Home কক্সবাজার টেকনাফের আবদুল হাকিম ডাকাতের ইয়াবা হটলাইন

টেকনাফের আবদুল হাকিম ডাকাতের ইয়াবা হটলাইন

179
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১ জুন) :: আবদুল হাকিম ওরফে ডাকাত হাকিম। বিচারিক আদালতে কখনো হাকিমের চেয়ারে বসার সুযোগ না হলেও তার এক ফোনকলের হুকুমে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান ছেড়ে দেওয়া হয়। ওপারে অং সান সু চি সরকারের ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িত বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি), মগ-মুরং আর এপারে টেকনাফ-উখিয়ার জনপ্রতিনিধি আবদুর রহমান বদি পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তার।

কক্সবাজার-টেকনাফে ইয়াবার হটলাইন হিসেবে কুখ্যাতি রয়েছে ডাকাত হাকিমের। পরিবারে বয়ঃজ্যেষ্ঠ হাকিম। তার শেখানো পথেই হেঁটেছে অপর চার ভাই হামিদ, বশির, কবির ও নজির আহমেদ।

ইয়াবা চোরাচালান, মানবপাচার, ডাকাতি, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, প্রাণনাশের হুমকিসহ একাধিক অভিযোগে র্যাব-পুলিশের রেডলিস্টে রয়েছে এ ডাকাত পরিবার।

মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাকিম নিজে সন্ত্রাসী। ইয়াবা পাচারে ও মিয়ানমারের চোরাকারবারিদের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। এ ছাড়া তার রয়েছে নিজস্ব রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট।

টেকনাফ থানার ওসি রনজিত বড়–য়া বলেন, হাকিম ডাকাতের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা আছে। তার পুরো পরিবার বর্তমানে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে। আমরা তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।

স্থানীয় সূত্র বলছে, সরকারের মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হন্য হয়ে খুঁজলেও সবার নাকের ডগায় গোটা পরিবার নিয়ে টেকনাফের গহিন পাহাড়ে ঘাপটি মেরে আছে হাকিম ডাকাত। সেখানে মাঝে মধ্যেই হাকিমের মোবাইল ফোনে কল ঢোকে, খোলা থাকে ভাই নজির ডাকাতের মোবাইল ফোনও।

টেকনাফের স্থানীয় সূত্র জানায়, হাকিমের জন্ম মিয়ানমারের মংডু জেলার রাচিডংয়ের বড়াছড়ায়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জানে আলমের ৭ ছেলের মধ্যে হাকিম (৪০) সবার বড়। মিয়ানমারে নিজ বাড়িতে থাকা অবস্থায় চুরি, ডাকাতিসহ মগ-মুরংদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় তার এক ভাই খুন হয়। পরে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে ৮ বছর আগে টেকনাফে অনুপ্রবেশ করে হাকিম। নাফ নদী পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের চোরাই গরু-ছাগল টেকনাফের বাজারে এনে বিক্রি শুরু করে।

অবৈধ বিকিকিনির সুবাদে পরিচয় হয় টেকনাফের আওয়ামী লীগ কর্মী ও এমপি বদির ক্যাডার জাহিদ হোসেন জাকুর সঙ্গে। জাকুর ছত্রছায়ায় এবং মিয়ানমারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে এক সময় জড়িয়ে পড়েন চোরাচালানে। হাসপাতালের সামনে জাকুর অফিসে আড্ডা দিত সারাক্ষণ।

বাংলাদেশি না হয়েও ক্ষমতার জোরে টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লানপাড়ায় বিশাল একটি প্লট কিনে নেয় হাকিম। সেখানে গড়ে তোলে দোতলা বাড়ি। এরপর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে স্ত্রী-সন্তান, মা এবং অপর চার ভাইকে নিয়ে আসে। অর্থবিত্তের জোরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিয়ে করে অন্তত ৫ তরুণীকে।

সূত্র জানায়, র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জাকু নিহত হলে ভাগ্য খুলে যায় হাকিমের। কারো মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি এমপি বদির হয়ে তার সন্ত্রাসী ও ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ে হাকিম ও তার অপর ভাইয়েরা। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা বিতাড়নের আগে অপর এক ভাই মিয়ানমারের নিজ বাড়িতে গেলে মগদের হাতে খুন হয়।

এতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে পাঁচ ভাই হাকিম, হামিদ, বশির, কবির ও নজির আহমেদ। কুতুপালং-নয়াপাড়ার পুরনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া তরুণদের দলে ভিড়িয়ে গড়ে তোলে ডাকাত বাহিনী।

মিয়ানমার থেকে গরু-ছাগল, ইয়াবা পারাপার, সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের উদ্দেশ্যে ৬টি ফিশিং ট্রলার কিনে নেয়। পাঁচ ভাইয়ের বসবাসের জন্য পল্লানপাড়া থেকে শুরু করে টেকনাফের পাহাড় পর্যন্ত ৭টি বাড়ি নির্মাণ করে।

এর মধ্যে মু-ি সলিম নামে গত ৩ বছর আগে একজনকে খুন করে তার বাড়ি দখল করে। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির বলয়ে থাকায় তার বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দটি করার সাহস পেত না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, টেকনাফ পৌর যুবলীগের নেতা নুরুল কবির, বল্লামপাড়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সিরাজ মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে হাকিমরা।

এ ছাড়া নূর হাফেজ ও তোফায়েল আহমেদ নামে আরও দুজনকে হত্যা করে। টেকনাফ উপজেলার পাঁচশ গজ দূরত্বে বসবাস করেও ওই এলাকায় চাঁদাবাজি করে বেড়াত। এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ইয়াবা ব্যবসা, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে ১১টি মামলা রয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাকে খুঁজে পেত না।

গত ৩১ জানুয়ারি শাহপরীর দ্বীপের আবছার নামে এক ছেলে অপহরণের অভিযোগে হাকিমের ভাই নজিরের স্ত্রীসহ ৩ জনকে আটক করে পুলিশ। ওই সময় তার বাড়িতে ফ্লোরের নিচে গভীর কূপ পাওয়া যায়। যেখানে জিম্মি অবস্থায় ওই যুবককে উদ্ধার করে। গত দেড় থেকে দুই মাস আগে বৃদ্ধ মাসহ পুরো পরিবার গা-ঢাকা দেয়। পলায়নের পর বিক্ষুব্ধ জনতা হাকিমের ৭টি বাড়ির কিছু অংশ শাবল দিয়ে ভেঙে ফেলে।
গতকাল পল্লানপাড়ার বাড়িতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হাকিমের বাড়ির বাউন্ডারি দেয়ালে এখনো কাচ, কাঁটাতারের অস্তিত্ব রয়েছে।

প্রতিবেশীরা জানান, সিসি টিভি ক্যামেরায় দূর থেকে মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করত হাকিম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান টের পেলে বাড়ির ফ্লোরের নিচে আলিফ-লায়লা গল্পের স্টাইলে বানানো গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকত। সন্ধ্যার পর বাউন্ডারি দেয়ালের কাঁটাতারের সঙ্গে বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে নিজের নিরাপত্তা তৈরি করত।

স্থানীয়রা জানায়, পেছনের আধাকিলোমিটার দূরে টেকনাফের হ্নীলার গহিন পাহাড়ে আস্তানা রয়েছে হাকিমের। সেখানে রোহিঙ্গা বাহিনী নিয়ে সে অবস্থান করছে। বৃদ্ধ মাকে পাঠিয়ে দিয়েছে কুতুপালং ক্যাম্পে। বাড়ি ভাঙার পর পাহাড় থেকে মাঝে মধ্যেই ডাকাত হাকিম নিজের ফেসবুকে অস্ত্র, দূরবীক্ষণ যন্ত্র, ওয়াকিটকি সংবলিত নিজের ছবি ছাড়ছে। আবার ফেসবুক ইন অ্যাক্টিভ করছে। পাহাড়েও সিনেমা স্টাইলে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ করে মিয়ানমারের চতুর এই সন্ত্রাসী।

৩১মে হাকিমের ছোট ভাই নজির ডাকাতের মোবাইল ফোনে কল দিলে অপর প্রাপ্ত থেকে ওয়েলকাম টিউনসের শব্দ ভেসে আছে ‘স্যার বিরাট মানুষ, সব সময় ব্যস্ত থাকেন। একটু অপেক্ষা করুন।’ কল রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় শুনে নিজেকে নজির বলে কথা বলতে অস্বীকার করে।

SHARE