Home কক্সবাজার কক্সবাজারের ইনানী বিচ ছুঁতে চলেছে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প : বিলীনের পথে বন ও...

কক্সবাজারের ইনানী বিচ ছুঁতে চলেছে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প : বিলীনের পথে বন ও পাহাড়

415
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৬ মে) :: কক্সবাজারের উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু নীল রঙের প্লাস্টিকের ঘর। সীমানা ছাড়িয়ে হঠাৎ এক চিলতে সবুজ। পাহাড়ের মাথায় অস্তিত্ব জানান দিয়ে দণ্ডায়মান কিছু গাছ। তাও বিলীন হতে সময় লাগেনি। একদিন পরই মুণ্ডিত পাহাড়।

গত বছরের আগস্টে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজারের পাহাড় ও বন। বসতি নির্মাণের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জ্বালানির চাহিদা পূরণেও কাটা হচ্ছে গাছ। এরই মধ্যে উজাড় হয়েছে কক্সবাজারের পাঁচ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনভূমি। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ই বলছে, বন ধ্বংস হতে হতে চলে এসেছে ইনানী বিচের পাঁচ কিলোমিটারের কাছাকাছি।

প্রায় ৮৫ শতাংশ রোহিঙ্গা পরিবার জ্বালানির জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বসতি নির্মাণ ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারে প্রতিদিন সংগ্রহ হচ্ছে ৭০০ টন জ্বালানি কাঠ। কোরবানির ঈদের দুদিন পর মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন নুরুল ইসলাম। সেই থেকে সাতজনের সংসারের জ্বালানির চাহিদা পূরণ করছেন পাহাড়ের গাছ কেটে।

তিনি বলেন, ক্যাম্পের কাছাকাছি জ্বালানি কাঠ যা ছিল, কয়েক মাসের মধ্যে তা শেষ হয়ে গেছে। তাই এখন ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলোই কাঠ সংগ্রহের শেষ ভরসা।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. আলী কবীর বলেন, শুধু রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনের জন্য বন বিভাগের আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার একরের মতো বন উজাড় হয়েছে। এর বাইরে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের জন্য নিয়মিত গাছ কাটা হচ্ছে। এটি ইনানী বিচের প্রায় কাছাকাছি চলে গেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দুই মাসের মধ্যে তা ইনানী বিচ পর্যন্ত চলে যাবে। কারণ সে অর্থে জ্বালানি কেউ দিচ্ছে না।

উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া, বালুখালী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় সবাই মাথায় কিংবা কাঁধে করে বিভিন্ন সাইজের গাছ, গাছের গুঁড়ি বা কাঠ নিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পে। ঘর সংস্কার কিংবা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে এসব কাঠ।

এ বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী  বলেন, ইনানী বিচের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বন কাটা বেশ ক্ষতির কারণ হবে। তবে নতুন করে বন ধ্বংস যাতে না হতে পারে, সেজন্য কাজ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হলে সেখানে নতুন করে বনভূমি সৃজন করা হবে। আবার রোহিঙ্গাদের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিকল্প জ্বালানি বিশেষ করে সিলিন্ডারের সুপারিশ করেছি।

তাছাড়া উজাড় করা বনে আবার কীভাবে গাছপালা ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। বনভূমির এ ক্ষতি কিছুটা হলেও সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮২০ জন রোহিঙ্গা বন বিভাগের ৪ হাজার ৩১০ একর বনভূমিতে বসবাস করছে। বসতি স্থাপনের ফলে ১ হাজার ১৯৯ একর বনভূমির সৃজিত বন (সামাজিক বনায়ন) ও ২ হাজার ৩১৮ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়েছে; যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৪১১ কোটি ২৮ লাখ ৬২ হাজার ৬৭১ টাকার বেশি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের সহসদস্য সচিব নুর মোহাম্মদ সিকদার  বলেন, রোহিঙ্গারা শুধু গাছ কাটছে না, গুঁড়িও কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষতি পূরণ করা যাবে না। গাছ কাটার কারণে একদিকে বন ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

এ পরিস্থিতির উন্নয়নে রোহিঙ্গাদের জন্য জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১১ লাখ মানুষের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন করে জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছে। এক্ষেত্রে জ্বালানির জন্য তিন-চারটি ফুটবল মাঠের সমান বন উজাড় হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হলেই জ্বালানির জন্য গাছ কাটা বন্ধ হবে। সে কারণে আমরা শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনকে জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছি। তারা জুন থেকে আংশিকভাবে এবং আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে পুরোপুরিভাবে জ্বালানির ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে। বন রক্ষার জন্য আমরা আমাদের চ্যানেলে বলছি, লিখছি— এর বাইরে আমাদের আর কিছু করার নেই।

SHARE