Home শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষার মানের উন্নয়নে ৩৮ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

প্রাথমিক শিক্ষার মানের উন্নয়নে ৩৮ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

227
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২২ মে) :: সংখ্যাগত উন্নতির পর এবার প্রাথমিক শিক্ষার মানের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ৩৮ হাজার ৩৯৭ কোটি ১৬ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় পাঠদানের আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি চালু করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর। পাঠ্যপুস্তক উন্নত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খাবারের বিষয়টিও প্রাধান্য পাবে এ প্রকল্পে।

গতকাল অনুমোদিত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। এটি বাস্তবায়ন করবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)।

বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষা খাতে একে স্বপ্নের প্রকল্প বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। একনেক বৈঠক-পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার মান বাড়ানোর কাজ প্রাথমিক থেকেই শুরু করতে হবে। এজন্য প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে ২৫ হাজার ৫৯১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বাকি ১২ হাজার ৮০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে।

বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, ইইউ, ডিএফআইডি, অস্ট্রেলিয়ান এইড, কানাডিয়ান সিডা, সুইডিশ সিডা, ইউনিসেফ ও ইউএসএইচ প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে।

শিক্ষক সংকট নিরসনের ওপর প্রকল্পটিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর আওতায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৪ জন শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন করা হবে। গুরুত্ব পেয়েছে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও। প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৪ জন শিক্ষককে ডিপিইনএড, ৫৫ হাজার শিক্ষককে বুনিয়াদি, ১ হাজার ৭০০ শিক্ষককে এক বছর মেয়াদি সাব-ক্লাস্টার, ২০ হাজার শিক্ষককে এক বছর মেয়াদি আইসিটি, ৬৫ হাজার শিক্ষককে লিডারশিপ ও ১ লাখ ৩০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষককে ব্রিটিশ কাউন্সিলের (সিঙ্গেল সোর্স) মাধ্যমে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জন্যও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২ হাজার ৫৯০ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষককে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণ পাবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত ৩৫ হাজার কর্মকর্তা ও শিক্ষক।

পাশাপাশি ২০০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার জন্য বিদেশে এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্সের ব্যবস্থা করা হবে। এর বাইরে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বর্তমান পাঠ্যসূচির সংশোধন ও টিচিং লার্নিং শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হবে। শিক্ষার আওতায় আনা হবে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগবহির্ভূত ১০ লাখ শিশুকে।

শ্রেণীকক্ষ সংকট প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এখনো বড় বাধা। এটা দূর করতে প্রকল্পটির আওতায় ৪০ হাজার অতিরিক্ত শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ করা হবে। অধুনিক শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ৭১ হাজার ৮০৫টি ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও স্পিকার বিতরণ, সহজ ঋণ সুবিধার মাধ্যমে ৮০ হাজার শিক্ষকের জন্য নিজস্ব আইসিটি সরঞ্জামাদি কেনা হবে।

এছাড়া ১০ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষকের কক্ষ নির্মাণ, ৩৯ হাজার পুরুষ ও ৩৯ হাজার নারীর ওয়াশ ব্লক নির্মাণ এবং ১৫ হাজার বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ, সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, আইসিটি শিক্ষার মানোন্নয়ন— সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির এ পরিকল্পনা।

ইউনিসেফ সহায়তাপুষ্ট আইডিয়াল প্রকল্প, ডিএফআইডি সহায়তাপুষ্ট এস্টিম প্রকল্প, নোরাড সহায়তাপুষ্ট প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন প্রকল্পের সমন্বয়ে ১৯৯৭ সালে শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি)। ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত পিইডিপি-১ প্রকল্পে শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষা সমাপন, শিক্ষার মান ও মনিটরিংসহ ১০টি লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ২০০৪ সালে গ্রহণ করা হয় পিইডিপি-২।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বৃদ্ধি, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ আকর্ষণীয় করা, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়, স্যানিটেশন সুবিধা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয় এ ধাপে।

এরপর ২০১১ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (পিইডিপি-৩) অনুমোদন দেয় সরকার। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় ২২ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। পিইডিপি-৩-এর অধীনে দেশব্যাপী ৩ হাজার ৬৮৫টি শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ, ২ হাজার ৭০৯টি বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এ নিয়ে আসা, ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৫টি টয়লেট স্থাপন, ৪৯ হাজার ৩০০টি নলকূপ ও ১১ হাজার ৬০০টি শ্রেণীকক্ষ মেরামতসহ জেলা-উপজেলায় রিসোর্স সেন্টার করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পিইডিপি-৩-এ অবকাঠামো উন্নয়নই বেশি গুরুত্ব পায়।

প্রকল্পটির চতুর্থ পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে মানের বিষয়টি। এর অংশ হিসেবে জোর দেয়া হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিতে। কারণ আট হাজারেরও অধিক বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন (এসপিআর) অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৭৯টি বিদ্যালয়েই মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান হচ্ছে। দুজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে ৭২১ বিদ্যালয়ে। আর তিনজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে ৭ হাজার ৭৬৪ বিদ্যালয়ে। তবে শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, মানের বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

শিক্ষক নিয়োগ হলেও অভাব থাকছে প্রশিক্ষণের। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) সর্বশেষ বিদ্যালয়শুমারির তথ্য বলছে, ৩০ শতাংশের বেশি অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে চলছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম।

শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৮৮ জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৭১ হাজার ৫৯৭ জন শিক্ষক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন।

SHARE