Home অর্থনীতি বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ৫০ শতাংশই ২০ প্রতিষ্ঠানের

বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ৫০ শতাংশই ২০ প্রতিষ্ঠানের

254
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ জুন) :: কয়েক বছর ধরে দেশে গড়ে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আসছে। ২০১৬ সালেও সব মিলিয়ে এফডিআই প্রবাহ ছিল ২৩৩ কোটি ডলার। তবে গত বছর এ প্রবাহ খানিকটা কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৭ সালে দেশে এফডিআই এসেছে ২১৫ কোটি ডলার, যার প্রায় ৫০ শতাংশই ২০ প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সবই বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী পুরনো প্রতিষ্ঠান। এদের মাধ্যমে যে এফডিআই এসেছে, তাও তাদের মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ হিসেবে।

দেশে নিবন্ধিত যৌথ এবং শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগের বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের অর্থ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এন্টারপ্রাইজ সার্ভে বা সমীক্ষা চালিয়ে এফডিআই পরিসংখ্যান সংকলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট নিজস্ব মূলধন বা ইকুইটি, আয়ের পুনর্বিনিয়োগ বা রিইনভেস্টেড আর্নিং ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বা ইন্ট্রা কোম্পানি লোন, এ তিন ভাগে এফডিআই প্রবাহ হিসাব করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সমীক্ষার আওতায় থাকা যৌথ এবং শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগের বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ হাজার ৪০০টি। এর মধ্যে সমীক্ষায় সাড়া দেয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০। এ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০১৭ সালে দেশে নিট এফডিআইয়ে শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল ৪৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, ২০১৭ সালে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২১৫ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এর মধ্যে নিট নিজস্ব মূলধন প্রবাহ ৫৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এছাড়া পুনর্বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল ১২৭ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। আর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণপ্রবাহ ৩৩ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এ হিসাবে মোট এফডিআইয়ের ৫৯ দশমিক ৪৬ শতাংশই প্রতিষ্ঠানের আয়ের পুনর্বিনিয়োগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানমতে, ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি এফডিআই প্রবাহ ছিল টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিষ্ঠান নরওয়েভিত্তিক টেলিনরের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনের। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির নিট এফডিআই ছিল ১৯ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার ডলার।

জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসেন বলেন, টেলিযোগাযোগ একটি বিনিয়োগনির্ভর সেবা খাত। সর্বোচ্চ মানের গ্রাহকসেবা ধরে রাখতে গ্রামীণফোন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে আসছে। ফলে সবচেয়ে বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে। গ্রাহকের জন্য সেবার সর্বোচ্চ মান ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন ডিজিটাল সার্ভিস চালু করতে গ্রামীণফোন ভবিষ্যতেও বিনিয়োগের এ ধারা অব্যাহত রাখবে।

২০১৬ সালের শেষদিকে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি শুরু করে তেল-গ্যাস খাতের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শেভরন। পরবর্তী সময়ে চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এ নিয়ে চুক্তিও হয়। তার পরও গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল শেভরন বাংলাদেশ লিমিটেডের। ২০১৭ সালে এ প্রতিষ্ঠানের এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

শেভরনের বাংলাদেশ কার্যালয়ে নিট এফডিআই-সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকেশন ম্যানেজার (পলিসি, গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স) শেখ জাহিদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশী বিনিয়োগকারী এবং অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক প্রতিষ্ঠান হলো শেভরন।

বাংলাদেশে ব্যবসার সফলতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও সরকারের সহায়তা কাজে লাগিয়ে দেশে জ্বালানির চাহিদায় অবদান রাখার সম্ভাবনা ধরে রাখতে চায় শেভরন। প্রতিযোগিতামূলক নীতি ও বাজারভিত্তিক মূল্য সুবিধা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ অতিরিক্ত বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালে তৃতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। গত বছর ব্যাংকটির নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ৯ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

গত বছর চতুর্থ সর্বোচ্চ এফডিআই প্রবাহ নিয়ে আসা প্রতিষ্ঠান ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড খাতের বিএটিবিসি। তাদের এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ ৭ কোটি ৪৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

পঞ্চম সর্বোচ্চ এফডিআই নিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটি টেলিযোগাযোগ খাতের ইডটকো বাংলাদেশ কো.। প্রতিষ্ঠানটির এফডিআই প্রবাহ ছিল ৬ কোটি ৫২ লাখ ৯০ হাজার ডলার। সর্বোচ্চ এফডিআই প্রবাহ নিয়ে আসা ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ খাতের সেম্বকর্প নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি লি.। বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠানটির গত বছর এফডিআই প্রবাহ ছিল ৬ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার ডলার।

বিদেশী বিনিয়োগকারী শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির এফডিআই প্রবাহ ছিল ৫ কোটি ৬৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অষ্টম প্রতিষ্ঠান উৎপাদন খাতের জিপার প্রস্তুতকারক ওয়াইকেকে বাংলাদেশ প্রা. লি.। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির এফডিআই প্রবাহ ছিল ৫ কোটি ৩০ লাখ ১০ হাজার ডলার। সর্বোচ্চ এফডিআই প্রবাহ নিয়ে আসা নবম প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকিং খাতের হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লি. (এইচএসবিসি)।

গত বছর ব্যাংকটির এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সর্বোচ্চ নিট এফডিআই প্রবাহ নিয়ে আসা দশম প্রতিষ্ঠানটি চামড়া ও চামড়াপণ্য খাতের জিন চ্যাং সুজ (বিডি) লি.। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিট এফডিআই প্রবাহে শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১ থেকে ২০তম অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো যথাক্রমে— আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কো. লি., স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, সামিট করপোরেশন লিমিটেড, অ্যামিগো বাংলাদেশ লি., মেঘনাঘাট পাওয়ার লি., কনজিউমার নিটেক্স লি., তিতাস স্পোর্টসওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., বাংলাদেশ হার্ডল্যান্ড সিরামিকস লি., ডিএইচএল ওয়ার্ল্ডওয়াইড এক্সপ্রেস (বিডি) প্রা. লি. ও ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কো. লি.।

দেশে বিদেশী বিনিয়োগের স্বল্পতা ও অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, যেকোনো শিল্প হতে সময় প্রয়োজন দু-তিন বছর।

এ বছর যে বিনিয়োগ নিবন্ধনের তথ্য আমরা পাচ্ছি, সেগুলো বাস্তবায়নে দু-তিন বছর লাগবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হতে দু-তিন বছর লেগে যাবে। বিদেশী বিনিয়োগের যে কেন্দ্রীভবন দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের বাণিজ্য বিনিয়োগ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়ে গেছে।

আমাদের রফতানি গন্তব্য ও বিদেশী বিনিয়োগের উৎস দেশগুলোর মধ্যেও এ কেন্দ্রীভবন আছে। এজন্য দায়ী আমরাই। আমরা পোশাক খাত উন্নয়নে যে ধরনের উদ্ভাবনী নীতি তৈরির পারদর্শিতা দেখিয়েছি, সেই পারদর্শিতা অন্য খাতে ছড়িয়ে দিতে পারিনি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের বর্তমান নীতি ও উন্নয়ন দর্শনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে আমরা বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রে আরো এগিয়ে যেতে পারব।

SHARE