Home কলাম বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা

129
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৩০ জুন) :: বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন-ভারত লড়াইয়ের শুরু ১৯৭৫ সালের ৩১ থেকে। তখন চীন ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী সর্বশেষ দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারত ছিলো প্রকাশ্য অংশীদার, দেশটি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধে নিজের সেনাবাহিনীও মোতায়েন করেছে।

বাংলাদেশকে ঘিরে চীন-ভারতের প্রতিযোগিতা আবারো খবরের শিরোনাম হয়েছে যখন অতি সম্প্রতি ভারতের নৌবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ সফর করেন প্রথমবারের মতো দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সমন্বিত টহল (করপাট) মহড়া উদ্বোধনের জন্য। গত বছর বাংলাদেশের নৌবাহিনীতে চীনের তৈরি দুটি এ্যাটাক সাবমেরিন সংযোজন করা হয়, যা ভারতকে খুশি করেনি।

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয় যে, বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নাজিমুদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ এডমিরাল সুনীল লানবা বাংলাদেশ সফর করেন। তারা যৌথভাবে ভারত-বাংলাদেশ করপাট উদ্বোধন করেন।

বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন গ্রহণ করার পরপরই ভারতীয় ভাষ্যকাররা তুমুল হৈ চৈ শুরু করলে নালবা গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশ সফর করেন। তার সফরের কয়েক দিনের মধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরও সফরে যান। আর সেটি ছিলো কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম কোন ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঢাকা সফর।

গত সপ্তাহের সফরে লানবা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাত করেন।

এই সফর থেকে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের প্রভাবের বিষয়টি কেমন বুঝা যাচ্ছে? এটা বুঝতে হলে কিছুটা পেছনে তাকাতে হবে।

ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এবং এর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। ১৯৭৫ সালের আগস্টে একদল জুনিয়র সেনা কর্মকর্তার হাতে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে দলটি ক্ষমতা হারায়।

এরপর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য কমাতে চীনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। ১৯৭৫ সালে সেনা প্রধান এবং পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালে তিনি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) গঠন করেন। এটি বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে বড় বিরোধী রাজনৈতিক দল।

১৯৭৫ পরবর্তী সময়টি ছিলো চীন ও বাংলদেশের সামরিক-বেসামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্বর্ণযুগ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয় পায় এবং চীন এতে সায় দেয়। ভারত ও চীনকে নিয়ে মনোভাবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রয়েছে মেরুকরণ। ১৯৯৬ সালে ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত এ অবস্থা বজায় ছিলো। তখন থেকে ভারতের প্রবেশ ও প্রভাব আবার বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি চীনের ন্যায্য সমর্থন ভারতের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমতায় আসলে দলটি ভারতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে অনেক বেশি খোলামেলা হয়ে পড়ে। ২০১০ সালে ভারতের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সফট লোট পায় বাংলাদেশ। কোন দেশকে দেয়া ভারতের এটাই সবচেয়ে বড় ঋণ। ২০১৭ সালে ভারত আরো ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদানের কথা ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আলাদা করে রাখা হয় ভারতের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য।

এরপরও বাংলাদেশের সেনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে চীন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে চুক্তিটি সই হবে বলে আশা করা হয়েছিলো কিন্তু তা হয়নি। ভারত এই প্রচেষ্টায় বাধ সেধেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

গত বছর চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি সাবমেরিন গ্রহণের কথা আগেই বলা হয়েছে। চীন এগুলো বেশ সস্তায় বাংলাদেশকে সরবরাহ করে। কিন্তু এতে ভারতের অস্বস্তি বৃদ্ধি পায়। এর জের ধরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সাবমেরিন চালনা প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেয় ভারত। এ বিষয়ে কি অগ্রগতি হয়েছে তা আর প্রকাশ করা হয়নি। তবে, লানবার সফর ও করপাট যেভাবে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে তাতে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে বাংলাদেশ ও এর জলসীমায় ভৌত উপস্থিতি বজায় রাখতে ভারত অনেক বেশী আগ্রহী।

চলতি বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। এ সময়ে পর্দার আড়ালে অনেক কিছু ঘটতে পারে। ঢাকার মনোযোগ আকর্ষণে বেইজিং ও দিল্লির প্রতিযোগিতা নিশ্চিতভাবে নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে- যদিও এখন মনে হচ্ছে ভারতই এগিয়ে আছে।

SHARE