Home অর্থনীতি সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমার আতঙ্কে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমার আতঙ্কে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা

315
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৭ আগস্ট) :: জনগণকে সঞ্চয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করা ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মাধ্যমে আহরণ করার নাম সঞ্চয়পত্র।এ কারনে নিরাপদ বিনিয়োগ বলেই পরিচিত সঞ্চয়পত্র। কিন্তু বর্তমানে সঞ্চয়পত্র এতো জনপ্রিয় হয়েছে যে তা সরকারের দায় বাড়াচ্ছে। বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এক লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটার পর গ্রাহকরা মাসে ৯১২ টাকা সুদ পাচ্ছেন।

তবে ৮ আগস্ট সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর খবরে বিপাকে পড়ে গেছে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপ জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। আবার দেশে নেই নিরাপদ বিনিয়োগের অনেক মাধ্যম। ফলে বাধ্য হয়ে ভরসা করতে হয় সঞ্চয়পত্রকেই।যাঁরা শেয়ারবাজারের ঝুঁকিতে যেতে চান না, তাঁদের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা এই সঞ্চয়পত্র। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্তরাই এখানে বিনিয়োগ বেশি করেন। আবার স্থায়ী আমানতের সুদ কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সঞ্চয়পত্র ছাড়া আর কোনো বিকল্পও নেই। আর এখন যদি সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমে যায় যাঁরা এর ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন, তাঁরা সত্যিকার অর্থেই সংকটে পড়বেন। তাই সঞ্চয়কারীরা অবশ্য চান না কোনোভাবেই এই সুদ কমে যাক।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়,২০১৭-১৮ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) বিক্রি হয়েছে ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। এর আগের অর্থ বছরে ২০১৬-১৭ বিক্রি হয়েছিল ৭৫ হাজার ১৩৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ার কারণে গত অর্থবছরে সরকারের সুদ পরিশোধও বেড়েছে।

তবে প্রায়ই কলা হয় সঞ্চয়পত্র সরকারের দায় (লায়াবিলিটি) বাড়াচ্ছে। এই কথা বলতে গিয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রির তথ্য দেওয়া হয়েছে। সরকার কত প্রকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে তার তালিকা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে সঞ্চয়পত্রে প্রদত্ত সুদের হার বেশি। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা ঘোরতর আপত্তি করে। তাদের যুক্তি ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে তাদের ঋণে টান পড়ে। এতে অনেক সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতা ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়। ব্যাংককে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলো তখন সরকারকে ঋণ দিতেই স্বস্তি বোধ করে। কারণ এতে সুদের হার কম হলেও ঋণখেলাপের সম্ভাবনা নেই। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিক তা চায় না। এই স্থলে সরকারের ব্যাংক ঋণ নেওয়ার বিরুদ্ধে একটি কথা বলতে হয়। সরকার ঋণ নেয় সরকারি ব্যাংক থেকে। এই ঋণে সুদ দেওয়া হয় কম। ব্যবসায়ীরা যে সুদে ব্যাংকঋণ নেয়, সরকার নেয় তার অর্ধেক হারে। ব্যবসায়ীরা যে সুদে ঋণ নেয় সেই সুদের হারে যদি সরকার ঋণ নিত তাহলে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারের চেয়ে তা অধিকই হতো।

এ প্রসঙ্গে সঞ্চয়পত্রে সুদ হার সমন্বয় দরকার কিনা তা জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্র্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আসলে সেটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তবে তার আগে তাদের স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা উচিত এ সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা কারা? এদের মধ্যে কতভাগ ধনীক শ্রেণি; কত ভাগ মধ্যবিত্ত আর কত ভাগ নিম্ন বিত্ত? তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্র থেকে যে সুদ আসে তার মাধ্যমে এক শ্রেণির প্রবীণ একসময়ে গিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটান। তাদের কথা ভেবে এ সুদ কমানো উচিত হবে না। তবে সমন্বয়ের ব্যাপারে ভেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু সেটাও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের কথা মাথায় রেখেই করতে হবে। যেন সঞ্চয়পত্রের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিভিন্ন সময় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি গত ২ আগস্ট ব্যাংক মালিক ও নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর কথা বলেন। তবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কত হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ৮ আগস্ট অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করবেন। এর আগে গত ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ফজলে কবিরও সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানোর প্রস্তাব করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা বাবদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু মুনাফাই (সুদ) পরিশোধ হয়েছে ২০ হাজার দুই কোটি টাকা।

জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ২২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মুনাফা পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। আর গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হয়েছে ৩ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার।

এদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (সংশোধিত) থেকেও দুই হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য চলতি অর্থবছরে এই খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘ব্যাংকের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি হওয়ার কারণেই এর বিক্রি বেড়েছে। আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ঋণের বোঝাও বেড়ে গেছে।’

তবে অন্য কয়েকটি সূত্র বলছে,সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছেন তার কোনও পরিসংখ্যান নেই সঞ্চয় অধিদফতরের কাছে। স্বল্প আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের কাছে বিক্রি করার কথা থাকলেও বর্তমানে সঞ্চয়পত্র কিনছেন বিত্তবানরাই। এই তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বড় পদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র দেশের যে কোনও নাগরিক কিনতে পারেন। এই দুই ধরনের সঞ্চয়পত্র ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে ৩০ লাখ ও যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকার পর্যন্ত কেনার সুযোগ আছে।

পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার পর্যন্ত কেনা যায়। তবে সবাই এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন না। কেবল ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী যে কোনও বয়সী নারী-পুরুষ এবং ৬৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নারী ও পুরুষ এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার পর্যন্ত কেনা যায়। এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন কেবল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা অফিস, সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের অধীনস্থ সারাদেশে ৭১টি সঞ্চয় ব্যুরো অফিস এবং পোস্ট অফিস থেকে এসব সঞ্চয়পত্র কেনা ও নগদায়ন করা যায়।   সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এ ছাড়া, ডাকঘর সঞ্চয়পত্র নামে আরও একটি সঞ্চয়পত্র স্কিম রয়েছে, যা শুধু ডাকঘর থেকে লেনদেন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশের যে কেউ এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

সর্বশেষ ২০১৫ সালে মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার গড়ে ২ শতাংশ করে কমানো হয়।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার। দুই মাস আগে অর্থাৎ মে মাসে ১০ হাজার ৯৩০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। সব মিলে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭৮ হাজার কোটি টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র।

জানা গেছে, মূলত দু’টি কারণে সবাই সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। প্রথমত, গ্রাহকদের কাছে অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার যেকোনও আমানতের সুদের হারের চেয়ে অনেক বেশি।  তবে সঞ্চয় অধিদফতরের মহাপরিচালক শামসুন্নাহার বেগম মনে করেন, ‘সঞ্চয়পত্র যারা কেনেন, তারা সুদের হার ছাড়াও এখানে টাকা রাখাকে নিরাপদ ভাবেন।’ তিনি বলেন, ১৮ বছরের বেশি বয়সী বাংলাদেশের যে কোনও সুস্থ নাগরিক সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

এদিকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো তিন মাস মেয়াদী আমানতের সর্বোচ্চ সুদের হার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করার পর সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্র কিনে রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২ কোটি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে তারা সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। তবে স্বল্প আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের চেয়ে এই খাতে বিনিয়োগ বেশি করছেন বড় পদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনীতিবিদ ও ধনী ব্যক্তিরা।’

SHARE