Home মিডিয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সেন্সরশিপ, নাকি সেল্ফ-সেন্সরশিপ?

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সেন্সরশিপ, নাকি সেল্ফ-সেন্সরশিপ?

152
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৩ মে) :: স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এমন ঘটনা আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বেশি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল নাইন্টিন এই তথ্য জানিয়েছে।

এদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখন ১৪৬ নম্বরে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা সেল্ফ-সেন্সরশিপের মধ্যে ঢুকে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যম পরিচালক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণমূলক আইন দিয়ে নিপীড়নের প্রচেষ্টা যেমন আছে, তেমনই নিজে থেকেও দলীয় আনুগত্য দেখানোর কারণে স্বাধীন মত প্রকাশে ব্যর্থ হচ্ছে সাংবাদিক। ফলে সাংবাদিকতা যতটুকু ধারালো হওয়ার কথা, সেটা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

২০১৭ সালের তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার বুধবার (২ মে) প্রেস ফ্রিডম সূচক প্রতিবেদনে বলেছে, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের মতোই ১৪৬তম। তবে এই বছর নেতিবাচক স্কোর বেড়েছে। ২০১৭ সালের নেতিবাচক স্কোর ৪৮ দশমিক ৩৬ থেকে বেড়ে এ বছর ৪৮ দশমিক ৬২ হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল নাইন্টিন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে নির্যাতনের ধরনও উল্লেখযোগ্যভাবে পাল্টে গেছে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় হয়রানির শিকার হয়েছে এমন ঘটনা ২০১৩ সালে ৩৩টি। ২০১৭ সালে তা বেড়ে ১৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, এ বছর গুমের ঘটনা রয়েছে ১০টি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সাংবাদিকদের ভবিষ্যতে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে লেখালেখি না করার মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া দৈনিক সমকালের সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলকে হত্যার মতো ঘটনাও আছে গত বছরে।

এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক আফসান চৌধুরী বলেন, ‘এর দায় এককভাবে সাংবাদিকদের নয়। তবে গণমাধ্যমের মালিক কখনোই সরকারকে অখুশি করতে চায় না, তাই সাংবাদিকরা ‘হাউজ নীতিমালার’ নামে নিজেরা সেন্সরড হয়ে যায়। সাংবাদিকরা কেউ কেউ সুবিধার জন্য সেন্সরশিপের পক্ষ নেয়, কেউ বিপক্ষে যায়।’

সংবাদকর্মীরা রাজনৈতিক হয়ে গেছে, তারা এখন দলবাজি করে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কেউ নিজের সুবিধার জন্য করে, আবার কেউ আদর্শের জায়গা থেকে করে।’

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার এর প্রতিবেদন ‘অতিমাত্রায় পশ্চিমা মানসিকতা থেকে তৈরি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের ভয়ে বাংলাদেশের কোনও সাংবাদিক বা গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করছে না, সেটা আমি মনে করি না।

আর ৫৭ ধারার যে ভীতির কথা বলা হচ্ছে ওদের প্রতিবেদনে, সেটির ক্ষেত্রে আমার মতামত হলো- ৫৭ ধারার চাপটা গণমাধ্যমের চেয়ে বেশি ফেসবুকের ওপর। এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে, গণমাধ্যেমের বিরুদ্ধে না।’

সরকার নিজে কয়টা মামলা করেছে প্রশ্ন তুলে আফসান চৌধুরী আরও বলেন, ‘তারা আইন করে বসে আছে। তারা ধরেই নিয়েছে তাদের হয়ে অন্যরা মামলা করে দেবেন। সেটাই হচ্ছে।’

৫৭ ধারার ভুক্তভোগীদের অনেককে আইনি সহায়তাদানকারী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘সাংবাদিকরা পেশাগত কাজ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হন,  সরকারি বাহিনীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন, সেটা এধরনের প্রতিবেদনে খুব একটা আসে না।

ক্রাইসিস পিরিয়ডে তথ্য সংগ্রহে গিয়ে শারীরিক হেনস্তার শিকার হয় সংবাদিকরাই। ফলে কতদূর পর্যন্ত তারা করবেন, সেটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে নিজেদের সতর্ক করতে গিয়েও একধরনের সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যান তারা।

আবার নিজেরা বিটের সঙ্গে এতো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে যান যে তারা বের হতে পারেন না এবং একসময় প্রতিবেদন একপেশে হয়ে যায়। সেটাও সংকটের জায়গা। লেজুড়বৃত্তি থাকলে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সম্ভব না। ফলে যা তাদের বলতে পারার কথা সেটা তারা বলতে চান না। নানাবিধ চাপগুলো তাকে বাধা দেয় এবং নিজের স্বার্থের জায়গাও বড় কারণ হয়ে দেখা দেয়।’

এ ব্যাপারে এটিএন নিউজ-এর হেড অব নিউজ প্রভাষ আমিন বলেন, ‘লেজুড়বৃত্তি প্রকটভাবে প্রচলিত। বিএনপি-আওয়ামী লীগ বিটের সাংবাদিকরা কোনও কোনও ক্ষেত্রে দলীয় কর্মীদের চেয়েও বেশি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে তার দায়িত্ব সব খোঁজ রাখা এবং একইসঙ্গে দলীয় আনুগত্য প্রকাশ না করা।

কিন্তু এখন রিপোর্টারদের সে সুযোগ আর নেই। যে বিএনপি বিট করে সে কেবল বিএনপি বিটই করে যাচ্ছে এবং দলের প্রতি এক ধরনের নরম ভাব তৈরি হয় তাদের মধ্যে। এর ফলে নিজস্ব বিটের নেতাদের কোনও ভুল প্রতিবেদকের চোখে পড়ে না। ফলে সংশ্লিষ্টদের কখনোই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তীর্যক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না।’

প্রতিবেদকের কোনও দলীয় সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা দলের প্রতি সফট কর্নার থাকতে পারে। কিন্তু সাংবাদিক হলেও যদি দলীয় কর্মী হিসেবে তিনি আনুগত্য প্রকাশ করেন সেটি পেশার প্রতি অসততা। কিন্তু সাংবাদিকের আচরণে এধরনের ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে।’

SHARE