Home শীর্ষ সংবাদ বিশ্বময় বাংলা ভাষা

বিশ্বময় বাংলা ভাষা

420
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২১ ফেব্রুয়ারী) :: দেশ ছাড়িয়ে বাংলা ভাষা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হয়ে উঠেছে বাংলা। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে ভাষাটি।

বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি এখন বিশ্বের ১৯০টি দেশের মানুষ ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। ৩০টি দেশের ১০০টি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হচ্ছে।

পাঠ্যসূচিতে জায়গা করে নিয়েছে বাংলা ভাষার আন্দোলন, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। ছয়টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল রয়েছে। আরো ১০টি দেশের রেডিওতে বাংলা ভাষার আলাদা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনে বাংলা অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা পত্রিকা। একটি দেশ বাংলাকে সে দেশের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এমনকি ইন্টারনেটের মাধ্যমেও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে ভাষাটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক অনেক আগেই সংস্থাটির ভাষার তালিকায় বাংলা জুড়ে দিয়েছে।

ইন্টারনেটে বাংলা বøগিং বাড়ছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বøগ সাইটটি বাংলা। বহুল ব্যবহৃত গুগলের অ্যাডসেন্সে নিজের স্থান বেশ শক্ত করে দখল করে নিয়েছে বাংলা ভাষা।

সর্বশেষ বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা করা হলে যেকোনো ব্যক্তি জাতিসংঘের বিভিন্ন দফতরে, বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলায় কথা বলতে পারবেন।

ওই কথা তখন অন্য ছয়টি ভাষায় একইসঙ্গে ভাষান্তর হবে। জাতিসংঘের প্রস্তাব ও যে আইনগুলো পাস হবে তার সবই বাংলায় ভাষান্তর হবে। কিছু বাঙালি লোকের চাকরি বাড়বে, অনুবাদকদের চাকরি বাড়বে। এ সুযোগগুলো তৈরি হবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটসহ বাংলা ভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারে গবেষণারত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিশ্বময় বাংলা ছড়িয়ে পড়ার এসব তথ্য জানা গেছে। এসব সংস্থা বাংলা ভাষার উন্নয়ন, রক্ষা ও প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাকে বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে দিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করা মেধাবী বাঙালি তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য এই ভাষার চর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন বইপুস্তক বাংলা অনুবাদ করার উদ্যোগ নিতে হবে। আকাশ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির কারণে এখন এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ভাষা রপ্ত করছে। কিন্তু নিজ ভাষা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিকৃত না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

তবে গবেষকরা বাংলা ভাষার বিস্তার ও সুরক্ষায় সতর্কতার সঙ্গে বাংলা ভাষা চর্চার পরামর্শ দেন। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাঙালি জাতি যদি সতর্কতার সঙ্গে তাদের ভাষা চর্চা করে তবে এর কোনোদিন বিলুপ্তি হবে না। আর এই ভাষা চর্চার যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে তা রক্ষা হলে বাংলা ভাষা দিন দিন আরো শক্তিশালী হবে।

এই ফোকলোরবিদ ও গবেষক আরো বলেন, আমরা ইংরেজি চর্চা করলেও আমাদের ভাষাকে অবনমিত হতে দেইনি। ইংরেজির চর্চায় কোনো দোষ নেই। একটি দেশে দুই থেকে তিনটি ভাষার চর্চা হতেই পারে। তা একটি জাতির জন্য শুভ লক্ষণ। আমরা অর্থনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এর ফলে আমাদের ভাষার প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে। অনেকেই ভবিষ্যতে বাংলা চর্চা করবেন। তবে এই ভাষার প্রসারের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে।

গবেষকদের মতে, বিশ্বে প্রচলিত ৬-৮ হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা স্বমর্যাদায় আপন স্থান অধিকার করে আছে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীন দেশে প্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাতৃভাষার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। সেই থেকে বিশ্বময় পদযাত্রা শুরু বাংলা ভাষার। এর আগে ১৯১৩ সালে এশিয়াবাসীর মধ্যে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয় করে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে পরিচিত করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই মুহূর্তে বিশ্বে প্রায় ৩২ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ২০৫০ সাল নাগাদ কেবল ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী বাংলা ভাষীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রচলিত ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার বিবেচনায় বিশ্বে বাংলার স্থান চতুর্থ। আর ভাষিক বিচারে বাংলার স্থান সপ্তম। বিশ্বের সেরা ১০-১১টি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম।

জানা গেছে, বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরালিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা বাংলা। ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ বাংলাকে সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। সিয়েরালিওনে গৃহযুদ্ধকালে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সেনা সদস্যদের ভ‚মিকার কারণেই বাংলাকে অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সংসদ বাংলাকে স্বীকৃতির বিল পাস করে।

এছাড়া ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত প্রধান ভাষা বাংলা। বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের কাছার জেলায় প্রচুরসংখ্যক বাংলাভাষী মানুষ বাস করে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার প্রশাসনিক ভাষা বাংলা। কাছার জেলারও অন্যতম প্রশাসনিক ভাষা বাংলা। ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে তালিকাভুক্ত ১৮টি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে ও ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের হিথরো বিমানবন্দরে বাংলাতে ঘোষণা দেওয়া হয় বলেও জানান বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা।

সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই মুহূর্তে বহির্বিশ্বে ৩০টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু রয়েছে বাংলা বিভাগ। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার অবাঙালি পড়ুয়া বাংলাভাষা শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করছে। এছাড়া চীনা ভাষায় রবীন্দ্র রচনাবলির ৩৩ খÐের অনুবাদ এবং লালনের গান ও দর্শন ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

এর মধ্যে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি, প্যাট্রিস লুলুম্বা গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ও সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, চীন যোগাযোগ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানো হচ্ছে।

এর বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ রয়েছে। দেশটির অন্য ভাষাভাষী রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজেও এ বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে।

তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, ব্রিটেনে ছয়টি ও আমেরিকায় ১০টি বাংলাদেশি মালিকানাধীন ও বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। এর মধ্যে ব্রিটেনের বিবিসি, আমেরিকার ভয়েজ অব আমেরিকা, জার্মানির ডয়েসে ভেলে, রেডিও জাপান, চীন আন্তর্জাতিক বেতার থেকে বাংলায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।

মস্কো রেডিও কিছুদিন আগ পর্যন্ত বাংলায় অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। ক্যাথলিক চার্চের প্রচারমাধ্যম রেডিও চ্যানেল রেডিও ভেরিটাস থেকে বাংলায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। বিট্রেনে ১২টি বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয়। ‘বেতার বাংলা’ নামে সেখানে একটি বাংলা রেডিও স্টেশন রয়েছে। ইউরোপের ইতালিতে বর্তমানে পাঁচটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা এবং রোম ও ভেনিশ শহর থেকে তিনটি রেডিও স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে।

ইতালি থেকে ছয়টি অনলাইন টেলিভিশন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে শতাধিক ফেসবুক টেলিভিশন চালু রয়েছে। এছাড়া ডেনমার্ক সুইডেনসহ ইউরোপের আটটি দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে বাংলা ভাষার মুদ্রিত ও অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

এর বাইরে ভারত ও বাংলাদেশের পর ব্রিটেন ও আমেরিকাতে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে।

এছাড়া চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও বাংলা ভাষার সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে। আমেরিকায় কমপক্ষে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও এশীয় গবেষণা কেন্দ্রে পড়ানো হচ্ছে বাংলা ভাষা।

এমনকি এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় সেখানে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালিদের সুবিধার্থে ব্যালট পেপারে বাংলা ভাষাও যুক্ত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

SHARE