Home অর্থনীতি রাজস্ব বাড়াতে শুল্ক ফাঁকি রোধে কঠোর হচ্ছে এনবিআর

রাজস্ব বাড়াতে শুল্ক ফাঁকি রোধে কঠোর হচ্ছে এনবিআর

72
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৪ আগস্ট) :: রাজস্ব বাড়াতে শুল্ক ফাঁকি বন্ধে আরো কঠোর হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর অংশ হিসেবে পণ্য আমদানি-রফতানিতে ডজনখানেক নতুন উদ্যোগ চালু করছে সংস্থাটি। পণ্য খালাসের আগে ডাটা এন্ট্রি, পণ্যের বাণিজ্যিক বিবরণ, এইচএস কোড সংরক্ষণ, কায়িক পরীক্ষা ও  সমজাতীয় পণ্যের অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ করে শুল্কায়ন এর মধ্যে অন্যতম। পাশাপাশি খালাসকৃত পণ্যের প্রাত্যহিক ও মাসিক নিরীক্ষাও জোরদার করা হচ্ছে।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সব কাস্টমস হাউজ, কাস্টমস স্টেশন ও কমিশনারেটে এসব পদ্ধতি কার্যকর করতে এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে এনবিআরের শুল্ক অনুবিভাগ।

এনবিআর বলছে, আমদানিকৃত পণ্যের খালাসের আগে কায়িক পরীক্ষার ক্ষেত্রে ২০১৩ সাল থেকেই স্বয়ংক্রিয় যাচাই প্রক্রিয়া অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবহার করছে কাস্টমস হাউজ। তবে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সীমিত থাকায় সব তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্যই গ্রহণ করায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ নেন ব্যবসায়ীরা। এটা বন্ধে সমজাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে অভিন্ন মূল্য নির্ধারণের বিধান রেখে নতুন আদেশ জারি করা হয়েছে।

পাশাপাশি পণ্য খালাস প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে এখন থেকে পণ্যের এলসিএ, এলসি, ইনভয়েস, ইন্ডেন্ট, বিল অব এক্সচেঞ্জ, বিল অব ল্যান্ডিং, প্যাকিং লিস্ট, কান্ট্রি অব অরিজিন, পণ্যের নাম, ব্র্যান্ড, আর্ট ও পার্ট নাম্বার, স্পেসিফিকেশন, আকার-আকৃতি, প্রকৃতি, সংখ্যা বা ইউনিট, পরিমাপ, মোট ও নিট ওজনসহ যাবতীয় তথ্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের জন্য সরবরাহ করার বিধান যোগ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া শেষে চালানের প্রাত্যহিক ও মাসিক নিরীক্ষার মাধ্যমে তার প্রতিবেদন এনবিআরে দাখিল করতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমার পাশাপাশি শুল্ক ফাঁকি বন্ধ ও পণ্য খালাসে শৃঙ্খলা আসবে বলে মনে করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

এনবিআরের শুল্কনীতির সদস্য ফিরোজ শাহ আলম বলেন, কাস্টমস ও শুল্ক স্টেশনগুলোয় পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সহজ করা ও শুল্কায়ন মূল্য অভিন্ন করতে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। একই দেশ থেকে অভিন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করা হলে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ হবে। শুল্ক মূল্যায়নে রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাত্যহিক ও মাসিক নিরীক্ষা পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সব পক্ষের স্বচ্ছতার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

৩০ জুলাই শুল্ক বিভাগ থেকে জারি করা স্থায়ী আদেশে বলা হয়, আমদানি পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করে শুল্কায়নের ক্ষেত্রে এনবিআরের প্রজ্ঞাপন এসআরও ৫৭-আইন/২০০০/১৮২১-এর মাধ্যমে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে সম্পন্ন হবে। পণ্য শুল্কায়নে এখন থেকে আমদানিকারক বা তার মনোনীত প্রতিনিধিকে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের জন্য বিল অব এন্ট্রি (বিই) ও ডাটা এট্রি শিটে  (ডিইএস) যুক্ত করতে হবে।

আমদানি দলিলাদির ক্ষেত্রে আমদানিকারককে পণ্যের এলসিএ, এলসি, ইনভয়েস, ইন্ডেন্ট, বিল অব এক্সচেঞ্জ, বিল অব ল্যান্ডিং বা জাহাজীকরণ তথ্য সরবরাহ করতে হবে। পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে প্যাকিং লিস্ট, কান্ট্রি অব অরিজিন, পণ্যের নাম, ব্র্যান্ড, আর্ট ও পার্ট নাম্বার, স্পেসিফিকেশন, আকার-আকৃতি, প্রকৃতিসহ অন্যান্য তথ্য সরবরাহ করতে হবে আমদানিকারককে।

আমদানির আগে মূল্য ঘোষণার ফরম অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে পূরণ করে অন্য তথ্যের সঙ্গে পণ্যের সংখ্যা বা ইউনিট, পরিমাপ, মোট ও নিট ওজনসহ যাবতীয় তথ্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে সরবরাহ করতে হবে ব্যবসায়ীদের।

এক্ষেত্রে কাস্টমসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পণ্যের কায়িক পরীক্ষা করে আমদানিকারকদের প্রদত্ত তথ্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে যুক্ত করবেন। কাস্টমসের সফটওয়্যারে যুক্ত এসব তথ্য আবার প্রাত্যহিক ও মাসিক ভিত্তিতে যাচাই করে এনবিআরে প্রতিবেদন দিতে হবে কাস্টমস কর্মকর্তাদের।

পণ্যের মূল্যের ওপর শুল্কায়নে এতদিন আমদানি-রফতানিকারকদের প্রদত্ত তথ্য গ্রহণ করলেও এখন তা হবে না। ১ সেপ্টেম্বর থেকে কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রতিদিন বা মাসিক ভিত্তিতে পণ্য চালান যাচাই করে সমজাতীয় পণ্যে অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ করবেন।

এক্ষেত্রে আমদানি বা রফতানিকারক কর্তৃক অভিন্ন পণ্য (অভিন্ন ব্র্যান্ড, স্পেসিফিকেশন, উৎস দেশ) হলে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তা যেকোনো আমদানিকারকের ঘোষিত সর্বোচ্চ মূল্যের তথ্য গ্রহণ করবেন।

তবে কাস্টমস কর্মকর্তাদের নির্ধারণ করা পণ্যমূল্যের সঙ্গে আমদানিকারকদের তথ্যে গরমিল হলে কমিশনার বরাবর আবেদন করে তা সমাধান করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। ভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যের তথ্য পাওয়া না গেলে আমদানিকৃত দেশে ওই পণ্যের উৎপাদন ও বাজারমূল্য যাচাই করে শুল্কায়ন করবেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

পণ্যের চালানে প্রাত্যহিক ও মাসিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রতিটি শুল্কায়ন গ্রুপের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রতিদিন তাদের কর্মদিবস শেষে সব চালানের মূল্যায়ন ও শুল্কায়িত তথ্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে সংযুক্ত করবেন। কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা পণ্যের কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে এ সফটওয়্যারে তথ্য সংযুক্ত করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউজ বা শুল্ক স্টেশনের কমিশনার তিন বা চারটি শুল্কায়ন কমিটি গঠন করে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের পর মাসভিত্তিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করবেন। নিরীক্ষা টিম দৈবচয়নের ভিত্তিতে নিরীক্ষা সম্পন্ন করে তার তথ্য এনবিআরে জমা দেবেন। কমিটির জমা দেয়া তথ্য কেন্দ্রীয় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেবে এনবিআর।

নতুন নির্দেশনায় মূলত সমজাতীয় পণ্যের অভিন্ন মূল্য নির্ধারণকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানান বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী।

তিনি বলেন, একই জাতীয় পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে এনে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো মূল্য দেখাতে পারতেন। আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্যই গ্রহণ করত এনবিআর। একই দেশ থেকে সমজাতীয় পণ্য বিভিন্ন কাস্টমসে আমদানির সময় ভিন্ন ভিন্ন মূল্য তথ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কম পেত সরকার।

নতুন নির্দেশনায় সমজাতীয় পণ্যের উৎস দেশ বিবেচনায় একটি অভিন্ন মূল্য নির্ধারণের সুযোগ থাকায় শুল্ক ফাঁকি অনেকাংশে কমবে। তাছাড়া কায়িক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বর্ণনা, একক, পরিমাপ ও মূল্যায়ন একটি পদ্ধতির মধ্যে আসায় পণ্য খালাসে শৃঙ্খলা আসবে।

নতুন নির্দেশনায় আমদানি-রফতানি সহজতর হলেও শুল্ক মূল্যায়নে অভিন্ন পদ্ধতি ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। ব্যবসায়ীরা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অনেক সময় কম দামে পণ্য আমদানি করতে পারেন। সমজাতীয় পণ্য একই উৎস দেশের হলেও অনেক সময় মানের কারণে দামের পার্থক্য হয়। ফলে অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ ঠিক হবে না। কোনো ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক মূল্য দেখালে সেক্ষেত্রেই কেবল অভিন্ন মূল্য পরিপালন করা যেতে পারে।

SHARE