Home চাকুরি চাকরি করবেন না, চাকরি দেবেন

চাকরি করবেন না, চাকরি দেবেন

358
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ মার্চ) :: আমাদের বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ বাস্তবতায় পারিবারিক, সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য পাস করা একজন তরুণের মনে জোর করে হলেও চাপিয়ে দেয়া হয়, তাকে প্রথমত একটি সরকারি চাকরি পেতেই হবে। তা যদি না-ই হয়, তাহলে একটি বেসরকারি চাকরি হলেও পেতে হবে এবং চাকরিটি যত শারীরিক, মানসিক কষ্টেরই হোক না কেন, সেটি করতে পারতেই হবে। তিনি যত স্বাধীনই থাকতে চান না কেন চাকরি তাকে পেতেই হবে; করতেও হবে। ‘পড়া লেখা করেছ, উচ্চশিক্ষিত হয়েছ আর চাকরি করবে না এটি কীভাবে হয়?’— এই হচ্ছে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, মধ্যবিত্ত মানসিকতা।

বিষয়টি এমন যে, চাকরি করার জন্যই একজন তরুণকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ সরকারি চাকরি না পেলে যেন সমাজে বাবা-মার প্রেস্টিজ থাকে না। অনেক চেষ্টা করেও যখন সরকারি চাকরিটি পায় না, তখন মা-বাবার সর্বশেষ প্রত্যাশা থাকে, ছেলে একটি বেসরকারি চাকরি হলেও করবে! শুধু তা-ই নয়, মধ্যবিত্ত হোক আর নিম্নমধ্যবিত্ত হোক, বিয়ের বাজারে কন্যার বাবা যখন পাত্র খোঁজেন, তখন প্রথমেই সরকারি চাকরিজীবী পাত্রটিই খোঁজেন। কিছু না হলেও অন্ততপক্ষে একটি বেসরকারি চাকরিজীবী পাত্র হতেই হবে। যদি হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা পাত্র, তাহলে সে বিয়ের প্রস্তাব বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাতিলের খাতায় নাম লেখায়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকারি বলি আর বেসরকারি বলি, একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণের উপযুক্ত চাকরির সুযোগটাইবা কতটুকু আছে আমাদের দেশে? সরকারি চাকরির সুযোগ খুবই সীমিত। তবে বেসরকারি চাকরির সুযোগ সরকারি চাকরির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য যে পরিমাণ উপযুক্ত চাকরির প্রয়োজন, সে পরিমাণ চাকরির সুযোগ নেই। এ বাস্তবতা পরিবার, সমাজ সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে।

হ্যাঁ, চেষ্টা করতে হবে সরকারি-বেসরকারি ভালো চাকরির। কিন্তু না পেলে কি জীবন থেমে থাববে? না জীবনকে কোনোভাবেই থেমে থাকতে দেয়া যাবে না। কোনোভাবেই যা পাই তা-ই করব ধরনের চাকরি করে একেকটি জীবনকে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেয়া যাবে না।

পারিবারিক, সামাজিক চাপটি এমন পর্যায়ে থাকে যে, উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের যা পাই তা-ই করতে এক প্রকার বাধ্য করা হয়। আর এ সুযোগটিই নিয়ে থাকে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। যে পদে একজন ইন্টারমিডিয়েট পাস মানুষের প্রয়োজন, সেখানে ইন্টারমিডিয়েট পাসের বেতন দিয়ে মাস্টার্স পাস একজন মানুষকে খাটানো হয়। উদাহরণস্বরূপ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধি নামে একটি পদ আছে।

এ পদে কাজ করার জন্য একজন ইন্টারমিডিয়েট পাস মানুষই  যথেষ্ট। কিন্তু সেখানে নেয়া হয় মাস্টার্স পাস। সামাজিক, পারিবারিক চাপের কারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চাকরি চাইয়ের এ দেশে অবমূল্যায়িত পদেও হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণ দরখাস্ত করতে বাধ্য হন।

আর এ সুযোগেই নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা  এ অভাগা তরুণদের যেন চরম দয়া করে একটি চাকরি দেন! এটি   শুধু বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেই  নয়; সরকারি চাকরিতেও যোগ্যতার চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক নিচের পদে যোগদানের ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। এমনও ঘটে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত একই বিভাগ থেকে পাস করা দুই বন্ধু কর্মক্ষেত্রে একজন আরেকজনের ঊর্ধ্বতন বসও হয়ে যান।

এসব চাকরিতে যোগদান করার পর বেশির ভাগ তরুণ এক সীমাহীন মনঃকষ্টে ভোগেন। বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দেখেন যে, চাকরিটি আসলে তার শিক্ষাদীক্ষা, বেড়ে ওঠার পরিবেশ কোনো কিছুর সঙ্গেই যায় না। কিন্তু তার পরও শুধু  সেই পারিবারিক, সামাজিক চাপের কারণে বলি আর বেকারত্ব নামের চরম নিগৃহীত একটি শব্দ যাতে তার নামের সঙ্গে না লেগে যায়, সেজন্যই দিনের পর দিন এ কষ্টকর চাকরিটি করতে বাধ্য হন। কিন্তু পরিণাম কী হয়? শারীরিক কষ্টের চেয়েও মারাত্মক মানসিক কষ্টে একসময়ের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা উচ্ছল তরুণটি মাত্র ১০-১২ বছরের মধ্যেই ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলেন। চরম হতাশা এসে বাসা বাঁধে। নিজের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।

সমাজ থেকে যেন এক পলাতক জীবন যাপন করেন। দিন যত যেতে থাকে, মানসিক কষ্টের কারণে নানা রোগব্যাধিও শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করে। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এর মধ্যে কিছু মানুষ একটা পর্যায়ে গিয়ে আর পারে না। এ তথাকথিত অবমূল্যায়িত চাকরি ছেড়ে জীবনের মধ্যগগনে এসে নিজেই একটা কিছু করার উদ্যোগ নেয়। জীবনের মধ্যগগনে নেয়া উদ্যোগে কেউ সফল হয় আবার কেউবা হয় না। এভাবেই কেটে যাচ্ছে এ দেশের হাজারও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবন।

কিন্তু উপরের ঘটনাগুলোর মতো না হয়ে যদি চিত্রটি অন্য রকম হতো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা সব তরুণকে চাকরি করতে হবে— এ ধারণা আমাদের পরিবার, সমাজ সব স্তরে পরিবর্তন করতে হবে। কারণ সবাইকে সরকারি, বেসরকারি কোনো জায়গাতেই চাকরি দেয়া সম্ভব নয়। একটি বয়স পর্যন্ত চাকরির চেষ্টা করতেই পারেন। কিন্তু না পেলে কী করবেন? মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেই যা পাই তা-ই করবেন? মোটেই নয়; সেটি পরিবার, সমাজ কারো জন্যই ভালো হয় না।

এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে আমাদের উদ্যোক্তা হতে হবে; তৈরি করতে হবে। অনেকে ছোটবেলা থেকেই উচ্চশিক্ষা নিয়েও স্বাধীন পেশায় থাকবেন বলে ভাবেন। কিন্তু পরে সেই পারিবারিক-সামাজিক চাপ, উদ্যোক্তা হওয়ার পথে নানা বাধা, সামাজিক অবস্থান, সামাজিক স্বীকৃতির অভাব, উদ্যোক্তা হতে যে ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন, তার অভাবে একসময় চাকরিতে যোগ দেয়াটাকেই শ্রেয় মনে করেন বেশির ভাগ তরুণ। কাজেই যে সমস্যাগুলোর কথা এখানে বললাম, সেগুলো ডিঙিয়ে আমাদের প্রচুর উদ্যোক্তা তৈরির পথেও হাঁটতে হবে। কারণ দেশকে বিশ্বের বুকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করাতে হলে আমাদের প্রচুর উদ্যোক্তারও প্রয়োজন আছে।

পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অনেক তরুণ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই ভাবতে পারেন, তিনি পাস করে চাকরি করবেন না, চাকরি দেয়ার জন্য উদ্যোক্তা হবেন। কারণ দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথটি মোটেই মসৃণ নয়। সীমাহীন বাধার পাহাড় পেরিয়ে এ দেশে  একজন সফল উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেন। বাধার পাহাড় অপসারণ করতে হবে।

প্রথমত. পরিবারকে বলব, আপনার সন্তানটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যদি বলেন, ব্যবসা করবেন বা উদ্যোক্তা হবেন, তাহলে মোটেই অবাক হবেন না দয়া করে। তাকে স্বাগত জানান এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। আপনার এ সহযোগিতা তাকে আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে অর্ধেক এগিয়ে  দেবে। আর সামাজিকভাবে একজন শিক্ষিত ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাকে স্বাগত জানান, সহযোগিতা দিন। বিয়ের বাজারের কন্যার পিতা শুধু চাকরিজীবী পাত্র না খুঁজে আপনার কন্যার যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষিত উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী পাত্রকেও বিবেচনায় নিন। রাষ্ট্র উদ্যোক্তা হওয়ার পথের সীমাহীন বাধার প্রাচীর অপসারণ করুন।

এগুলো করলে আমার মনে হয় অনেক তরুণই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে উদ্যোক্তা হওয়াকেও বেছে নেবেন। তারুণ্যের জীবনীশক্তি ক্ষয় হবে না। সারা জীবন পোড় খেয়ে বাধ্য হয়ে জীবনের মধ্যগগনে উদ্যোক্তা হওয়ার পথেও হাঁটতে হবে না কাউকে অথবা  ধুঁকে ধুঁকে জীবন নিঃশেষ করে দিতে হবে না। উদ্যোক্তা হবেন সজীব মানসিকতায় তরুণ বয়সে। জীবনের মাঝামাঝি সময় আসতে আসতে যেন সেই তরুণ উদ্যোক্তা সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারেন; জীবনকে উপভোগ করতে পারেন। জীবন তো একটিই, আর আমাদের বাংলাদেশের এ তরুণদের এক জীবনে ‘চাকরি করবেন না, চাকরি  দেবেন’— এ রকম একটি অপশনও থাক না!

 

SHARE