Home শিক্ষা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থী গমন বেড়েছে দ্বিগুণ : মালয়েশিয়ায় ৪২২ শতাংশ

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থী গমন বেড়েছে দ্বিগুণ : মালয়েশিয়ায় ৪২২ শতাংশ

239
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৭ মার্চ) :: উচ্চশিক্ষায় এক বছরেই বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শিক্ষার্থী গমন বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আর এ উল্লম্ফন মূলত মালয়েশিয়ায় শিক্ষার্থী গমন অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কারণে। ইউনেস্কোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, শুধু মালয়েশিয়াতেই শিক্ষা ভিসায় বাংলাদেশ থেকে গমন বেড়েছে ৪২২ শতাংশ। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন ৩৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশী শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শিক্ষার্থী গমন বৃদ্ধির এ হার স্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের প্রলোভনে স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।  বিভিন্ন এজেন্টের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা। কারণ শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি দেয় না দেশটি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য নিয়ে প্রতি বছরই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।

সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ৬০ হাজার ৩৯০ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ১৩৯। এ হিসাবে এক বছরে বিদেশগামী শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। তবে অস্বাভাবিক বেড়েছে মালয়েশিয়ায় শিক্ষার্থী গমন। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্যও এখন মালয়েশিয়া।

২০১৬ সালেই উচ্চশিক্ষার নামে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন ৩৪ হাজার ১৫৫ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। যদিও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন মাত্র ৬ হাজার ৫৩৪ জন।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া স্টাডি সেন্টার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহিম বলেন, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ভিসা দেয়ার নামে মালয়েশিয়ায় বড় একটি চক্র গড়ে উঠেছে। ভুয়া কলেজ খুলে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করছে তারা। এসব চক্র শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে বাংলাদেশী বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রে টিউশন ফি, ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ অন্য যে শর্তাবলি রয়েছে, তা অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ।

এসব কারণে মালয়েশিয়ায় শিক্ষার্থী গমনের হারও বেশি। তবে গত বছরের নভেম্বর থেকে এ হার অনেক কমে গেছে। কেননা মালয়েশিয়ার বেশকিছু ভুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ওই দেশের সরকার বন্ধ করে দিয়েছে।

স্টুডেন্ট ভিসার নামে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শিক্ষার্থী পাচারের বিষয়টি উঠে এসেছে সে দেশের গণমাধ্যমেও। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার স্টার মিডিয়া গ্রুপের তরুণদের নিয়ে সংবাদ পরিবেশনকারী প্ল্যাটফরম আর.এইজ।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, শিক্ষার্থী পাচারের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়ায় বেসরকারি বিভিন্ন কলেজ গড়ে উঠেছে। এসব কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত না হলেও ভর্তি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করছে পাচারকারী চক্র।

চাকরির প্রলোভনই শিক্ষার্থীদের মালয়েশিয়ামুখিতার মূল কারণ বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, দেশটির উচ্চশিক্ষার মান আমাদের দেশের চেয়ে ভালো বলা যাবে না। তার পরও পড়ালেখার পাশাপাশি কাজের আশায় দেশটিতে পাড়ি জমাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির প্রতারণারও শিকার হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মতো ২০১৬ সালেও বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশীদের দ্বিতীয় শীর্ষ গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন ৫ হাজার ৪৪১ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালেও সমসংখ্যক বাংলাদেশী উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে দেশটিতে পাড়ি দিয়েছেন।

আগের পরিসংখ্যানে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশীদের চতুর্থ শীর্ষ গন্তব্য ছিল অস্ট্রেলিয়া। সর্বশেষ হিসেবে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে দেশটি। ২০১৫ সালে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ৪ হাজার ৪১৯ জন বাংলাদেশী অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমালেও ২০১৬ সালে গেছেন ৪ হাজার ৬৫২ জন। অর্থাৎ এক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী বেড়েছে ২৩৩ জন।

বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় তৃতীয় থেকে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে যুক্তরাজ্য। ২০১৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশটিতে পাড়ি জমান ৪ হাজার ৮৬৮ জন বাংলাদেশী। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৯৯। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী গমন কমেছে ১ হাজার ২৬৯ জন।

জানা গেছে, ২০১০-১১ সালের দিকে যুক্তরাজ্যে গড়ে ওঠা নামসর্বস্ব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই কয়েক বছর পর বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী এতে অবৈধ হয়ে পড়েন। এর পর থেকেই উচ্চশিক্ষায় যুক্তরাজ্য গমন সেভাবে বাড়ছে না, বরং কমছে।

উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পঞ্চম শীর্ষ গন্তব্য কানাডা। ২০১৫ সালে দেশটিতে পাড়ি জমান ১ হাজার ৬১৪ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। যদিও ২০১৬ সালে ২ হাজার ২৮ জন শিক্ষার্থী উত্তর আমেরিকার দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন।

ষষ্ঠ শীর্ষ গন্তব্য জার্মানিতে ২০১৬ সালে পাড়ি দেন ২ হাজার ৮ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। একই বছর সপ্তম স্থানে থাকা ভারতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিয়েছেন। ২০১৫ সালে ৯৪৮ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেলেও ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৯ জনে। উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের শীর্ষ ১০ গন্তব্যের মধ্যে অষ্টম, নবম ও দশম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে সৌদি আরব, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ২০১৬ সালে দেশগুলোয় বাংলাদেশ থেকে পাড়ি দেন যথাক্রমে ৮৭০, ৮১০ ও ৬৩৭ জন শিক্ষার্থী।

সার্বিকভাবে উচ্চশিক্ষায় বিদেশগামিতার হার বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, একসময় বিদেশগামিতার হার আরো অনেক বেশি ছিল। পরে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশমুখিতা কমতে শুরু করে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের হার ধরে রাখা। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা বিদেশমুখী হবে, এটাই স্বাভাবিক।

SHARE