Home কক্সবাজার কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গাদের চাপে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা বাড়ছেই

কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গাদের চাপে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা বাড়ছেই

79
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১৩ মে) :: রোহিঙ্গাদের চাপে নষ্ট হতে বসেছে কক্সবাজারের সামাজিক অবস্থান। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার চাপে জেলায় বিভিন্ন পেশার ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি নিরাপত্তা শংখা দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যেও। রোহিঙ্গাদের চাপে ইতিমধ্যে কক্সবাজারের সীমান্ত এলকায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে৷প্রতিনিয়ত তাদের থাকার জন্য বন এবং পাহাড় কাটা হচ্ছে৷ স্থানীয় অধিবাসীদের চেয়ে এখন রোহিঙ্গা দ্বীগুন৷ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা এখানে আরো বাড়বে৷ কিন্তু তাদের দীর্ঘ অবস্থানের কারণে কক্সবাজারে সামাজিক অবস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে৷

জানা যায়,সম্প্রতি সামাজিক বনায়নের জন্য ২০১১ সালে বন বিভাগের ১৫ একর জমি ইজারা নিয়েছিলেন উখিয়ার কুতুপালংয়ের হেলাল উদ্দিন, লতু মিয়াসহ ১৫ জন। গাছ লাগানো, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাত বছরে খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। আর তিন বছর পরই গাছ বেচে মোটা অংকের অর্থ ঘরে তোলার কথা ছিল লতু মিয়াদের। কিন্তু আগস্টের রোহিঙ্গা স্রোত সব স্বপ্নই ভেস্তে দিয়েছে। লতু মিয়াদের সামাজিক বনে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হচ্ছে বটে। জেলা প্রশাসন কয়েক দফা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও করেছে। কিন্তু কবে নাগাদ কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ পাবেন, জানেন না কেউ।

নিরাশ হেলাল উদ্দিন বলছিলেন, রোহিঙ্গাদের উঠিয়ে ওই জমিতে বাগান করার আশা ছেড়ে দিয়েছি। তাকিয়ে আছি সরকারের ক্ষতিপূরণের দিকে। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকবার আমাদের তালিকা করা হলেও কোনো আশ্বাস পাইনি। বনায়নের পেছনে সব অর্থ খরচ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প কোনো ব্যবসা করারও উপায় নেই।

রোহিঙ্গাদের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে বনের ওপরই। প্রাকৃতিক ও সামাজিক বনের গাছ কেটে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। রোহিঙ্গাদের চুলায় লাকড়ি হিসেবেও পুড়েছে স্থানীয়দের হাতে গড়া বনের গাছ। এখনো পুড়ছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. আলী কবীর বলেন, বন বিভাগের প্রায় দুই হাজার একর পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামাজিক বনায়নের সঙ্গে যুক্ত দেড় হাজার পরিবারও। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

বনের মতো বিপুল পরিমাণ কৃষিজমিও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অতলে। কেউ কেউ আবার জমির পুরোটাই হারিয়েছেন। এদের একজন মো. সালাম। কুতুপালং ক্যাম্পের পাশেই বাড়ি। পঞ্চাশোর্ধ্ব সালাম নিজের এ অল্প কিছু জমিতেই চাষাবাদ (শাকসবজি, আনারস, আদা, হলুদ) করতেন। চাষের এসব ফসল নিজেরা খেয়ে ও বাকিটা বিক্রি করেই চলত তার আট সদস্যের সংসার। সব জমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে যাওয়ায় হতাশাই এখন সম্বল সালামের।

মানব পাচারের ঘটনায় প্রশাসনের তত্পরতায় উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের অনেক মত্স্যজীবীই পেশা ছেড়েছেন। এরপর মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান বেড়ে যাওয়ায় মত্স্যজীবীদের ওপর প্রশাসনের নজরদারি আরো বেড়ে যায়। এতেও পেশা ছাড়তে হয়েছে কাউকে কাউকে।

অবশিষ্ট যেসব মীনজীবী ছিলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে তাদেরও মাছের সঙ্গে সম্পর্ককে বিদায় বলতে হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা স্রোত শুরু হওয়ার পর নাফ নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। যদিও জীবন চালাতে কোনো ধরনের সহযোগিতা তারা পাচ্ছেন না।

স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলেদের মাসে ২০ কেজি করে চাল দিলেও তা নিয়মিত নয়। এ অনিশ্চয়তা নিয়ে বাধ্য হয়েই অন্য পেশা খুঁজছে নদী ও সমুদ্রের মাছের ওপর নির্ভরশীল প্রায় অর্ধলাখ মানুষ।

নাফ নদীর মাছ ধরেই চলত টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের আবদুল খালেকের ১০ সদস্যের পরিবার। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নদীতে মাঝ ধরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। মাছ ধরা উন্মুক্ত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ছাড়াও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেও কোনো নিশ্চয়তা পাননি। বাধ্য হয়ে গ্রামের বাজারে ছোট্ট ব্যবসা শুরু করেছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় নাফ নদীর তীরে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে তার প্রিয় ইঞ্জিনচালিত নৌকাটিও।

সাবরাং দক্ষিণ নয়াপাড়ার মো. আবদুর রহমানের মাছ ধরার নৌকাটি ইঞ্জিনবিহীন। ছেলেকে নিয়ে নাফ নদীতে রোজ মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় আবদুর রহমান বেছে নিয়েছেন শ্রমিকের পেশা। ছেলেকেও বাজারের একটি মুদিদোকানে বসিয়েছেন। মাছ ধরে আবদুর রহমান আগে দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা আয় করলেও এখন করছেন প্রায় অর্ধেক।

টেকনাফ বোট মালিক সমিতির সভাপতি মো. কেফায়েত উল্লাহ বলেন, নাফ নদীতে ইঞ্জিন ও বৈঠা নৌকাসহ দেড় হাজারের বেশি মাছ ধরা নৌকা ছিল। রোহিঙ্গাদের কারণে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন জেলেরা। মাছ ধরার সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রমিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ঘাটকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে জড়িত মানুষ আর্থিক অনটনের মুখে পড়েছে। আমরা মার্চে নাফ নদীতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় জেলে পরিবারগুলোয় হতাশাই কেবল বাড়ছে।

জানা গেছে, টেকনাফের নাফ নদী ঘিরে বেশকিছু ঘাট দিয়ে জেলেরা মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে কাটাবনিয়া ঘাট, টেকবাজার ঘাট, জালিয়াপাড়া ঘাট, নয়াপাড়া ঘাট, সাবরাং ঘাট, শাহ পরীর দ্বীপসংলগ্ন একাধিক ঘাট। বড় ট্রলারগুলো নাফ নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার অনুমতি থাকলেও ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও বৈঠা নৌকাগুলোকে সাগরে মাছ ধরতে দেয়া হচ্ছে না। মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের একটি তালিকা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহযোগিতা পাননি তারা।

কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: আবুল কালাম বলেন, স্থানীয় জনগণের জন্য আমরা সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছি। রোহিঙ্গাদের বাজেটের ২৫ শতাংশ কীভাবে স্থানীয় জনগণের জন্য ব্যয় করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। এছাড়া কিছু মানুষের জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কাজে যোগ দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে। যে পরিমাণ বাজেট, তা দিয়ে হয়তো এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সামাজিক বনায়ন বা পাহাড় কাটার ফলে স্থানীয়রা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা হয়তো কাটিয়ে ওঠা যাবে না।

SHARE