Home কক্সবাজার কক্সবাজারে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পাহাড়ধসের মুখে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা

কক্সবাজারে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পাহাড়ধসের মুখে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা

194
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১১ জুন) :: কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার নামে বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক ব্যাপক পাহাড় কাটার ফলে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

বর্ষায় পাহাড়ধস ও বন্যায় কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছিল আগে থেকেই।

গত ফেব্রুয়ারিতেই এ ব্যাপারে সতর্ক করে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।

দেশের পরিবেশবিদ ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞরাও বর্ষার আগেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। সরকারও এ ব্যাপারে তৎপর। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমও শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পাহাড় ধসের মুখেই পড়তে হলো রোহিঙ্গাদের।

সোমবার ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাটির ঘরের দেয়ালধসে তিন বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়েছে; এ ঘটনায় আহত হয়েছেন তার মা। উখিয়ার কুতুপালং ডি-রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৮ নম্বর পাহাড়ে এ ঘটনা ঘটে বলে উখিয়ার ইউএনও মো. নিকারজ্জামান চৌধুরী জানান।

নিকারুজ্জামান বলেন, গত শনিবার থেকে উখিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। সেই সঙ্গে ঝড়ো হাওয়াও বইছে। এ ছাড়া গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে ভূমিধসে অন্তত ৫০০ লোক আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

এ সময় অন্তত ৬০০ ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে ভূমিধসে। স্থানীয়রা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটার কারণে পরিস্থিতি এখন অনেক নাজুক। টেকনাফের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জি ব্লক, জি-সেভেন ব্লক, বালুখালী ক্যাম্প, টেংখালি এসব এলাকায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।

বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে দুই দিন ধরে কক্সবাজারে ঝড়ো হাওয়া আর একটানা বৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এই বৃষ্টিপাত আরো কয়েকদিন চলবে বলেও জানিয়েছে অধিদফতর। ফলে পাহাড়ধস ও বন্যা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন শরণার্থীরা। এসব শরণার্থী জানান, যারা পাহাড়ের ওপরে বা নিচে ঘর বেঁধেছিল তারা আহত হয়েছে। যারা পাহাড়ের নিচে বাসা বানিয়েছে তারা এখন বন্যার কবলে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে কয়েক লাখ মানুষ বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে পড়বে; এ ধরনের আশঙ্কা প্রথম থেকেই করা হচ্ছিল। কারণ সেখানে বন কেটে উজাড় করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনেকে বাস করছেন টিলা বা পাহাড়ের ওপরে আবার অনেকে বাস করছেন পাহাড়ের নিচে। অর্থাৎ ভূমিধস এবং বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হক জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ স্থানের ব্যবস্থা না করার কারণেই ভূমিধসে এমন আহতের ঘটনা ঘটেছে। টেকনাফের শরণার্থীদের জন্য যে ক্যাম্পগুলো তৈরি করা হয়েছে সেগুলো অস্থায়ী ত্রিপলের ছাউনি এবং বেড়া দিয়ে নির্মিত।

রেড ক্রিসেন্ট বলছে, এখন সেখানে দুই লাখের মতো মানুষ ভূমিধসের ঝুঁকিতে। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই এসব রোহিঙ্গার জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।অবশ্য এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক বলে জানিয়েছে।

কক্সবাজারে সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, বর্ষার আগেই সব ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। এসব রোহিঙ্গা সরিয়ে সম্প্রসারিত কুতুপালং ক্যাম্পের পশ্চিম পাশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা এখনো বুঝে না পাহাড়ধসের ঝুঁকি কী? এর ফলে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই প্রয়োজন তাদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা। তিনি জানান, নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য কক্সবাজারের ১৪ বর্গকিলোমিটার বনভূমি বরাদ্দ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রতিদিন চারটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকার বন উজাড় হচ্ছে। ফলে এদের দ্রুত সরিয়ে না নিলে পাহাড়ধসের মুখে পড়বে।

কক্সবাজার সহকারী জেলা প্রশাসক মাহিদুর রহমান বলেন, জ্বালানি কাঠের জন্য শরণার্থীরা ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার একর বন কেটে ফেলেছে। বন কাটার ফলে তাতে পাহাড়ের উপরিভাগের শক্তি কমে যায়। তাই ভারী বৃষ্টি হলে ধসের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা এমন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বন উজাড় করাকেই পাহাড়ধসের মতো বিপর্যয়ের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতি বছর অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এই এলাকাটি বন্যহাতির আবাসস্থল। গত বছর ভারী বর্ষণে এই অঞ্চলে ভূমিধসে ১৭০ জন নিহত হয়েছে।

২০১২ সালে ভূমিধসে এখানে শতাধিক মানুষ মারা যায়। তারও দুই বছর আগে ভারী বৃষ্টিপাতে ৫০ জন নিহত হয়। তাই বর্ষার আগেই এ অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসবাসরত দুই লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, বিশাল রোহিঙ্গা শিবিরে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে পুরো বর্ষা শুরুর আগেই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বালুখালী ৪ নম্বর ক্যাম্পের পেছনে নতুন ৫৪০ একর ভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে সেখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে।

ইউএনএইচসিআর, আইওএমসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় ইতোমধ্যে নতুন চিহ্নিত স্থানে বসতি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

এ ব্যাপারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, আইওএমের অর্থ সহায়তায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উন্নয়নে ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের ঢালে যাতায়াতের রাস্তাগুলোকে সংস্কার করা হচ্ছে। পাহাড়ধসে রাস্তাগুলো যেন বন্ধ হয়ে না যায়, তার জন্য বালুর বস্তা দিয়ে মজবুত করা হচ্ছে। দাতা সংস্থার কাছ থেকে আরো অর্থ বরাদ্দের আশ্বাস রয়েছে। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া সাত লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে অন্তত দেড় লাখ পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। আর এশিয়ান ডিজাস্টার প্রিপারেডনেস সেন্টার (এডিপিসি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় সম্ভাব্য পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকি-সংক্রান্ত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে ৩১ হাজার ৪৪১টি পরিবারের ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৪৯ রোহিঙ্গা নাগরিক। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ হাজার ৩৭৫ পরিবারের ৬৯ হাজার ৩৫১ জন। ফলে সব মিলে ঝুঁকিতে রয়েছেন ২ লাখ ৩ হাজার রোহিঙ্গা।

এসব রোহিঙ্গার জন্য বিভিন্ন পাহাড়ে নিরাপদ আশ্রয়শিবির গড়ে তোলার কাজ হচ্ছে বিদেশি সহায়তায়। এসব শিবির প্রসঙ্গে স্থানীয় পরিবেশবিদদের মত, সেখানে কোনো ঘরই পরিকল্পিতভাবে করা হয়নি। বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। এমনিতে ভালো। কিন্তু বৃষ্টি হলে মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি হবে। গাছপালা কেটে পাহাড়ে যেভাবে শেল্টার করা হয়েছে, তাতে অনেক পাহাড় ধসে পড়তে পারে।

এ নিয়ে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ক্যারোলাইন গ্লাক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের হিসাবে অন্তত দেড় লাখ মানুষ বন্যা এবং ভূমিধসের মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। তাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া দরকার। তার মতে, আমরা এ পর্যন্ত মাত্র কয়েক হাজার মানুষকে স্থানান্তর করতে পেরেছি। বড় সমস্যা হলো তাদের কোন জায়গায় সরিয়ে নেব? তবে ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গাদের খুব দ্রুতই সরিয়ে নেওয়া দরকার।’

কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পাহাড়-জঙ্গলে নিরাপদ আবাসন নির্মাণের বিষয়টি চ্যালেঞ্জের বলে উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও রোহিঙ্গা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাকির হোসেন। তিনি বলেন, এ এলাকাটি দুর্যোগপ্রবণ, সাইক্লোন ও খারাপ আবহাওয়ার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ এখানে অস্থায়ী শেল্টারে বসবাস করছে। যেটি কেবল ত্রিপলের ছাউনি ও বেড়ায় নির্মিত। এগুলো সত্যি বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যাম্পে কাজ করছে আইওএম। সংস্থাটি সরকার ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে মিলে ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখা এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

বন্যা ও বৃষ্টি-কাদার মধ্যে যেন ক্যাম্পে মানুষের কাছে খাবার, পানি ও জরুরি সাহায্য নিয়ে পৌঁছানো যায়, সেটি ঠিক রাখা জরুরি। কিন্তু ক্যাম্প পরিস্থিতি বলছে, ভূমিধস ও বন্যা ঠেকাতে যে তৎপরতা চলছে, তা সার্বিক সংকটের তুলনায় সামান্য। কারণ ক্যাম্পের যেসব অস্থায়ী ঘরে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস; সেটিকে কোনোভাবেই নিরাপদ বলা যায় না।

এ অবস্থায় সরকার পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাসানচরে সুনির্দিষ্ট মডেলে ঘরবাড়ি, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এক লাখ রোহিঙ্গা ভাসানচরে নেওয়ার কথা জানানো হলেও ঠিক কবে নাগাদ সেটি শুরু হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

 

SHARE