Home মিডিয়া ফটো সাংবাদিকতায় পুলিত্জার বিজয়ী বাংলাদেশী তরুণের গল্প

ফটো সাংবাদিকতায় পুলিত্জার বিজয়ী বাংলাদেশী তরুণের গল্প

186
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৭ এপ্রিল) :: গত সেপ্টেম্বরে একটি ছবি সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ব মানবতার ভিত। ছবিটি ছিল মৃত শিশুকে বুকে নিয়ে কান্নারত এক রোহিঙ্গা মায়ের চুমো খাওয়ার দৃশ্য। মায়ের ভালোবাসার কাছে সন্তানের লাশ কোনো ভেদরেখা টানতে পারেনি। ছবিটি মায়ের ভালোবাসার গভীরতা আর বিশ্বমানবতার নগ্ন রূপকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যেন। আর এ ছবিটির স্রষ্টা বাংলাদেশের মোহাম্মদ পনির হোসাইন।

এ ছবিটিই তাকে এনে দেয় সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতার সবচেয়ে সম্মানিত পুরস্কার পুলিত্জার। চলতি বছর ফটো সাংবাদিকতার জন্য পুলিত্জার কর্তৃপক্ষ রয়টার্সের সাতজন সাংবাদিকের ১৬টি ছবি নির্বাচিত করে। সেখানে এ ছবিটিসহ বাংলাদেশের পনিরের মোট তিনটি ছবি স্থান করে নেয়। তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে পুলিত্জার পুরস্কারের ইতিহাসে নাম লেখান।

ছবির গল্পে পনির হোসাইন বলেন, ‘দিনটি ছিল ১৪ সেপ্টেম্বর। আমি কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপে যাই ছবি তোলার জন্য। নৌকায় করে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের দৃশ্য খুঁজছিলাম। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কোনো নৌকার দেখা পাইনি। হাঁটতে হাঁটতে এক মাইল সামনে এগিয়ে যাই।

তখন হঠাৎ এক সিএনজিচালক বলল, ওইখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটা নৌকা ডুবেছে। সেই সিএনজিতে করেই আমরা দ্রুত সেখানে যাই। সেখানে অনেকেই স্বজন হারানোয় কান্না করছিল। সে সময় এ দৃশ্যটি আমার চোখে পড়ে। নৌকাডুবিতে মৃত শিশুকে বুকে নিয়ে মা কান্না করছে আর চুমো খাচ্ছে। হূদয়বিদারক দৃশ্যটি আমাকেও ব্যথিত করে। কিন্তু পেশাগত কারণে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে দৃশ্যগুলো আমি ক্যামেরায় ধারণ করি। রাতে রুমে ফিরে যখন ছবিগুলো দেখছিলাম, তখন আমি চোখের পানি আটকাতে পারিনি।’

ফটো সাংবাদিকতার প্রতি পনিরের প্রথম আগ্রহ সৃষ্টি হয় সপ্তম শ্রেণীতে। পত্রিকার পাতায় নানা ছবি তাকে আকর্ষণ করত। ভাবছিলেন, এ পেশাটা অনেক মজার। ৯টা টু ৬টা অফিস করার কোনো ঝামেলা নেই। সারা দিন ঘুরে ঘুরে ছবি তোলাই কাজ। এরপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিংয়ে পড়ার সময় ২০০৯ সালে নর্থ সাউথ ফটোগ্রাফি ক্লাব আয়োজিত ফটো কর্মশালায় তার প্রথম হাতেখড়ি। ২০১০ সালে কেনেন প্রথম ক্যামেরা ‘নিক্কন ডি-৯০’। ফটোগ্রাফিতে পনিরের প্রথম সাফল্য ছিল ২০১৬ সালে সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফিতে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হওয়া। পনির প্রথম কাজ শুরু করেন ইউএসএর জুমা প্রেসের সঙ্গে ২০১৫ সালে ফটো কন্ট্রিবিউটর হিসেবে। একই সময় ইতালির নূর ফটোগ্রাফিতেও কন্ট্রিবিউটর ছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত থমসন রয়টার্সে ফটোগ্রাফার হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু হয় ২০১৬ সালের ১ জুলাই। রয়টার্সের এশিয়া ফটো এডিটর ইনচার্জ আহমেদ মাসুদের মাধ্যমে জয়েন করেন। ফটোগ্রাফিতে তিনি বিখ্যাত অনেক ফটোগ্রাফারকেই অনুসরণ করেন।

এর মধ্যে ব্রাজিলের সেবাস্টিয়াও সালগাদো, মধ্যপ্রাচ্যের মুহাম্মদ মুহেইসেন, বাংলাদেশের আছেন জি এম বি আকাশ, এম আর হাসানসহ অনেকেই। ছবির জন্য ভালো লাইট পাওয়ার জন্য তিনি সাধারণত সকালে ও বিকালে বের হন। সপ্তাহে দু-তিনদিন তাকে লাইফস্টাইল, প্রকৃতি বিভিন্ন বিষয়ে ছবি তুলে পাঠাতে হয়। ছবি তোলা, ছবির ভাষায় কথা বলা তার নেশা ও ভালো লাগার বিষয়। তাই পেশা হিসেবে তিনি ফটোগ্রাফিকে বেশ উপভোগ করছেন। কাজের জন্য কোনো চাপ নয়। বরং ভালো লাগা থেকেই কাজগুলো করে থাকেন। পনিরের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাসাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জে। ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের খাজা আজমেরী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০০৭ সালে ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১২ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও ভালো ফলাফল না হওয়ায় হতাশ হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালে স্নাতক শেষ করেন।

ফটো সাংবাদিকতার জন্য ২০১৬ সালে ফুল স্কলারশিপে ফিলিপাইনের এটেনিও ডি ম্যানিলা ইউনিভার্সিটি থেকে ভিজ্যুয়াল জার্নালিজম বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। সেখানে তিনি ফটো সাংবাদিকতার নানা নিয়ম-কানুন ও এথিক্স আয়ত্ত করেন। পনিরের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান থানার গুয়াখোলা গ্রামে। বাবা মো. জামাল উদ্দিন ব্যবসায়ী ও মা এলিজা বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে পনির তৃতীয়। পনিরের ভবিষ্যৎ ইচ্ছা রয়টার্সের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কাভার করা।

SHARE