Home চাকুরি কর্মহীনতার ফাঁদে বাংলাদেশের যুবসমাজ

কর্মহীনতার ফাঁদে বাংলাদেশের যুবসমাজ

46
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১৫ এপ্রিল) :: দেশের কলেজগুলো থেকে যারা স্নাতক সম্পন্ন করছেন, দুই বছর পর্যন্ত তাদের ৭০ শতাংশই বেকার থাকছেন। আবার পলিটেকনিক থেকে যারা বেরোচ্ছেন, তাদেরও ৪০ শতাংশ থাকছেন বেকার। কলেজ থেকে বেরোনোর পর স্নাতকরা কর্মজীবনে কী করছেন, তা বুঝতে ও পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ট্রেসার স্টাডি অন কলেজ গ্র্যাজুয়েটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণার কাজ করছে বিশ্বব্যাংক।

প্রাপ্ত ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করলেও গত ৩১ মার্চ প্রকাশিত “বাংলাদেশ: স্কিলস ফর টুমেরো’স জবস” শীর্ষক প্রতিবেদনে স্নাতকদের কর্মজীবনের নানা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে এ চিত্র তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

এ বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মহীন থাকার কারণ কি দক্ষতার ঘাটতি, নাকি কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া? বিশ্বব্যাংক বলছে, এর পেছনে দক্ষতার ঘাটতি যেমন আছে, একইভাবে আছে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগও। এতে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের বিষয়টি জটিল রূপ নিচ্ছে।

কর্মক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ বিশেষভাবে প্রয়োজন। যদিও বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণের হার উল্লেখ করার মতো নয়। ১৫ বছরের বেশি বয়সী তরুণদের মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশের প্রচলিত শিক্ষার বাইরে কারিগরি প্রশিক্ষণ রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়ে অনাগ্রহী।

মূলত দুটি কারণে তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, মৌলিক শিক্ষার নিম্নমান এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এছাড়া যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষারও অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে দক্ষতা বিবেচনায় পিছিয়ে রয়েছে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। দক্ষতা উন্নয়নে নীতিগত কাঠামো তৈরির পাশাপাশি সময়োপযোগী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল পেতে কর্মীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। দেশের শিল্প খাতের জন্যও এটি প্রযোজ্য। এ দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম। সঠিক দক্ষতাসম্পন্ন প্রার্থীর অভাব বোধ করছে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী, স্নাতকদের ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেকার। এ প্রবণতাকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। পলিটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও রয়েছে উচ্চবেকারত্ব হার। দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন থাকতে হচ্ছে এসব তরুণকে। কর্মহীন থাকায় সামাজিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন তারা।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এ তরুণদের কাজে লাগাতে হবে মন্তব্য করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ। এদের কাজে লাগাতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। এজন্য প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অদক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এতে সম্পদের পরিবর্তে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে এ জনগোষ্ঠী।

উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে শিক্ষার। যদিও বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির বড় অংশ শিক্ষায় পিছিয়ে থাকায় উৎপাদনশীলতায় সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যমতে, উৎপাদনশীল খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির ২৩ দশমিক ৯ শতাংশের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। উৎপাদনশীল খাতে নিয়োজিতদের মধ্যে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর মাত্র ৪ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে কর্মে নিয়োজিতদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত উপকরণ তথা শ্রমের দক্ষ ব্যবহারের ওপর। উৎপাদন উপকরণ দক্ষভাবে ব্যবহার করা গেলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। অথচ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশে এখনো কম।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (ইউএন-এসকাপ) হিসাবমতে, বাংলাদেশে শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা এ অঞ্চলের দেশগুলো বিশেষ করে শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে নিচে। বাংলাদেশে শ্রমের গড় উৎপাদনশীলতা বছরে ৮ হাজার ডলার হলেও শ্রীলংকায় ২৩ হাজার, পাকিস্তানে ১৮ হাজার ও ভারতে তা ১৫ হাজার ডলার।

শ্রমের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে বলে জানান জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন পরিষদ (এনএসডিসি) সচিবালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত সচিব এবিএম খোরশেদ আলম।

তিনি বলেন, দক্ষতার বিষয়টি সরকার শিক্ষার বাইরে আলাদাভাবে বিবেচনা করছে। আগামীতে দক্ষতার বিষয়টি শিক্ষা খাত থেকে যেমনটা আসার কথা তেমনি আসবে, কিন্তু চাকরি হোক বা সেলফ এমপ্লয়মেন্ট হোক, কাজের উপযোগী হওয়ার জন্য আলাদা বিশেষ দক্ষতা লাগবে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকার দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে।

সরকারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও এখন পর্যন্ত ১১টি শিল্প খাতভিত্তিক কাউন্সিল হয়েছে। আরো তিনটি এ বছর গঠন করা হবে। দুই বছরের মধ্যে দেশে ২০টি শিল্প খাতভিত্তিক দক্ষতা কাউন্সিল গঠন হবে।

বেসরকারি খাতে কোন ধরনের শিল্পে কী ধরনের দক্ষতা দরকার হবে, সরকারের সহযোগী হিসেবে কাউন্সিলগুলো তা নির্ধারণ করবে বলে জানান খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়নে যুক্ত আমাদের যে ১৩ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর বাইরেও সরকার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আকারে কার্যক্রম আগামীতে নেবে।

আমরা মনে করি, যেভাবে আমরা দক্ষতা উন্নয়ন ও এসডিজি সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি, তাতে আমাদের জনশক্তি অদক্ষ থাকবে না। অচিরেই এসব কাজ দৃশ্যমান হবে। এ বছর আমরা জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করব।

SHARE