Home শীর্ষ সংবাদ বিশ্বের জঘন্যতম যানজট কি এখন বাংলাদেশে ?

বিশ্বের জঘন্যতম যানজট কি এখন বাংলাদেশে ?

197
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১৪ মে) :: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত পাঁচ দিন থেকে যানজট লেগেই রয়েছে। এর মধ্যে গতকাল দেশের ব্যস্ততম এই মহাসড়কের সীতাকুন্ড থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত ১১৪ কিলোমিটার এলাকা স্থবির হয়ে ছিল। ফেনীর ফতেহপুর রেলওয়ের ওভারপাস নির্মাণে যান চলাচল আংশিক বন্ধ রাখায় এই অবস্থা সৃষ্টি হয়।

যানজটের তীব্রতা আজ কমলেও সকালে ফেনীতে মহাসড়কে ১০ কিলোমিটার ও কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট ছিল।

ঢাকা নগরবাসীর জন্য যানজট নৈমিত্তিক ঘটনা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। এই অবস্থা উত্তরণে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০২৫ সালে যানবাহনের গড় গতি কমে দাঁড়াবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার যা মানুষের হাঁটার গতির থেকেও কম। যানজটের কারণে ক্ষতির পরিমাণও বিপুল। এতে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।  আর্থিক মূল্যে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান।

এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের এই যানজট কি বিশ্বের জঘন্যতম যানজটের ঘটনাগুলোর মধ্যে পড়ে?

বেইজিং, চীন

বেইজিং-তিব্বত এক্সপ্রেসওয়েতে ২০১০ সালের আগস্ট মাসে এক ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তায় একসঙ্গে প্রচুর যানবাহন নেমে আসায় ৬২ মাইল দীর্ঘ এই যানজট কাটতে সময় লেগেছিল ১২ দিন।

মজার তথ্য হলো, বেইজিংয়ে যানজট কমাতে রাস্তা নির্মাণের কয়েকটি ভারি ট্রাকের কারণে ওই যানজট আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল।

বেথেল, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

১৯৬৯ সালে নিউইয়র্কে তিন দিনের একটি মিউজিক ফেস্টিভালের কারণে ২০ মাইল লম্বা যানজট তৈরি হয়েছিল। এই যানজটে পড়ে বহু মানুষ প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই তাদের গাড়ি থেকে বের হয়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রথমে অনুমান করা হয়েছিল সর্বোচ্চ ৫০ হাজার মানুষ উৎসবে যোগ দিবেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চলে আসায় এই অবস্থা তৈরি হয়। পরে অনুষ্ঠানের শিল্পীদের হেলিকপ্টারে করে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।

শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র

২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ২০.২ ইঞ্চি তুষারপাতে প্রবল যানজট তৈরি হয়েছিল। এর ফলে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে লোকজন গাড়ির ভেতরে তুষারচাপা অবস্থায় পড়ে ছিলেন।

পূর্ব-পশ্চিম জার্মানি

বার্লিন দেয়ালের পতনের পর ১৯৯০ সালের ১২ এপ্রিল ইস্টারের ছুটিতে যানজট তৈরি হয়েছিল। ওই যানজটে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ গাড়ি আটকা পড়ে। জার্মানির একত্রীকরণের পর দুই দিকের মানুষ দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে যাওয়ায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল।

টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

হারিকেন রিটার সতর্কতা জারি করার পর ২০০৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ভয়াবহ তৈরি হয়েছিল। উপকূলীয় এলাকা থেকে ২৫ লাখ মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে ১০০ মাইল সড়কজুড়ে যানজট লেগে যায়। এই জট ছাড়াতে সময় লেগেছিল প্রায় ৪৮ ঘণ্টা।

লিওঁ-প্যারিস, ফ্রান্স

১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটি কাটিয়ে লিওঁ থেকে প্যারিসে ফিরতি লোকজন ভয়াবহ যানজটে পড়েছিলেন। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে ১০৯ মাইলে গিয়ে ঠেকেছিল ওই যানজটের দৈর্ঘ্য।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সন্ত্রাসী হামলার পর পুরো নিউইয়র্কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলের জন্যই সেদিন জনসাধারণের প্রতি এই নির্দেশনা দেওয়া হয়ছিল। সেই সঙ্গে সেদিন পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বেসমারিক বিমান চলাচল বন্ধ করে সব উড়োজাহাজ অবরতণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণেই তীব্র অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়েছিল যাত্রীদের।

পাঁচ কারণে যানজট

পাঁচ কারণে তিন দিন পরও কমছে না ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহাযানজট। ফেনীতে এ জট কমে গেলেও মহাসড়কের ঢাকামুখী দাউদকান্দি অংশে নতুন করে এ যানজট বাড়তে শুরু করেছে।

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া কাঠেরপুল থেকে গোমতী ও মেঘনা সেতু পার হয়ে এ যানজট  মঙ্গলবার সোনারগাঁ পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে।

এ অবস্থায় সোমবার বিকেল থেকে মঙ্গলবার সকালের মধ্যে কুমিল্লা থেকে ঢাকা পর্যন্ত যেতে সময় লেগেছে ১০-১২ ঘণ্টা।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে ফতেহপুর রেল ওভারপাসের দুটি লেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সেখানে মহাসড়কের দুই দিকের অন্তত ২০ কিলোমিটার যানজট মুক্ত হয়ে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসা কাভার্ডভ্যান চালক আলী হোসেন জানিয়েছেন, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড পয়েন্টে এখন কোনো যানজট নেই। পাঁচটি কারণে এ যানজট অব্যাহত রয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্নিষ্টরা।

এগুলো হলো- মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, চার লেনে চলাচলকারী গাড়িগুলোর দুই লেনের গোমতী ও মেঘনা ব্রিজ দুটিতে ওঠার ক্ষেত্রে বিলম্ব এবং গাড়ি চালকদের মধ্যে পরস্পরকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ও এ অংশে অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালানো, দাউদকান্দির টোল প্লাজার ওজন মাপার যন্ত্রে হয়রানি ও অহেতুক দেরি, উল্টো পথ ফাঁকা থাকলে সেদিক দিয়েই গাড়ি চালানো এবং রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহনের যাতায়াত ও ধীরগতিতে চলাচল।

সমকালের কুমিল্লা ও দাউদকান্দি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লেগেছে ১০-১২ ঘণ্টা। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ঢাকামুখী সড়কে গতকাল দুপুরের দিকে কুমিল্লার চান্দিনার মাধাইয়া থেকে দাউদকান্দির শেষ সীমানা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার ও পরে দাউদকান্দি থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত ১৫-১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট রয়েছে।

যানজটে শত শত যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ি, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, বিদেশগামী যাত্রী আটকা পড়েছেন। ঢাকাগামী স্টার লাইন পরিবহনের যাত্রী জুয়েল আহম্মদ জানান, দুপুর ১টার দিকে দাউদকান্দির গৌরীপুর থেকে টোল প্লাজায় তিনি পৌঁছেছেন বিকেল সোয়া ৩টার দিকে। ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কুমিল্লা থেকে ঢাকার দিকে রওনা দিয়ে মাহাবুব হোসেন সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর দুপুর ১টার দিকে পৌঁছেন কাঁচপুর ব্রিজের কাছে।

তবে মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী সড়কের অংশে এ যানজট তীব্র নয়। যদিও উল্টোপথে যানবাহন চলাচল করায় মহাসড়কের দু’অংশই সন্ধ্যা ৬টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত যানজটের কবলে ছিল। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, এ অবস্থা স্বাভাবিক হতে আজ বুধবারও লেগে যেতে পারে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে এ যানজট হচ্ছে- যা কখনও কখনও শুক্রবার ও শনিবার পর্যন্ত চলছে। এ যানজট ৩০ কিলোমিটার থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশ জানায়, যানবাহনগুলো দ্রুত গতিতে গোমতী, মেঘনা ও কাঁচপুর ব্রিজের কাছে এসে জড়ো হয়ে মেঘনা ও গোমতীর টোল পল্গাজায় সারিবদ্ধ হয়। এর পর সেতুতে ওঠার সময় যানবাহনের গতি অন্তত ৮০ ভাগ কমে যায়। চার লেনের গাড়িগুলো দুই লেনের সেতুতে ধীর গতিতে চলায় যানজট দেখা দেয়।

দাউদকান্দি হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, দাউদকান্দির টোল প্লাজায় একসঙ্গে এত যানবাহনের ওজন নিয়ন্ত্রণ, টোল আদায় ও চলাচলের পাসিং দেওয়া যাচ্ছে না। তাই যানজট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে।

SHARE