Home অর্থনীতি ব্যাংক লুটেরাদের একটিও বিচার সুরাহা হয়নি

ব্যাংক লুটেরাদের একটিও বিচার সুরাহা হয়নি

180
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৭ ফেব্রুয়ারি) :: স্বাধীনতার ৪৭ বছরে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত অনেক দূর এগিয়েছে। আবার অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারিতেও জর্জরিত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। অনিয়ম-দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা চলে গেছে লুটেরাদের পকেটে। ভুয়া এফডিআরের কাগজপত্র জমা দিয়ে, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা হয়ে এমনকি জাল দলিলেও অনুমোদন হয়েছে মোটা অঙ্কের ঋণ।

অথচ একটি কেলেঙ্কারিরও বিচার হয়নি। সাজা পাননি অভিযুক্তদের কেউ। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড় দেয়া হয়েছে। দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। বছরের পর বছর মামলা চলছে।

অভিযুক্তদের কেউ জেলে আছেন, কেউ চিকিৎসার নামে হাসপাতালে আরাম-আয়েশে আছেন। অনেকে জামিন পেয়েছেন। কেউ বা পালিয়ে লাপাত্তা। কিন্তু সুরাহা হচ্ছে না কোনো ঘটনার। সাজা হয়নি সংশ্লিষ্ট অপরাধীর। টাকাও ফেরত আসেনি।

বিচার না হওয়ায় নামে-বেনামে ঋণ যেমন বেড়েছে; তেমনি বেড়েছে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার প্রবণতা। গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাত থেকেই ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার প্রায় ৯০ ভাগই ফিরে না আসার অবস্থায় রয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলো এসব ঋণকে খেলাপি ঘোষণা করছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন আহমেদ একটি হিসাবের ভিত্তিতে বলেন, ১১ বছরে (২০০৪-১৪) সাড়ে ৬ হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। নয় বছর পর সেই খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ।

এর বাইরে আরো ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। লুকিয়ে রাখা এই বিশাল অঙ্ক খেলাপি ঋণ হিসাবের বাইরে রয়েছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ব্যাংক খাতের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দেশের আর্থিক খাত ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খুবই নাজুক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাই বেশি খারাপ। অবশ্য বর্তমানে সরকারি ব্যাংকের এমডি চেয়ারম্যানরা ভালো কাজ করছে।

এখানে আর দুষ্টু লোকের দায়িত্ব না দিলেই ভালো থাকবে। তিনি বলেন, মূলত, একটি চক্রের হাতে আর্থিক খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকার আর্থিক খাতের কেলেঙ্কারির বিষয়ে তদন্ত করালেও এ খাতের রাঘব বোয়ালদের চাপে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে না। সরকার দেশ চালাতে গেলে কিছু জায়গায় অদৃশ্যভাবে বাধা থাকে। যার ফলে কিছু করার সামর্থ্য থাকে না সরকারের।

রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করা প্রসঙ্গে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, রির্জাভ চুরির মূল হোতারা বহাল তবিয়তেই আছে। শুধু তাদের নাম প্রকাশ হয়ে যাবে, এমন ভয়ে বারবার দিনক্ষণ ঠিক করেও দেশের রাজকোষ চুরির রিপোর্ট প্রকাশে গড়িমসি হচ্ছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে প্রত্যেক দুর্নীতির সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে। আবার ওই পর্ষদের সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিংবা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। তাই অনিয়মের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ সংস্কৃতি দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেয়, আবার অন্যকে দুর্নীতি করতে উৎসাহ জোগায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মূলত সুশাসনের অভাব থেকেই একের পর আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের অর্থনীতিই ঝুঁকির মধ্যে চলে যাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো অনেক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।

আর্থিক এসব জালিয়াতি কমাতে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে বরখাস্ত, বদলি নয়; অপরাধের দায়ের শাস্তি দিতে হবে।

এ ছাড়া সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সঠিক জায়গায় বসাতে হবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নিতে হবে, এ প্রতিষ্ঠানটিকে মূল ব্যাংকিংয়ের দিকে নজর দিতে হবে।

তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মধ্যে দ্ব›দ্ব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ দেয়া উচিত।

আর্থিক খাতের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১) ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ডলার চুরির ঘটনা। ফিলিপাইনের একটি ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ নগদায়ন হয়। এ পর্যন্ত দেড় কোটি ডলার উদ্ধার হয়েছে। বাকি অর্থ ফেরতের চেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

২) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরের মাত্র ১১টি পর্ষদ সভায় ৩ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়। এভাবে অনিয়ম করে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার মতো ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে তা হাতিয়ে নেয়া হয়। ৩) ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক নামক একটা প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয় যা বর্তমানে কুঋণে পরিণত হয়েছে। ৪) ২০১১ ও ২০১২ সালে টেরিটাওয়েল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ গ্রুপ দেশের পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। (জনতা ৩৯২ কোটি, প্রাইম ৩০৬ কোটি, যমুনা ১৬ কোটি, শাহজালাল ১৪৮ কোটি, প্রিমিয়ার ৬২ কোটি টাকা)।

৫) আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দীকী নাজমুলের মালিকানাধীন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের ছয়টি শাখায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম পাওয়া যায়। বর্তমানে জনগণের সংরক্ষিত আমানত ফেরত দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে ব্যাংকটি। ৬) ৭৪১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম দেখা যায় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে।

৭) জনতা ব্যাংক ২০১০-২০১৫ সালের মধ্যে আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ প্রদান নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে অ্যাননটেক্স নামে একটি গ্রুপকে ৫ হাজার ৪০৪ কোটি টাকার ফান্ডেড, নন-ফান্ডেড ঋণ প্রদান করে। যা বর্তমানে পুরোটাই ফান্ডেডে পরিণত হয়েছে। ৮) গত ১৯৯৬-২০০১ সালে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে শেয়ারবাজারে। সেই কেলেঙ্কারির মামলা এখনো বিচারাধীন। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরের বছর দেশে দ্বিতীয়বারের মতো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটে। এ ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের হিসাবে ওই কেলেঙ্কারিতে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

৯) ২০১২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বহুস্তরবিশিষ্ট বিপণন কোম্পানি ডেসটিনির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আত্মসাতের পরিমাণ ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকার কথা বলেন। ১০) বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক কেলেঙ্কারি ছিল সবচেয়ে আলোচিত। সাবেক ওরিয়েন্টাল ও বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে ২০০৬ সালে।

ব্যাংকটির তৎকালীন উদ্যোক্তারা অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেন প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এ কারণে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়। এ কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকটি পুনর্গঠন করতে হয়। বিক্রি করা হয় বিদেশি একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে। ১১) ২০০২ সালে ওম প্রকাশ আগরওয়াল নামের এক ব্যবসায়ী জালিয়াতির মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই পাঁচ ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ করেছিল। ১২) জাহাজ রপ্তানির চুক্তিপত্র দেখিয়ে দেশের ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৬শ কোটি টাকার ঋণ নেয় আনন্দ শিপইয়ার্ড। ১৩) ঢাকা ট্রেডিং হাউস, টিআর ট্রাভেলস বা ঢাকা ট্রেডিং হাউস লিমিটেড- এই তিন প্রতিষ্ঠানেরই কর্ণধার টিপু সুলতান। ভোগ্যপণ্য ব্যবসার নামেই সরকারি-বেসরকারি প্রায় ১০টি ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেন টিপু সুলতান। যদিও তা বিনিয়োগ করেন পরিবহন ব্যবসা টিআর ট্রাভেলসে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা। এতে বিপাকে পড়েছে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো।

এ ব্যবসায়ীর কাছে আটকে গেছে তাদের বড় অঙ্কের এ ঋণ। ১৪) জনতা ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখা থেকে সুতা রপ্তানির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রানকা সোহেল লিমিটেডের ১১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা বেরিয়ে আসে।

২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে অনিয়ম উদ্ঘাটন হয়। বর্তমানে রানকা সোহেল কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস্, রানকা ডেনিম টেক্সটাইল মিলস্সহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ৩৫২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। ১৫) চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২০টি ব্যাংকের শাখা থেকে এইচআর গ্রুপ অভিনব কৌশলে ৯৩৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করে। ২০১৪ সালে পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে আসে। ১৬) রূপালী ব্যাংক থেকে বেনিটেক্স লিমিটেড, মাদার টেক্সটাইল মিলস ও মাদারীপুর স্পিনিং মিলস নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এর ৮০১ কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার অগ্রণী ব্যাংক থেকে বহুতল ভবন নির্মাণে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ৩শ কোটি টাকা ঋণ নেয় মুন গ্রুপ।

SHARE