Home অর্থনীতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অসম্ভবের নির্বাচনী বাজেটে স্বপ্নাচ্ছন্ন অর্থমন্ত্রী

২০১৮-১৯ অর্থবছরে অসম্ভবের নির্বাচনী বাজেটে স্বপ্নাচ্ছন্ন অর্থমন্ত্রী

76
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৮ জুন) :: এবার বাজেট পেশের আগেই ধারণা করা হয়েছিল নির্বাচনকে সামনে রেখে জনতুষ্টির দিকে সরকার বিশেষ মনোযোগ দেবে। নির্বাচিত সরকার জনগণের চিন্তা করে বাজেট করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চিন্তার কতটুকু রাজনৈতিক আর কতটুকু অর্থনৈতিক বিবেচনায় তা নিয়ে বিশ্নেষণ, তর্ক-বিতর্ক শুধু আমাদের দেশে নয়, সারাবিশ্বেই হয়।

প্রশ্নটা বরাবরেরই। বড় বাজেট ভালো না খারাপ? যদি বেশি ব্যয় করে বেশির ভাগ মানুষকে খুশি করা যায়, তাহলে বড় বাজেট নয় কেন? কিন্তু বড় বাজেট নির্ভর করে বড় আয়ের ওপর। যদি বড় আয়ের প্রত্যাশা করে বড় রকমের ঘাটতি থাকে, সে বাজেট হয়ে দাঁড়ায় কল্পতরু। চলতি অর্থবছরও অর্থমন্ত্রী ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছিলেন।

কিন্তু নয় মাসে ৫০ শতাংশও ব্যয় করতে পারেননি। রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশার চেয়ে পিছিয়ে আছে অনেক। যদিও ২০১৮-১৯ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে তিনি বলেছেন, অর্থবছর শেষে সংশোধিত বাজেটের ৯২ শতাংশ বাস্তবায়ন করবেন। অথচ সবাই জানে, বর্ষা-বাদলের প্রান্তিকে গুণগত মানসম্পন্ন কাজ না করে ঢালাওভাবে অর্থ ব্যয় হয়।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চলতি অর্থবছরের অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে আবারো ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো রকম উৎস বের না করেই আবারো স্বপ্নাচ্ছন্ন হলেন তিনি। তার ভাষায়, “বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা আমাকে বিস্মিত ও স্বপ্নচারী করে।

আমি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখি, কতটা আঘাত সহ্য করে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, স্বল্প সম্পদ ও সীমাহীন সীমাবদ্ধতার মধ্যে ‘বাসকেট কেস’ অপবাদ কাটিয়ে কীভাবে ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হয়ে ওঠা যায়। শ্রমবাজারে দুই কোটির বেশি তরুণ-তরুণী দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। আমি বয়সের কারণে তেমন অবদান রাখতে না পারলেও খুবই তৃপ্ত ও নিশ্চিত।’

‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ২০৪১ সালে সুখী-সমৃদ্ধ একটি উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছেন। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে বাজেট পেশ করেছেন। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছেন ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখার লক্ষ্যের কথা বলেছেন।

১৫৫ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এক দশকের উন্নয়নের দীর্ঘ বিবরণ তুলে ধরেছেন। বাজেটের আকার বাড়ানো থেকে শুরু করে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি, সরকারি বিনিয়োগ, মাথাপিছু আয়, মূল্যস্ফীতি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার কমানোর বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করেছেন।

যদিও বাজেট বাস্তবায়নের হার কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়া, ব্যক্তিবিনিয়োগ না হওয়া, রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়া, প্রকল্পে অনেক বেশি অর্থ ব্যয়, মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বিলম্বের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। সংস্কার ও সুশাসন নিয়ে অনেক কথা বললেও আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনার বিষয় তার বক্তব্যে আসেনি।

উপরন্তু ব্যাংকের জন্য করপোরেট করহার কমিয়ে ক্ষয়িষ্ণু ব্যাংক খাতকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। বছরের পর বছর লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও অধিদপ্তরগুলো নিয়েও কোনো কথা বলেননি।

প্রস্তাবিত বাজেট: অর্থমন্ত্রী তার প্রস্তাবিত ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটে কর ছাড় দিলেও আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য। আগামী অর্থবছর এনবিআরের মাধ্যমে আয় প্রাক্কলন করেছেন মোট বাজেটের ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছর রয়েছে ৬২ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়ের খাত অভ্যন্তরীণ ঋণ। খাতটি থেকে জোগান প্রাক্কলন করেছেন বাজেটের ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। করবহির্ভূত খাত থেকে আসবে বাজেটের ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। বাস্তবায়নযোগ্য না হওয়ায় এরই মধ্যে তা সংশোধন করে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এ অবস্থায় আয়ের উৎস না বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রার বড় প্রবৃদ্ধিকে ভ্রম হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরেই নিজেদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এবারো তা-ই হয়েছে। তবে এবার জনগণকে তুষ্ট করতে করছাড়সহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ব্যয় মেটাতে এনবিআরকে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। করের পরিধি ও হার না বাড়ায় এনবিআর চলতি বছরই আগের তুলনায় প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে রয়েছে। এ অবস্থায় করছাড় দিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো দুঃস্বপ্ন বলেই আমি মনে করি।

উচ্চপ্রবৃদ্ধির রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা: চলতি অর্থবছর রাজস্ব খাতে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও প্রথম নয় মাসে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশের কম। ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নয় মাসে আহরণ হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৩১ দশমিক ৬১ শতাংশ। ভ্যাট হার কমলেও ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে এ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজস্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত আয়করে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ২৭ শতাংশ। এ থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। করের পরিধি না বাড়লেও আয়করের সর্বোচ্চ খাত কোম্পানির করপোরেট করে ছাড় দিয়েছেন তিনি। শুল্কে লক্ষ্যমাত্রা ২৮ শতাংশ বাড়ানো হলেও নতুন করে করারোপ হয়নি এ খাতেও। ফলে আওতা না বাড়িয়েই লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে রাজস্ব খাতে। যদিও করহার না বাড়িয়ে কর ব্যবস্থাকে সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ করার কথা জানিয়েছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ প্রয়োজন। আমরা করহার না বাড়িয়ে কর ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে করভিত্তি সম্প্রসারণ করব। আয়করের ক্ষেত্রে করসেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ইটিআইএনধারীর সংখ্যা ৩৫ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। ভ্যাটে ইলেকট্রনিকস ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে ভ্যাটের আওতায় এনে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো হবে।

উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়:

নির্বাচন সামনে রেখে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ে কিছুটা সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। অবকাঠামো খাতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে মোট বাজেটের ৩৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। যদিও অন্যান্য অর্থবছর তা ৩৫ শতাংশের নিচে ছিল। অন্যদিকে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৯০৪ কোটি টাকার অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন খাতেও অনুন্নয়ন ব্যয়ের ৯ দশমিক ১ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বড় অংকের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকলেও আগামী অর্থবছরে  ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক বেশি জরুরি বিবেচনায় এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এডিপি বাস্তবায়নে আরো উত্কর্ষ নিয়ে আসতে অর্থছাড় প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন থেকে বাজেট পাস হওয়ার পরই অনুমোদন না নিয়ে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করা যাবে।

ঘাটতি বাজেট:

বিশাল রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার পরও বাজেটে বড় অংকের ঘাটতি থাকছে। আগামী অর্থবছর ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা; চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা ১ লাখ ১২ হাজার ৪১ কোটি টাকা। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে পরবর্তী সময়ে ঘাটতি আরো বাড়বে। এ ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছর ৫৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে সরকার।

উচ্চপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ:

বাজেটে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অর্জনে বাড়তি যে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৮৭ শতাংশের মধ্যে বেসরকারি খাতের অবদান ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত কয়েক বছরে বিনিয়োগের হার কিছুটা বাড়লেও তাতে উদ্যম আসেনি বেসরকারি খাতে। যদিও কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ চাহিদা, বিদ্যমান বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ ঘাটতি নির্ণয় করা হয়েছে। রফতানিমুখী বৃহৎ শিল্প স্থাপনের উপযোগী বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমরা অর্থনৈতিক জোন সৃষ্টি করেছি। জাহাজ শিল্পকে জাগিয়ে তুলতে প্রণোদনা দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছি।

কর্মসংস্থান:

প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও কর্মসংস্থান সে অনুপাতে হয়নি। অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবনা অনুযায়ী দেশে প্রতি বছর ২০ লাখ শ্রমশক্তি যোগ হলেও গত দুই বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৬ লাখ লোকের। অথচ ২০০২-১৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে কর্মসংস্থান ছিল ১৩ লাখ। যদিও বহির্বিশ্বে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন, সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বড় রোডম্যাপ দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

SHARE