Home আন্তর্জাতিক পাকিস্তানের নির্বাচন : সেনাবাহিনীর প্রভাব মুক্ত হবে কি

পাকিস্তানের নির্বাচন : সেনাবাহিনীর প্রভাব মুক্ত হবে কি

111
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ জুলাই) :: পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের উদ্দেশ্যে আগামীকাল ভোটকেন্দ্রে যাবেন পাকিস্তানের ১০ কোটি ৬০ লাখ ভোটার। এ জন্য ৮৫ হাজার পোলিং বুথ খোলা হয়েছে সারা দেশে। সকাল ৮টায় শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বুথে ঢুকে একজন ভোটার দুটি করে ভোট দেবেন। একটি জাতীয় পরিষদের এবং অন্যটি তার প্রাদেশিক পরিষদের পছন্দের প্রার্থীকে। উল্লেখ্য, দেশটির ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী আজ অবধি তার পাঁচ বছর মেয়াদের পুরোটা গদিনশিন থাকার সুযোগ পাননি।

ত্রিশটি সক্রিয় রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এ নির্বাচনে। তবে প্রদেশগুলোয় এবং কেন্দ্রে প্রতিদ্ব›িদ্বতা মূলত সীমিত থাকবে সাবেক শাসকদল নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের মধ্যে। অন্যান্য আসনগুলো ভাগাভাগি করে নেবে বিলওয়াল ভুট্টো জারদারির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এবং ডানপন্থি উগ্র ধর্মীয় দলগুলোর জোট মুত্তাহিদা মজলিস-ই-আমল (এমএমএ)। পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখা- এ চারটি প্রদেশ রয়েছে পাকিস্তানে। জাতীয় পরিষদে আসন পূরণের জন্য প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন ২৭২ জন প্রতিনিধি। কোনো একটি দল এর মধ্যে ১৩৭টি আসন কব্জা করতে পারলে এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ পাবে তারা।

এবার দেখা যাক, অর্জনের পাল্লা এ মুহূর্তে ঝুঁকে আছে কোন দিকে? গুরুত্বপূর্ণ পাঞ্জাব প্রদেশে পিটিআইয়ের কাছে ইতোমধ্যেই শক্তি খুইয়ে বসে আছে পিএমএল-এন। প্রদেশটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে, যেহেতু প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য নির্ধারিত ২৭২টি আসনের অর্ধেকের বেশি আসন রয়েছে এ প্রদেশেই। এখানে নওয়াজের দলের অনেক নেতা ইতোমধ্যেই রং বদলে যোগ দিয়েছেন ইমরানের সঙ্গে, অথবা স্বতন্ত্রভাবেই নেমেছেন প্রতিদ্ব›িদ্বতায়।

অন্যদিকে গ্রামীণ পটভূমির সিন্ধু প্রদেশে ভালো ফল করবে পিপিপি এবং উত্তর প্রান্তের খাইবার পাখতুনখা প্রদেশে পিটিআইকে হটিয়ে ইতোমধ্যেই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে উগ্রপন্থি ধর্মীয় জোট এমএমএ। নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবেই সূ² কারচুপি এবং ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ১৩ জুলাই দক্ষিণের মাসতুং জেলায় রাজনৈতিক সমাবেশে হামলায় নিহত হয়েছে দেড় শতাধিক। এ নিয়ে এবারের নির্বাচনী সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৭০। তবে সহিংসতা এড়াতে আগামীকাল দেশজুড়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার সেনা মোতায়েন করা হবে।

এদিকে নির্বাচন প্রভাবিত করার দায়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। রানা ইকবাল সিরাজ পাকিস্তানের একজন ঝানু রাজনীতিক, নওয়াজ শরিফের দল করেন। তার ফোনে অচেনা নাম্বার থেকে একটি ফোনকল আসে গত মাসে। অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোনে তাকে তার প্রিয় দল ছাড়ার জন্য হুমকি দেয়। এর দিনকয়েক পর রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এসে রীতিমতো তাদের অফিসে তুলে নিয়ে যায় তাকে। হুবহু একই বার্তা দেয়া হয় সেখানেও, এখনো সময় আছে, নওয়াজের দল ছাড়ো! হুমকি আমলে নেননি সিরাজ। পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে নামেন তিনি।

এর কয়েক দিনের মধ্যে সেনা ইন্ধনে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হানা দেয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। সংবাদমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে সিরাজ বলেন, ওরা আমার গুদামে হানা দিচ্ছে, আমার লোকজনকে মারপিট করছে। কেন, আমার কী অপরাধ? পিএমএল-এন এর টিকেটে নির্বাচন করছি, এটাই?

নির্বাচনে সাবেক শাসক দলটিকে আরো নিস্তেজ করার উদ্দেশ্যেই আড়ালে থেকে এসব অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। দলটির নেতারা জানান, আদালতের ওপর চাপ দিয়ে নওয়াজ শরিফের মতো শীর্ষ প্রার্থীদের অকেজো করে রাখা হচ্ছে। উল্টোদিকে শীর্ষ সামরিক বলয়ের নেকনজরে থাকা ভয়ঙ্কর জঙ্গিদের আইনি সুবিধায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়ে আগামীতে তাদের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করা হচ্ছে।

সামরিক তৎপরতায় সবচেয়ে বেশি উপকৃত হওয়ার প্রচার রয়েছে পিটিআইয়ের নামে। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে তালিবান লড়াইকে জোর সমর্থন দিয়ে সামরিক চক্রের আরো প্রিয়পাত্র হয়েছেন ইমরান খান, যদিও প্রকাশ্যে এ মিত্রতা কখনো স্বীকার করেননি তিনি।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও স্বাধীনতার পরবর্তী ৭০ বছরের ইতিহাসের অর্ধেককাল দেশটি শাসন করেছে তাদের সেনাবাহিনী। গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও বিপুল ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি ভোগ করেছে তারা। পররাষ্ট্র এবং নিরাপত্তাবিষয়ক নীতি নির্ধারণ করেছে। আফগানিস্তানের তালিবান বাহিনীসহ সব ধরনের চরমপন্থি জঙ্গিদের সহযোগিতা দিয়ে গেছে। মূলত প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র ইস্যুগুলো নিজের করায়ত্ত করতে গিয়েই সেনাবাহিনীর কুনজরে পড়ে যান এবং গদিচ্যুত হন নওয়াজ শরিফ। সেনাবাহিনী গভীরভাবে বিশ্বাস করে, প্রতিরক্ষা কিংবা পররাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একান্তই তাদের এখতিয়ারভুক্ত।

এ মাসেই মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। এদিকে, গত শনিবার বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ এবং শরিফ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্সকে (আইএসআই) অভিযুক্ত করেছে ইসলামাবাদের একটি আদালত।

রাওয়ালপিন্ডির আইনজীবী সম্মেলনে আইএসআইকে অভিযুক্ত করে বিচারপতি শওকত আজিজের দেয়া ওই বক্তব্যের ‘বিশেষ’ অংশটুকু প্রচারে বিরত থাকে স্থানীয় টেলিভিশনগুলো, যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক নেটওয়ার্কে ভাইরাল হয়ে তা ছড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাপী।

পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এ নির্বাচনের ওপর, বলেছেন পিপিপি নেতা এবং দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ বন্ধ হওয়া দরকার। অন্যদিকে, সামরিক চাপের কারণে নয়, বরং নওয়াজ তার নিজের পাপেই ডুবেছেন বলে মনে করেন পিটিআই নেতা ইমরান। ব্যক্তিজীবনে অনেক কিসসা-কাহিনীর নায়ক সুদর্শন সাবেক এ ক্রিকেটারকেই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পাচ্ছেন অনেকে।

ইমরানকে নিয়ে তেমন কোনো অভিলাষ সেনাবাহিনীর হিসেবের খাতায় থাকলেও প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনোভাবেই বেসামরিক দায়িত্বে ছেড়ে দিতে রাজি হবে না তারা। লাহোরভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক ডেইলি টাইমসের সম্পাদক রাজা রুমি এ বিষয়ে আরো মনে করেন, সবচেয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনী নিজেই। এমন একটি পার্লামেন্ট চাইছে তারা যারা পররাষ্ট্রনীতি কিংবা সামরিক বাজেটে নাক গলাতে আসবে না। যারা কেবল রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা আর গাছ লাগানোর কর্মসূচি নিয়েই ব্যস্ত থাকবে সারাক্ষণ।

নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত যারাই আসুক ক্ষমতায়, দেশকে এগিয়ে নিতে পাহাড়সমান বাধার মুখে পড়তে হবে তাদের। এর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস, আফগানিস্তান এবং ভারতের সঙ্গে টালমাটাল সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান অবনতি এবং ক্রমে চুপসে যাওয়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার। সেনাবাহিনী ভাবছে চীনের সহায়তায় এ দুরবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। পাকিস্তানের অবকাঠামো খাতে ইতোমধ্যেই ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে চীন। এ ছাড়া ঋণ হিসেবে দিয়েছে আরো শত কোটি ডলার।

তবে পাকিস্তানের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর এ জাতীয় নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সব মহলেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে পিএমএল-এন বেশি ভোট পেলেও অন্যান্য সহযোগীর ওপর সামরিক চাপ থাকার কারণে সরকার গঠনে হিমশিম খেতে হবে তাদের। এসব বিবেচনায় বরং ছোটখাট দলের সহযোগিতায় পরবর্তী সরকার গঠনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনাটি এখনো ঝুলছে ইমরান খানের সামনেই। শীর্ষ ক‚টনীতি বিশেষজ্ঞ আহমেদ রশিদ বলেন, অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। এই প্রথম প্রমাণ হচ্ছে সামাজিক নেটওয়ার্ক এখন কতোটা শক্তিমান। গত মাসে সামরিক শক্তি নিয়ন্ত্রিত লাহোরে সাংবাদিক গুল বুখারিকে অপহরণের খবর টুইটারসহ সামাজিক নেটওয়াশর্েু ছড়িয়ে যাওয়ার কারণেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভেতর সেনাবাহিনীর কড়া সমালোচক এ লেখককে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। দেশটির অভিজ্ঞ গণমাধ্যম এবং সংবাদপত্র, যেমন, ডন পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল জিও নিউজ ইতোমধ্যেই অবস্থান নিয়েছে সেনাশক্তির বিপক্ষে।

তবু স্বস্তিতে নেই অধিকাংশ প্রার্থী। এবার ভোটকেন্দ্রের বাইরে শুধু নয়, ভেতরেও থাকবে বিচারিক ক্ষমতার অধিকারী সেনাবাহিনী। তবে সামাজিক নেটওয়ার্কের ভয়ে সেনাবাহিনী কিংবা তার মিত্ররা সংযত থাকতে বাধ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খুররাম দস্তগির। কিছুই গোপন থাকে না এখন, সবই প্রকাশ হয়ে যায়। কুড়ি বছর আগের ছল ও বলের কৌশল কাজে আসবে না এখন। প্রযুক্তির হাত ধরে পাকিস্তানের সমাজও এগিয়েছে অনেকটা পথ।

SHARE