Home শীর্ষ সংবাদ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের সাফল্যের ৩০ বছর

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের সাফল্যের ৩০ বছর

154
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৪ জুন) :: বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে চলেছে বালাদেশ। মিশনে বাংলাদেশের কাজ শুরু হয় সেই ১৯৮৮ সালে।

বিগত ৩০ বছরে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে পরিশ্রম করেছে বাংলাদেশের হাজার হাজার নারী ও পুরুষ। জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন কৃতজ্ঞ জনগোষ্ঠির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে তারা।

এখানে সেখানে সামান্য কিছু সীমালঙ্ঘনের ঘটনা বাদ দিলে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা নিজেদেরকে সুশোভন বাহিনী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে যাদের স্থানীয় জনগণের সাথে সুন্দর আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে।

শ্রীলংকায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর মতে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের আচার আচরণ গড়ে উঠে তাদের বহু শতকের নিজস্ব সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, “দায়িত্বের উর্ধ্বে উঠে সমবেদনা দেখানোর যে দক্ষিণ এশিয় সংস্কৃতি রয়েছে, এটা তার গভীরে প্রোথিত। আর সেই সাথে রয়েছে নিজের কাছে সামান্য যা আছে, তাই সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার মানসিকতা”।

তিনি এমনকি সমস্যাকবলিত উপজাতীয়প্রধান আফ্রিকান একটি দেশের কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন যেখানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা তাদের ক্যাম্পের চারপাশের ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে নিজেদের রেশনের খাবার পর্যন্ত বিতরণ করেছে।

হামিদুল্লাহ বলেন, “এটা বিধিনিষেধের বাইরের বিষয়। আরেকটি সৃজনশীল উদারতার উদাহরণ হলো বাংলাদেশ থেকে বাহিনীর সদস্যদের খাওয়ার জন্য খাদ্যোপযোগী কিছু বীজ পাঠানো হয়েছিল। বাংলাদেশের সেনারা সেগুলো তাদের চারপাশের মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছিল যাতে তারা বীজগুলো থেকে শস্য উৎপাদন করতে পারে। জনগণ সেটা করেছিল”।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা শুধু আইন-শৃঙ্খলাই বজায় রাখে না বরং বন্ধুত্বের বীজও বপন করে”।

বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষী দল

দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে কর্মরত প্রকৌশলীরা গাম্বো এবং মানগাল্লার মধ্যবর্তী ৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। জুবা এবং বোর এলাকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এই সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সড়কটি স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে সংযুক্ত করেছে যাতে তারা সহজে তাদের পণ্য বাজারে নিয়ে আসতে পারে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ১৫০,৬৪৭ জন সদস্য ৪০টি দেশের ৫৪টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে অংশ নিয়েছে।

এদের মধ্যে, শান্তি রক্ষা করতে গিয়ে ১৩৫ জন জীবন দিয়েছে। আরও দুই শতাধিক বিভিন্নভাবে আহত হয়েছে।

২০১৭ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের ৭,৬৩৬ জন সেনা বর্তমানে শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত রয়েছে। এদের মধ্যে ৬,৬৩৬ জন সশস্ত্র বাহিনীর এবং বাকিরা পুলিশ বাহিনীর।

সারা বিশ্বে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের পুরো জনবলের মধ্যে ৬.৫ শতাংশই হলো বাংলাদেশের।

নারী শান্তিরক্ষী

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ৫৭ জন এবং পুলিশ বাহিনীর ৭৯ জন নারী সদস্য বর্তমানে দেশের বাইরে মিশনের কর্মরত রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দুজন নারী পাইলট আফ্রিকাতে হেলিকপ্টারও চালিয়েছে।

২০০০ সালে প্রথমবারের মতো নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে বাংলাদেশ। এর পর থেকে পুলিশ বিভাগের মোট ১,০০৮ নারী শান্তিরক্ষীকে বিভিন্ন মিশনে পাঠানো হয়েছে। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো পুরো নারীদের একটি ইউনিট হাইতিতে পাঠায় বাংলাদেশ।

২০১৭ সালে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো মিশনে দুজন নারী কমব্যাট পাইলট পাঠায় বাংলাদেশ। এরা হলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুতফি।

বাংলাদেশের প্রথম পাঁচজন নারী শান্তিরক্ষীর মধ্যে একজন হলেন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মিলি বিশ্বাস। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন: “ইস্ট তিমুরে এক বছর ছিলাম আমি। কিন্তু শুরুটা আমাদের জন্য অত সহজ ছিল না। প্রতিকূল পরিবেশ পার হতে হয়েছে আমাদেরকে। ইস্ট তিমুর ছিল পুরোপুরি বিধ্বস্ত একটা দেশ। সেখানে পানি ছিল না, গ্যাস বা বিদ্যুৎ কিছুই ছিল না। এই সব কিছুরই মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাদেরকে”।

ওই মিশনে বিভিন্ন দেশের ৪১টি কন্টিনজেন্টের মধ্যে মিলিই ছিলেন একমাত্র নারী কমান্ডার।

বাংলাদেশী সেনারা হতাহতও হয়েছে। সম্প্রতি, মালিতে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) বিস্ফোরণে তাদের তিনজন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও চার জন।

আইভরি কোস্টে ২০১০ সালের নির্বাচনে রাজনীতিবিদ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে যখন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, সে সময় আবিদজানের গলফ হোটেলে পাঁচ মাসের জন্য বাংলাদেশের ১২০ জন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীকে মোতায়েন করা হয়েছিল। বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট সেখানে রাজনৈতিক নেতা আলাসানে দ্রামানে আউত্তারাকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল, যার সাথে তার প্রতিপক্ষ লরা বাগবো’র লড়াই চলছিল। বাগবো নিজেকে নির্বাচনের বিজয়ী দাবি করেছিল।

জাতিসংঘ জানায়, আবিদজানে ২০১০ সালে এপ্রিলের শুরুর দিকে তুমুল যুদ্ধ হয় প্রেসিডেন্ট আউত্তারার বাহিনী এবং সাবেক রিপাবলিকান গার্ড এবং স্পেশাল ফোর্সের একাংশের মধ্যে যারা বাগবোর অনুগত ছিল।

এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডাক্তার সুমনের গায়ে গুলি লাগে এবং তাকে আকাশপথে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিশ (এএসপি) সাইদুর রহমান পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

কিন্তু তাদের এ আত্মত্যাগের কারণে স্থানীয়দের উপচে পড়া কৃতজ্ঞতা অর্জন করে বাংলাদেশ। সিয়েরা লিওনে বাংলা ‘আনুষ্ঠানিক ভাষার’ স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের নামে একটি সড়কের নামকরণও করা হয় সেখানে।

সাউথ সুদানের রাজধানী জুবাতে স্বাধীনতা প্রশ্নে জাতিসংঘ আয়োজিত গণভোট সফলভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট।

লাইবেরিয়াতে বাংলাদেশীদের কাজের প্রশংসা করে প্রেসিডেন্ট ইলেন সারফিল বলেন, “বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট তাদের প্রতিরক্ষা ম্যানডেট থেকে বেরিয়ে এসে দেশের জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সাহায্য করেছে”।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা সেখানে সড়ক নির্মাণ ও মেরামত করেছে এবং দরিদ্র স্থানীয় জনগণকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে।

ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেশান্স ডিরেক্টরেটের (আইএসপিআর) তথ্য মতে, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ছিল কঠিনতম স্থানগুলোর একটি যেখানে কাজ করা খুবই কঠিন।

আইএসপিআর আরও বলেছে, মালি ও সাউথ সুদানে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যরা। শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে আফ্রিকায় যৌন হয়রানির যে সব অভিযোগ রয়েছে, সে প্রসঙ্গে আইএসপিআর বলেছে, যৌন অসদাচরণের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী।

আইএসপিআর আরও জানায়, “বাংলাদেশী কন্টিনজেন্টের কোন সদস্য এ ধরনের কোন অপরাধের সাথে জড়িত হলে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার বাহিনীর আইন ও নিয়মের অধীনে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা  গ্রহণ করেন”।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ১০০,০০০ জনের বেশি শান্তিরক্ষী কাজ করছেন। এদের মধ্যে ১২৩টি দেশের ৯১,১৩২ জন সেনা, ১৩,৫৬৩ জন পুলিশ এবং ১,৮১১ জন সামরিক বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন।

গত বেশ কয়েক বছরে জাতিসংঘ মিশনে চীনের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সেনা সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে ১২তম অবস্থানে রয়েছে চীন। এশিয়ায় তাদের অবস্থান ষষ্ঠ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে মঙ্গোলিয়ার সেনা রয়েছে ৯৫০ জন।

শান্তিরক্ষী মিশনে জাপানের অংশগ্রহণ সময়ের সাথে সাথে কমে গেছে। জাতিসংঘ মিশনে তাদের হাতে গোনা কিছু সেনা রয়েছে।

প্রতিবেশীদের তুলনায় জাতিসংঘে সেনা পাঠানোর দিক থেকে এগিয়ে আছে শ্রীলংকা। ভুটান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনেই, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং মিয়ানমার – এই সবগুলো দেশের সম্মিলিত সেনার সংখ্যা জাতিসংঘ মিশনে মাত্র ১৪০ জন।

SHARE