Home কক্সবাজার কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে

কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে

202
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১৬ মে) :: কক্সবাজারের রোহিঙ্গা অধ্যূষিত অঞ্চল উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও নানা বৈধ-অবৈধ পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশে অস্ত্র ও মাদক পরিবহন, মানব পাচার, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়সহ নানা কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। তারা রিকশা-ভ্যান চালানো, শাকসবজি, তরকারি বিক্রি, মাছ, মুরগির দোকানসহ বিভিন্ন স্টেশনারি দোকান পরিচালনা করছে।

উথিয়ার থাইংখালী ক্যাম্পে ঢুকতেই টিনের ছোট্ট একটি দোকান। ভেতরে পাশাপাশি দুটি চেয়ার। সামনে একটি আয়না। ১৪ বিঘা জমি ফেলে পালিয়ে আসা মোহাম্মদ ওসমানের (২২) দোকান এটি। মিয়ানমারে থাকতে কৃষিই ছিল তার জীবিকা।

চুল কাটা ছিল শখ। সেই শখই এখন পেশা বানিয়ে নিয়েছেন ওসমান। এ থেকে দৈনিক আয় করছেন ৫০০ টাকার মতো। থাইংখালীর এ ক্যাম্পেই ওসমানের মতো নাপিতের পেশা বেছে নিয়েছেন শ’খানেকের মতো রোহিঙ্গা। গড়ে তুলেছেন পেশাভিত্তিক নিজস্ব সমাজ।

গত আগস্টের সেনা অভিযানের পর রাখাইন থেকে পালিয়ে এসেছে সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা।

এদের আশ্রয় হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০টি ক্যাম্পে। আশ্রয়ের চিন্তা আপাতত নেই। ত্রাণের ওপর জীবনও চলছে। সংকটটা এখন পেশার। ক্যাম্পেও চৌহদ্দিতে সেটাই খোঁজার চেষ্টায় রোহিঙ্গারা। কেউ নাপিতের পেশা বেছে নিচ্ছেন তো কেউ দর্জি। পোশাক-চুড়ির ব্যবসাও করছেন অনেকে।

মংডু থেকে আসা মোহাম্মদ আমিন খুঁজে নিয়েছেন দোকানদারিকে। গহনা থেকে শুরু করে চুলের ক্লিপ, চুড়ি, বেল্ট, চন্দন সবই আছে তার দোকানে। বেচা-বিক্রিও কম নয়। বিয়ে বা খতনায় বিক্রি আরো বেড়ে যায়। মিয়ানমারের এ জেলে পেশা বদলে এখন পুরোপুরি ব্যবসায়ী।

ক্যাম্পে আসা বিদেশী অতিথি ও ত্রাণকর্মীদের চাহিদাও ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে অনেক রোহিঙ্গাকে। কোরবানি ঈদের আগে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে পালিয়ে আসা সুরত আলমের দোকানে মিলছে ব্র্যান্ডেড কেক, বিস্কুট থেকে শুরু করে কোমল পানীয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত শরণার্থী ক্যাম্প বা এলাকা নিজের প্রয়োজনেই একসময় নতুন সমাজের জন্ম দেয়। ক্যাম্পে বসবাসরত মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই একটি নয়া সমাজ কাঠামো দাঁড় করায়। নানামুখী পেশায় যুক্ত হয় তারা। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় তা-ই হচ্ছে।

রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, শরণার্থী মনস্তত্ত্বের প্রাথমিক সূত্রানুযায়ী রোহিঙ্গারা যখন দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়, তখন প্রধানত জীবন বাঁচানো ও কোনো রকমে বেঁচে থাকাই প্রথম লক্ষ্য থাকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে শরণার্থী হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের মতো করে একটি জীবন গড়তে চায়। সহশরণার্থীদের সঙ্গে নিয়ে নিজের মতো একটা সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এদেশে আসা রোহিঙ্গারাও এর ব্যতিক্রম নয়।

মংডুর সিতাহরিকা বাজারে দর্জির দোকান ছিল মজিবুর রহমানের (৩২)। আয় করতেন দিনে প্রায় ২ হাজার বার্মিজ কিয়াট। বালুখালী ক্যাম্পে এসেও একই পেশা খুঁজে পেয়েছেন অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভাগ্যবান মজিবুর। ক্যাম্পেই একটি দোকান দিয়ে রোহিঙ্গাদের কাপড় সেলাই করছেন। নতুন কাপড় বানানোর চেয়ে মেরামতই বেশি করতে হয় তাকে। দিন শেষে ঘরে তোলেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

ক্যাম্পের বাইরে কাজের সুযোগ রোহিঙ্গাদের নেই। যদিও তাড়না আছে পেশায় যুক্ত হওয়ার। রোহিঙ্গা পুরুষরা বিভিন্ন এনজিওর হয়ে ক্যাম্পের ভেতরই দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করছেন। এজন্য তারা মজুরি পাচ্ছেন দৈনিক ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা। মাসে সর্বোচ্চ সাতদিনের বেশি কাজ না থাকায় বাকি সময়টায় দোকান দিয়ে বসেছেন অনেকে। ক্যাম্পগুলো ঘুরে চোখে পড়ে এমন অসংখ্য মুদি, ফার্মেসি, মাছ-মাংস ও খাবারের দোকান।

ক্যাম্পের বাসিন্দাদের বেঁচে থাকার প্রধান মাধ্যম ত্রাণ। চাল, ডাল আর তেল ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্য পণ্যগুলো বিনিময়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ তিনজনের একটি পরিবার মাসে একবার ৩০ কেজি চাল, পাঁচ কেজি ডাল ও তিন কেজি সয়াবিন তেল ত্রাণ হিসেবে পায়। তিনজনের অধিক সদস্যের পরিবার মাসে দুবার একই পরিমাণ ত্রাণ পায়।

যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে, তারা সুজি ছাড়াও আনুষঙ্গিক সামগ্রীও ত্রাণ হিসেবে পেয়ে থাকে। ফলে মাস শেষে কিংবা মাঝামাঝিতে ত্রাণ শেষ হয়ে গেলে উদ্বৃত্ত পণ্য দিয়ে প্রতিবেশী পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যটি সংগ্রহ করে।

ক্যাম্পের গুমোট জীবনে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য স্থায়ী কাঠানো নির্মাণ সম্ভব নয়। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি নিজেদের জন্য নির্ধারিত জমি কম হওয়ায় কেউই স্থায়ীভাবে কাঠানো নির্মাণ করছে না।

তবে স্বল্প পরিসরে দীর্ঘমেয়াদে থাকার বেশকিছু উপাদান তারা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছেন নিজেদের প্রয়োজনে। ত্রিপল কুঠিরের চারপাশে অধিকাংশ পরিবারই রোপণ করেছে লাউ, কুমড়োজাতীয় সবজির বীজ।

কেউ কেউ ঘরের প্রবেশমুখে লাগিয়েছেন মরিচ, ধনিয়াসহ একাধিক ফসল। ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকের খালি জায়গাগুলোতে সমন্বিতভাবে রোপণ করেছে শাকসবজির চারা। নিজেদের প্রয়োজনেই এসব করছে তারা।

তারপরও কাজ না থাকা মানুষের সংখ্যাই বেশি রোহিঙ্গা শিবিরে। কুতুপালং ক্যাম্পের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, পাড়ার দোকানে বসে আড্ডা দিয়েই দিন পার করছেন অনেকে। এরাও নতুন পেশায় যুক্ত হতে চাইছেন। কেউ পারছেন, কেউ ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে চেষ্টাটা চলছে পেশাভিত্তিক নতুন সমাজের।

SHARE