Home শীর্ষ সংবাদ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে মিয়ানমারের নতুন ফন্দি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে মিয়ানমারের নতুন ফন্দি

61
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৪ জুন) :: আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে আবারও নতুন কৌশল নিয়েছে মিয়ানমার। এবার বলছে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চাইলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে দেশটি। কিন্তু স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার প্রধান তিনটি বিষয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও নিজ বসতভিটেতে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনোটাই মানছে না তারা।

এসব বিষয়ে বরাবরই অনীহা প্রকাশ করে আসছে। এমনকি এই তিন মূল বিষয়ের বিপরীতে দেশটি এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে সেখানে আরো বেশি নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে রোহিঙ্গারা।

ফলে মিয়ানমারের এই নতুন কৌশলের মুখে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়ল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। কারণ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এসব শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক নন বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এসব শর্ত পূরণ ব্যতিরেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে নয় বলে মিয়ানমারকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

মিয়ানমারের এমন প্রস্তাব মানা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে।

বিশ্লেষকরা মিয়ানমারের এই প্রস্তাবকে সময়ক্ষেপণের নতুন কৌশল বলে অভিমত দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এ মাসেই দুটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে মিয়ানমার।

এই চাপগুলো সামাল দিতেই ফিরিয়ে নেওয়ার নামে এই নতুন প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। মিয়ানমার ভালো করেই জানে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও নিজ বসতভিটে ফিরে না পেলে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে না। বাংলাদেশও রাজি হবে না।

বিশেষ করে জাতিসংঘ অনেক আগেই এমন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। মিয়ানমার প্রতিবারই ফিরিয়ে নেওয়ার চাপ বাড়লে নতুন করে কৌশল নেয়। এতে মিয়ানমারের লাভও হয়েছে।

কারণ, এসব চুক্তি ও নতুন নতুন প্রস্তাবের ফলে একদিকে যেমন সময়ক্ষেপণ করতে পেরেছে; তেমনি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি অন্যত্র ফেরাতেও সক্ষম হয়েছে তারা। কিন্তু বাংলাদেশের চাওয়া শরণার্থী প্রত্যাবাসন লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

এ মাসেই মিয়ানমার দুটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতার অভিযোগের বিষয়ে মতামত পাঠাতে বলেছে। এ-সংক্রান্ত এক চিঠিতে ১১ জুনের মধ্যে বাংলাদেশকে মতামত দিতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

আগামী ২০ জুন সংস্থাটি মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকে বসবে। দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিচারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দাবি জানিয়ে আসছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, দ্বিতীয় চাপ হলো আগামী ৮ জুন কানাডায় অনুষ্ঠেয় ‘জি-৭’ শীর্ষ সম্মেলন। মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সম্মেলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজেই রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলবেন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো রোহিঙ্গা ইস্যুতে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, সামনের জি-৭-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে চলমান রোহিঙ্গা সংকটকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। এই বিষয়টি এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগের। সংকট সমাধানে বৈঠক থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা আসতে পারে বলেও আভাস দেন কর্মকর্তারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, সম্মেলনের আউটরীচ প্রোগ্রামে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। আশা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে অংশ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ জুন কানাডায় যাবেন। এর আগে ২০১৬ সালে সংগঠনটির জাপান শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

আন্তর্জাতিক আদালতে মতামত পাঠানোর বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নির্দেশনা মতে, মতামত পাঠানোর প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। আমরা বিষয়টি দেখছি, দেখি কী করা যায়। আগামী ১১ জুনের মধ্যে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে অভিমত পাঠাতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় সংস্থাটি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের এই প্রস্তাব নতুন কৌশল বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, গত বছরের আগস্ট থেকে নতুন করে আসা ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারও মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে।

কিন্তু বাস্তবে ফিরিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা; উল্টো দেশটির নানা কূটকৌশলের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হচ্ছে। উল্টো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের দেওয়া ১০ হাজার রোহিঙ্গার দ্বিতীয় তালিকা নিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারকে দেওয়া ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার প্রথম তালিকা থেকে সাত দফা যাচাই-বাছাই করে মাত্র এক হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দেশটি। এ রোহিঙ্গাদের নিজ বাসস্থানে না রেখে আলাদা ক্যাম্পে রাখার ও নাগরিকত্বের পরিবর্তে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) কার্ড দেবে দেশটি। ফলে সংগত কারণেই বাংলাদেশ এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

এমনকি সর্বশেষ গত ১৭ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের দ্বিতীয় বৈঠকও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো সুখবর দিতে পারেনি।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের নতুন প্রস্তাব কতটুকু যুক্তিযুক্ত জানতে চাইলে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অব.) ইমদাদুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা ততদিন স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে না, যতদিন না ফিরিয়ে নেওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এর জন্য দরকার ওদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিজ বসতভিটেতে রাখা।

এগুলো না হলে ফিরিয়ে নিয়েও লাভ নেই। কারণ পরে নাগরিক নয় বলে নতুন নির্যাতন শুরু হলে পুনরায় ওরা ফিরে আসবে। এ জন্য বাংলাদেশ প্রথম থেকেই নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টি জোর দিয়ে আসছে।

জাতিসংঘও বলছে, অনুকূল পরিবেশ ব্যতিরেকে রোহিঙ্গারা যেতে চাইবে না। তাদের ফেরার জন্য মিয়ানমারে যাতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সে বিষয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো।

গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক বলেন, ফিরে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। লোকজনের এমনভাবে ফেরার সুযোগ থাকা উচিত, যাতে তাদের অধিকারকে সম্মান জানানো হয় এবং একই সঙ্গে তারা নিজেদের বাড়িঘরে গিয়ে ওঠার সুযোগ পায়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ভুল কিছু বলেননি। রোহিঙ্গাদের জোর করে ফেরত পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। ফিরে যাওয়ার বিষয়টি তাদের ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে। সে জন্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় উদ্যোগ হতে পারে সেখানে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। যে কারণে রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে সেগুলোর সুরাহা হতে হবে। রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সেখানে এমন পরিবেশ এবং জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যা আগে থেকেই তাদের ছিল।

তিনি এমনও বলেন, নিজ বসতভিটেতে না রেখে আলাদা ক্যাম্পে রাখতে চাইলে রোহিঙ্গারা যেতে চাইবে না। কারণ সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

একইভাবে গত ৩০ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গেলে আনান কমিশনের কাছে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব পেলে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা।

তারা এও জানান, আশ্রয় পেলেও বাংলাদেশে তারা থেকে যেতে চান না। নাগরিক মর্যাদা পেলে তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিয়ানমার ফিরে যেতে চান। এটি নিশ্চিত করতে তারা কমিশন সদস্যদের আন্তরিক

এ ব্যাপারে অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, ময়ানমার নাগরিকত্ব দিতে চাইছে না। এর পরিবর্তে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড দিতে চাইছে। এটি হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিলেও তারা ঘরের থেকে বের পর্যন্ত হতে পারবে না। অথচ নাগরিকত্ব কার্ড পেলে সব ধরনের সুবিধা পাবে। মিয়ানমারের অন্যান্য নাগরিকের মতোই পূর্ণ অধিকার নিয়ে থাকতে পারবে।

এই গবেষক এমনও বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের দাবি তুলতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। আন্তর্জাতিক চার অপরাধের মধ্যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যা পড়ে। সুতরাং, যেকোনো দেশ বা নাগরিক রোমের আদালতে এই বিচার চাইতে পারে।

SHARE