ছিল কতদিন পরে তিনি যেন নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। ওদের বৈঠকখানার পাশেই মুলি বাঁশের দাওয়া ঘরখানা তার কত প্রিয়-পরিচিত হয়ে উঠেছিল, যেন তার কতদিনের গৃহ সেটি। এমনকি উঠানের বাতাবি লেবু গাছটির ছায়ায়ও যেন তার কতকালের পরিচিত আশ্রয়। বিভূতিভূষণ তার সে সময়ের মনের ভাব ব্যক্ত করছেন এমনই ভাষায়—

‘পথে পথে অনেকদিন বেড়িয়ে এই ব্যাপারটি আমি লক্ষ করেছি, মন যেখানে এতটুক আশ্রয় পায়, সেখানেই তার আঁকড়ে ধরে থাকবার কেমন একটা আশ্রয় গড়ে ওঠে। সে আশ্রয় যখন চলে যায় তখন মন আশ্রয়ন্তরে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে অত্যন্ত সহজে ও অবলীলাক্রমে।’

চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড হয়ে তিনি ঢাকাসহ আরো কিছু জেলা এবং ত্রিপুরার আগরতলা ঘুরে কলকাতায় ফিরে তার ৪১ নং মির্জাপুর স্ট্রিটের মেস বাড়িতে ঠাঁই নিলেন।

তার পূর্ববঙ্গ ও মংডু সফর সব নিয়ে সম্ভবত ছয়-সাত মাসের মতো হবে। বিভূতিভূষণ তার দিনলিপিতে দিন, মাস, সন, তারিখের তেমন তোয়াক্কা করেননি বলেই এ অনিশ্চয়তা। মংডুতে কোথায় ছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি কোনো উল্লেখ করেননি। যেহেতু মংডুতে কিছু হিন্দু বাঙালি চিকিৎসক, উকিল ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, সে কারণে অনুমান করা সম্ভব যে, তিনি হয়তো গোরক্ষা সমিতির কোনো পরিচিতের বাড়িতে অতিথি হয়ে উঠেছিলেন। তবে মংডুতে বাঙালি আবাসিক হোটেল/মেস থাকাও বিচিত্র নয়। মংডুর বাঙালি সমাজ নিয়ে বিভূতিভূষণ কোনো উল্লেখ করেননি। মংডুর প্রধান আকর্ষণ তার জন্য ছিল অরণ্যের হাতছানি। তবে কেশোরাম পোদ্দারের সমিতির কাজও তার এখানে করতে হয়েছিল।

তিনি নিজেই মৌংপেকে বলেছেন যে, সন্ধ্যার পর, রাতে তাকে নিজের অফিসের কাজ করতে হবে। দুই বঙ্গ ভ্রমণের সময় তিনি ভ্রাম্যমাণ প্রচারক হিসেবে কী কী বক্তৃতা করেছিলেন বা পূর্ববঙ্গের গবাদি পশুর অবস্থা বা তার বক্তৃতা বা কার্যক্রমে কী প্রতিক্রিয়া স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে হয়েছিল, তার কোনো উল্লেখ তার দিনলিপিতে নেই।

কেশোরাম পোদ্দারকে তিনি সর্বত্রই নিয়মিত রিপোর্টে এসব ব্যাপার সবিস্তারে উল্লেখ করেছিলেন বলে ধারণা করা অসঙ্গত হবে না। তার লেখা সেই সব বিস্তারিত প্রতিবেদন হয়তো আজ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ বিবরণগুলো থেকে মংডুসহ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক জীবনের অনেক খুঁটিনাটি তথ্য জানা যেত।

মংডুতে প্রবাসী বাঙাালিদের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে (মংডুর বাঙালিদের নিয়ে বিভূতিভূষণ কোনো আলোচনাই করেননি) সামাজিক যোগাযোগ, প্রীতি ও সহাবস্থানেরও একটি খণ্ডচিত্র পাওয়া যেত। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছরে আগের মংডুর শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা বা সে সময়ের সামাজিক সম্প্রীতি এখন অতীতের কাহিনী। জাতিবিদ্বেষ ও হিংসার বিষে সমগ্র আরাকান আজ ছেয়ে গেছে। বিভূতিভূষণের দেখা মংডুর মৌংপে সাহেব আর তার পরিবারের সদস্যরা— সবই বিস্মৃতির কালো মেঘে ঢেকে গেছে। কালের গ্রাসে হারিয়ে গেছে সবই।

কলকাতায় ৪১ নং মির্জাপুর স্ট্রিটের পুরনো মেসে ফিরে এসে বিভূতিভূষণ কেশোরাম পোদ্দারের গোরক্ষণা সভার প্রচারকের পদে ঠিক ইস্তফা দেন। পরে কলকাতার খেলাত্চন্দ্র ঘোষের পৌত্রের প্রাইভেট সেক্রেটারি  হিসেবে কবে থেকে তাজ শুরু করেনে তার সঠিক দিনক্ষণ জানা যায় না।

দিনলিপি থেকে এটুকু জানা যায়, ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি সিদ্ধেশ্বর ঘোষের ভাগনেকে পড়াতে যেতেন। বিভূতিভূষণ ১৯২৩ থেকে প্রায় একটানা ১৯৪১-এর শেষ পর্যন্ত খেলাত্চন্দ্র ঘোষ এস্টেটের অধীনে কোনো না কোনো পদে নিযুক্ত ছিলেন। তার অসাধারণ সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’ তার জীবনের এ পর্বেই রচিত হয়েছিল।

SHARE