Home কক্সবাজার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির ৬ মাস পরও চূড়ান্ত হয়নি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন...

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির ৬ মাস পরও চূড়ান্ত হয়নি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

45
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১৭ মে) :: রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে গত বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষর হওয়া চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ৬ মাস পর এখন দুই দেশ বলছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আরো কাজ বাকি আছে। তবে বাকি কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে এবং কখন থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে তা ঢাকা-নেপিডোর কোনো কর্মকর্তাই জানাতে পারেনি।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় বৃহস্পতিবার (১৭ মে) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।বৈঠক শেষে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘আমরা প্রত্যাবাসন নিয়ে কাজ করছি। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আরো কাজ করার বিষয় বাকি আছে। আমরা এখন সেগুলো নিয়ে কাজ করবো।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে কী কাজ করছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মিন্ট থোয়ে বলেন, ‘চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি। এগুলো চিহ্নিত করছি। চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার পর আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জানাব। প্রথমে আমরা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শেষ করব, তারপর প্রত্যাবাসন শুরু হবে।’

এদিকে, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘একটি বৈঠকের আলোচ্য বিষয় (মিনিটস) প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রস্তুতি শেষে দুই দেশই এতে স্বাক্ষর করবে, তারপর প্রত্যাবাসন শুরু হবে।’

বৈঠকের আলোচ্য বিষয় (মিনিটস) কবে নাগাদ প্রস্তুত করা হবে এবং কখন দুইদেশ স্বাক্ষর করবে, এমন প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক কোনো জবাব দেননি।

বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, ‘প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে বৈঠকে আলাপ হয়েছে। প্রত্যাবাসনের জন্য আমরা একটি তালিকা পাঠিয়েছিলাম, ওই তালিকা ভেরিফাই করতে কী সমস্যা হয়েছে, আজকের বৈঠকে তা মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জেনেছি, আরো কী প্রয়োজনীয় বিষয় বাকি আছে, সেগুলো নিয়েও কথা বলেছি। দুই পক্ষই খোলামেলা আলোচনা করেছি। আস্তে আস্তে ওনারা (মিয়ানমার) ভেরিফাই করে দেখবে, এভাবেই প্রত্যাবাসন হয়।’

যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের দ্বিতীয় বৈঠকে ঢাকার পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে নেপিডোর পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন। দুই দেশের ১৫ জন করে মোট ৩০ জন সদস্যকে নিয়ে এই যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে গত বছরের ২৩ নভেম্বর নেপিডোতে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে গত ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। সঙ্কট সমাধানে গত ডিসেম্বর নেপিডোর সঙ্গে স্বাক্ষর করা চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, ‘৯ অক্টোবর ২০১৬ এবং ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালের পর যে সকল রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের ফেরত নিবে মিয়ানমার। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখেরও বেশি মানুষ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের একাধিক শিবিরে মিয়ানমারের নাগরিক প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দীর্ঘ সময় লাগবে: পররাষ্ট্র সচিব

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব এ কে এম শহিদুল হক। তিনি বলেছেন, এই জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যৌথভাবে কাজ করছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সৃষ্ট বাধাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলাদেশে-মিয়ানমার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের একথা জানান পররাষ্ট্র সচিব।

এম শহীদুল হক বলেন ‘রোহিঙ্গাদের যে তালিকা মিয়ানমারকে দেওয়া হয়েছিলো, সেটা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে।’

‘এমন প্রত্যাবাসন সব সময়ই জটিল ও কঠিন বিষয়। কিন্তু আমরা অনুভব করছি এই প্রত্যাবাসন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু হবে। এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কোনো মতভেদ নেই।’

‘উভয়পক্ষে খুব খোলামেলা আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারও সম্মতি জানিয়েছে।’

বৈঠক শেষে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব ইউ মিন্ট থো সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা আমাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছি।’

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে এরই মধ্যে মিয়ানমার সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে সে বিষয়ে তিনি কোনও কথা বলেননি।

বেলা এগারোটা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় দুই দেশের সচিবসহ প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে জানুয়ারিতে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে কথিত হামলার অভিযোগ তুলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অতর্কিত হামলা ও দমন-পীড়ন চালায়। এতে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে রোহিঙ্গারা।

গত চার দশক ধরেই বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। প্রায় ১১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় হয়েছে কক্সবাজারে উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও সেটা এখনও হয়নি। এদিকে চুক্তির ৬ মাস শেষ হতে চললেও এখনো পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়নি মিয়ানমার।

রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানোর প্রথম ধাপ হিসেবে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের কাছে ১ হাজার ৬৭৩ রোহিঙ্গা পরিবারের (৮ হাজার ৩২ ব্যক্তি) তালিকা হস্তান্তর করে বাংলাদেশ। কিন্তু মিয়ানমার এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে ৯০০ জনের কম রোহিঙ্গাকে যাচাই করেছে বলে জানিয়েছে দেশটি।

SHARE