Home সাহিত্য বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ন্যাশনালিজম’ ভাবনা

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ন্যাশনালিজম’ ভাবনা

152
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৮ আগস্ট) :: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতীয় কবি ও জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। তাঁর লেখা গান বাংলাদেশেরও জাতীয় সঙ্গীত। এমনকি শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীতের রচনায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব রয়েছে। কলোনিয়াল শাসন পরবর্তীযুগে উপমহাদেশের এই নতুন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ভারত রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে আপত্তি থাকলেও ভারতের জাতীয় কবিকে নিয়ে তেমন বড় কোনো সমস্যা নেই। যেমন, বাংলাদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতি প্রবল। আবার ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী দেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। এঁরা ভারতের সাথে সম্পর্কিত সব কিছুই ছেঁটে ফেলতে চায়, তারপরও অন্তত আমার জানা মতে এখন পর্যন্ত কেউ জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তনের প্রস্তাব করে নি। আবার ধরুন, “সারে যাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্থা হামারা”, (Nandy 2006 : 3500) যা মূলত ভারতের রণসঙ্গীত, এমনকি পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের সময় এই গান গেয়ে যুদ্ধের ময়দানে ভারতীয় সেনারা মনোবল মজবুত রাখে। মজার ব্যাপার হল, এই গানের রচয়িতা হলেন মুহাম্মাদ ইকবাল, পাকিস্তানের জাতীয় কবি।

এই কয়েকটি উদাহরণই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এই উপমহাদেশে কতোশত মিলের পরেও কিছু আবিষ্কৃত অমিলের ভিত্তিতে মানচিত্রের রেখায় নিজেদের একটি পরিচয় কনসর্ট্যাক্ট করা হয়েছে, ও তা অব্যাহত রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে পশ্চিমা ন্যাশনালিজম এর আমদানিকৃত ধারণা। সেই ধারণায় রবীন্দ্রনাথকেও ’ন্যাশনালিস্ট কবি’ এবং ’ন্যাশনালিস্ট নেতার’ খেতাব দিয়ে ‘ন্যাশান স্টেটের ন্যাশনালিজমের সিম্বল’ আকারে কন্সর্ট্যাক্ট করা হয়েছে। আসলে কি তিনি ন্যাশনালিস্ট কবি ছিলেন? ন্যাশনালিজম নিয়ে তার ভাবনাই বা কি ছিলো? তিনি কি এর পক্ষে ছিলেন, না কি সমালোচনা করে প্রত্যাখান করেছেন? প্রবন্ধের মধ্যে এ তিন প্রশ্নের বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা উপস্থাপন করাই আমার লক্ষ্য। এ আলোচনা কন্টেন্ট এ্যানালিসিসের ভিত্তিতে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথের প্রচলিত কনস্ট্রাকটেড ধারণাকে প্রশ্ন করার একটি প্রয়াস।

এডওয়ার্ড সাইদের কাজ ইতোমধ্যেই রবীন্দ্রনাথেরও ন্যাশনালিস্ট কবি ও ন্যাশনালিস্ট নেতার খেতাবগুলোকে বিলুপ্তির পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। বিস্তর লেখা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, তাঁকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে তাঁর ন্যাশনালিস্ট ইমেজ পরবর্তীসময়ে কন্সর্ট্যাক্ট করা হয়েছে। (Collins 2012 : 70) ফ্যাক্ট হলো, ১৯১২ সালেই রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যদিও ইতোপূর্বে তা এতোটা স্পষ্ট ছিল না। প্রশান্ত মহালনবিশ এক দীর্ঘ চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনোভাবেই ন্যাশনালিস্ট ছিলেন না, ন্যাশনালিজম কে সমর্থন করেন নি, এমনকি স্বদেশী আন্দোলনের সময় যখন তিনি নিজেও সেখানে কিছু দাবি নিয়ে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন তখনও তিনি তাঁর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি সকলের সামনেই প্রকাশ করেছেন। (Thompson 1991 : 12)

‘সারে যাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্থা হামারা’, (Nandy 2006 : 3500) যা মূলত ভারতের রণসঙ্গীত, এমনকি পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের সময় এই গান গেয়ে যুদ্ধের ময়দানে ভারতীয় সেনারা মনোবল মজবুত রাখে। মজার ব্যাপার হল, এই গানের রচয়িতা হলেন মুহাম্মাদ ইকবাল, পাকিস্তানের জাতীয় কবি

রবীন্দ্রনাথের লেখায় যে ‘Anti Nationalist, Anti-non-co-operator’ এবং গান্ধীর সমালোচনার বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে তা সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সেই আমলে যখন কলোনিয়াল শাসনের বিরুদ্ধে ন্যাশনালিস্ট আন্দোলন তুঙ্গে তখন ন্যাশনালিজমের বিরোধিতা করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। তার এই স্পষ্ট অবস্থানের কারণে তাকে অনেকেই কলোনিয়াল শাসকের সমর্থক বলে ভুল ব্যাখ্যা করে থাকেন। আমার মতে রবীন্দ্রনাথের উপর পশ্চিমা শ্রেণীবিন্যাসের ধারায় যে ‘উদার মানবাতাবাদী’ ও ‘আধুনিক সংস্কারবাদী’ বিশেষণ আরোপ করা হয়েছে তা বাস্তবে তার চিন্তাার জটিল ও সমালোচনামূলক দিকটি এড়িয়ে গিয়ে সাধারণীকরণ এর মাধ্যমেই করা হয়েছে। একে আমাদের প্রশ্ন করতেই হবে। যেমন ধরুন, ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের লন্ডন যাত্রা নিছক দুর্ঘটনা নয়। অনেকেও এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে থাকেন যে যেহেতু তিনি স্বদেশে নিজের স্বীকৃতি পাচ্ছিলেন না, তাই স্বীকৃতির আশায় বিলেত ভ্রমণে বের হন। এই ব্যাখ্যা অতি সাধারণীকরণ করে করা হয়েছে। (Collins 2012 : 70) এতে করে এই যাত্রায় তার যে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই যাত্রায় তার যে সংকল্প ছিল তার স্বরূপ পাওয়া যায় তাঁরই লেখা ইংরেজি প্রবন্ধসম্ভারে, এই সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এই প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে, দি মডার্ন রিভিউ এবং তার ম্যকমিলান থেকে প্রকাশিত বইগুলোতে। সেই লেখাগুলোতে আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তার এক ধারাবাহিক বিবরণ লক্ষ করি। ভারতীয় সভ্যতা, ন্যাশনালিজম ও ব্রিটিশ রাজের শাসন, উপনিষদ ও বেদ প্রভৃতি বিষয়ে তিনি সমালোচনামূলক আলাপের সূচনা করেছেন । এই লেখাগুলো আরও স্পষ্ট করে যে তিনি হেগেলের মতই বিশ্ব ইতিহাসকে দেখেছেন, ‘History as a Steady unfolding of an idea.’ (Collins 2012 : 70) হেগেলের সাথে তার ভাবনার পার্থক্য এখানেই যে তিনি তার ভাবনার কেন্দ্রে রেখেছেন ভারতবর্ষকে। তিনি যে মডার্ননিটির আলটারনেটিভ কনসেপ্ট দিয়েছেন সেখানে পশ্চিমের আইডিয়া, রাজনীতি এবং প্রযুক্তিকে ইতিহাসের বিবর্তনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নয় বরং কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবেই বিবেচনা করেছেন।

১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পরে রবীন্দ্রনাথ এশিয়ার হিরোতে পরিণত হন। তিনিই প্রথম এশিয়ান যিনি কলোনিয়াল ক্ষমতার স্বর্ণযুগে প্রথমবারের মতন নোবেল পুরষ্কার পান। এই অর্জন এশিয়ার রাজনীতিতে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল । তার প্রমাণ পাই রবীন্দ্রনাথের জাপান সফরের আমন্ত্রণ থেকে। ১৯১৬ সালে ইউরোপ যখন যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে রবীন্দ্রনাথ তখন জাপান সফরে যান। উদ্দেশ্য ছিল জাপানবাসিদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেয়া। উল্লেখ্য, সেই সময় জাপান ছিল এশিয়ার ব্রিটেন, তখন তার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বর্ণযুগ চলছে। রবীন্দ্রনাথকে পশ্চিম যেহেতু সম্মাননা দিয়েছে তাতে তো আর জাপান পিছিয়ে থাকতে পারে না। তাই জাপান সাম্রাজ্যের কালচারাল পলিটিক্স এর অংশ হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতন করেই স্বাগত জানান হয়েছিলো। তার সফরের খবর প্রধান প্রধান প্রত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয়। (Nandi 2006 : 3500) কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাপানে দেয়া রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি বক্তৃতার বিষয় ছিল ন্যাশনালিজম। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ বক্তব্য র‌্যাডিকেল মনে নাও হতে পারে, এমনকি তার কিছু যুক্তি বর্তমান সময়ে সমাদৃতও হয়েছে। কিন্তু ঐ সময়ে তা ছিল একেবারেই আনকোরা ও উত্তেজক। (Tagore 1930) এই বক্তৃতায় রীবন্দ্রনাথ শুধু ন্যাশনালিজম এর সমালোচনাই করেন নি, একই সাথে তা কেমন করে সামরিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিকাশে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে থাকে তারও স্বরূপ নিয়ে কথা বলেছিলেন। এই সমালোচনায় তিনি জাপানের ন্যাশনালিজমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নয়া রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ পরিণতি যে শুভ হবে না তা নিয়েও সতর্ক করেছিলেন। তার মতে জাপানের জন্য সব থেকে বিপদজনক বিষয় ছিল ‘Not the imitation of the outer features of the west but the acceptance of the motive force of the western nationalism as her own’. (Tagore 1930) রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা জাপানিদের যারপরনাই বিরক্ত ও রাগান্বিত করেছিলো। জাপানের পত্রিকাগুলো ঐ সময়ে কবির বক্তব্যকেও পরাজিত সভ্যতার এক হতাশ কবির বিলাপ হিসেবেই অবিহিত করেছিলো। জাপানের ইম্পেরিয়াল গৌরবের স্বর্ণযুগে রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য হাঁটুর ব্যথার মতন প্রতিভাত হয়েছিলো, যাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচা যায়। সেকারণেই যখন তিনি জাপান থেকে বিদায় নেন, তখন টোকিও বন্দরে তাঁকে বিদায় জানাতে শুধু একজন উপস্থিত ছিলেন। ইনিই তাঁকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। (Hay 1970) এই ঘটনা ছিল প্রথম দিনের সংবর্ধনার ঠিক বিপরীত।

পরবর্তী সময়ে, ১৯২৪ সালে যখন তিনি চীন ভ্রমণ করেছিলেন তখনও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিলো। ভারতবর্ষে ন্যাশনালিজমের যোগান নতুন ছিল না। অনেক ভারতীয় এলিট রবন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম সম্পর্কিত বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রত্যাশিত বলেই মনে করতেন। তিনি ইতোমধ্যে ভারতীয় ন্যাশনালিস্টদের আন্দোলনে ভায়লেন্স এর ব্যবহারের যুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর তিন রাজনৈতিক উপন্যাস, যথা : গোরা (১৯০৯), ঘরে বাইরে (১৯১৬) ও চার অধ্যায়-এ (১৯৩৪), তিনি ভারতের বিকাশমান কট্টর পুরুষতান্ত্রিক ন্যাশনালিজমের প্রতি সমালোচনামূলক আক্রমণ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। ঐ সময় রবীন্দ্রনাথ ভারতের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় কবি ছিলেন। তার লেখা শতশত দেশপ্রেমের গান স্বদেশী স্বাধীনতাকামীদের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল, তিনি নিজেও তাদের অনুপ্রেরণা ছিলেন। তাঁর এই গান গান্ধী থেকে শুরু করে সাধারণ জেল বন্দি বিপ্লবীর আত্মবিশ্বাসের খোরাক ছিল। ঐ অবস্থায় তার ন্যাশনালিজম বিরোধী অবস্থান তার জন্য অবশ্যই বিতর্কিত ও বিপদজনক ছিল। কিন্তু এর অর্থ কি এই যে তিনি দেশেকে ভালোবাসতেন না, স্বাধীনতা চাইতেন না। খানিকটা বিশ্লেষণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সাহায্য করবে।

গোরা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমের একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন তাঁর অংশের পৃথিবীতে ন্যাশনালিজম মানুষের আত্মস্বীকৃতির সীমানায় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এও দেখিয়েছেন যে ন্যাশনালিজম কোন ভাবেই ভারতীয় নয়, তাকে যতই ভারতের সাথে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করা হোক না কেন, বরং তা ভারতীয় সভ্যতার ধর্মীয় ও সংস্কৃতির বহুত্ববাদের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক

রবীন্দ্রনাথ দেশপ্রেম বোঝাতে তাঁর লেখায় ১২/১৫ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন, দেশপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, দেশভক্তি, দেশাভিমান, স্বদেশচেতনা। কিন্তু এর কোনটাই ন্যাশনালিজম শব্দের সমার্থক বা অনুবাদ ছিল না। তিনি যখন ন্যাশনালিজম বোঝাতেন তখন তিনি ন্যাশনালিজম ভিন্ন অন্য কোন শব্দ ব্যাবহার করতেন না। এভাবেই বাংলা লেখায় তিনি এর পার্থক্য করেছেন। (Nandi 2006 : 3501) তাই সেই আলোকে বলা যায় তিনি দেশপ্রেমিক ছিলেন তবে ন্যাশনালিস্ট ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, ভূমি আর সেই ভূমিতে বসবাসকারী মানুষের প্রেমের সাথে ন্যাশান স্টেট ভিত্তিক আইডিওলজি কেন্দ্রিক ন্যাশনালিজম এর কোন সম্পর্ক নেই। দেশপ্রেম হল মানুষের স্বাভাবিক ও স্বভাবজাত, সে তার আশ্রয়ের প্রতি ভালোবাসা, আর ন্যাশনালিজম হলো কন্সর্ট্যাকটেড ধারণা যা প্রথম ধারণার ধ্বংসাবশেষের উপর গড়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের ন্যাশান

ই পি থমসন ১৯৯১ সালে প্রকাশিত Tagore’s Nationalism শিরোনামের গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- রবীন্দ্রনাথ একজন কবি। এবং কবি মাত্রই সরাসরি সংজ্ঞায়নে বিশ্বাসী নন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কথা টেনে বলেছেন, ‘no man should let himself be at the mercy of his similies’, তবে ন্যাশনালিজম প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন করেছেন ও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘A nation is understood in the sense of a political and economic union of a people and in that aspect a whole population assumes when organized for a mechanical purpose’ (Thomson 1991:7)। এখানে রবীন্দ্রনাথের শব্দের কৌশলগত ব্যাবহার লক্ষণীয়। তার কাছে ন্যাশান এথনিক নয়, এমনকি সরাসরি ভাষা গোষ্ঠীর বা সংস্কৃতির সাথেও সম্পর্কিত নয়। তার মতে এগুলো হয়তো ন্যাশান গঠনে উপাদান হিসেবে কাজ করে তবে, ন্যাশান তার গঠন উপাদানের থেকে বেশি শক্তিশালী। তিনি মনে করতেন ন্যাশান ও ন্যাশনালিজম একেবারেই আধুনিক ও পশ্চিমা ধারণা যার একটি মেকানিক্যাল উদ্দেশ্য আছে, যার গঠনে মুল ভূমিকা রেখেছে ‘Instrumental Rationalit’ (Tagore 1930)। তার মতে ন্যাশানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে। তাই রবীন্দ্রনাথের ন্যাশান সম্পর্কিত সমালোচনা আদতে ন্যশান স্টেটের সমালোচনা। লক্ষণীয় বিষয় হল বিংশ শতাব্দীতে এসে ন্যাশান ও ন্যাশনালিজমের প্রকৃতি নির্ধারণের বিতর্কে রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে ন্যাশনালিজম বিষয়ে সবথেকে প্রভাবশালী লেখক ও গবেষক আরনেস্ট গেলনার ও এন্টোনি ডি স্মিথ এর আলোচনার সাথে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার আশ্চর্যরকম মিল রয়েছে। (Smith 1996:359  & Gelner 1964 : 174)

রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সাথে সবথেকে বেশি মিল লক্ষ করা যায় আরনেস্ট গেলনারের আর্গুমেন্টের। গেলনার রাজনীতির সাথে সম্পর্ক রেখে আইডিওলজিকাল ন্যাশনালিজমের বিশ্লেষণে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তার এই আলোচনার মূল কথা হলো ন্যাশনালিজম ন্যাশান তৈরি করে, কিন্তু পূর্ব থেকেই বর্তমান ন্যাশান ন্যাশনালিজমের জন্ম দেয় না। (Gelner 1964 : 174) রবীন্দ্রনাথ এই বিষয়ে লিখেছেন, যদিও তাদের মাঝের সময়ে ব্যবধান লক্ষণীয়। তার মতে বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই পশ্চিমা আধুনিকতাবাদের এই ধারণা বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। (Tagore 1930) রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন ওয়েস্টার্ন ন্যাশনালিজম পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসের এক বিশেষ ঐতিহাসিক কনটেকসটে এ প্রোথিত। এই ধারণা যেমন একমাত্র বৈশ্বিক মডেল নয় তেমনি তা পৃথিবীর মানুষের মুক্তির ও শান্তির একমাত্র পথও নয়। তার মতে ‘Nationalism leads to a hppeless moral blindness.’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘The idea of the social man is unselfishness wheres that of the nation is selfishness.’ (Tagore 1930)

এলিট সমাজের বিকাশে ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ, রামকৃষ্ণ মিশন প্রভৃতির সমাজ সংস্কারমূলক সংগঠনের সরাসরি ভূমিকা ছিল। আর এই আন্দোলনগুলো বেদ, উপনিষদ, ও গীতাকে ভারতীয় সভ্যতার ঐকতানের প্রামাণিক গ্রন্থ হিসেবেই বিবেচনা করত, তাই সেই মতামতের বাইরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষের ধারণা দেন তা ছিল প্রচলিত মতের সাথে সাংঘর্ষিক। রবীন্দ্রনাথ যে বিকল্প মতের প্রস্তাব করেন তা ছিল সাংস্কৃতিক। তাতে ভূমিকা ছিল অজ্ঞেয়বাদী সাধু, সুফি ও কবিদের যাদের অনেকের ধর্ম ও পরিচয়ের সীমানা নির্ধারিত ছিল না। যেমন কবির, নানক, বুল্লেহ শাহ, কিংবা লালন

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে ন্যাশনালিজম

ন্যাশনালিজম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার খানিকটা আভাস পাওয়া যায় তার লেখা চিঠি এবং বিভিন্ন বক্তৃতায়। তবে তার ¯পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় তার সাহিত্যে বিশেষ করে তার লেখা উপন্যাসে। তার তিনটি রাজনৈতিক উপন্যাস যথা : গোরা, ঘরে বাইরে, ও চার অধ্যায়। এই উপন্যাসগুলো বিশেষ রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এখানে ন্যাশনালিজম নিয়ে লেখকের সন্দেহ- গল্পের কাহিনির সংলাপে রূপ নিয়েছে। গোরা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমের একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন তাঁর অংশের পৃথিবীতে ন্যাশনালিজম মানুষের আত্মস্বীকৃতির সীমানায় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এও দেখিয়েছেন যে ন্যাশনালিজম কোন ভাবেই ভারতীয় নয়, তাকে যতই ভারতের সাথে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করা হোক না কেন, বরং তা ভারতীয় সভ্যতার ধর্মীয় ও সংস্কৃতির বহুত্ববাদের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। ঘরে বাইরে উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ন্যাশনালিজম সমাজ ও সম্প্রদায়ের জীবনকে অস্থির ও বিপদজনক করে এথনিক ভায়ল্যান্স এর বল্গাহীন দানব ছেড়ে দেয়। ভারতীয় সভ্যতায় সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের মাধ্যমে যে-ঘরের (আশ্রয় অর্থে) ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকে ন্যাশনালিজম কেমন করে ধ্বংস করে দেয়। অপরদিকে চার অধ্যায় উপন্যাসে তিনি প্রথম বারের মতন উপলব্ধি করেন যাকে এক কথায় বলা যায় ‘The roots of industrialised assembly line violence as a specilasation of modern times.’ (Nandy 2006: 3501) আমরা এর দার্শনিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে পারি হানা আরেন্ট, রবার্ট যে লিফটন এবং জারগন বেমন এর আলোচনায়। এঁরা দেখিয়েছেন কেমন করে বর্তমান সময়ে এসে ন্যাশনালিজমের সাথে সম্পর্কিত সহিংসতার ধরন ও প্রকৃতির পরিবর্তন হয়েছে, ও তা মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। (Arendt:1963; Lifton: 1986; Bauman: 1989) এই তিনটি উপন্যাসকে আবার রবীন্দ্রনাথের বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। এখানে তিনি যে ন্যাশনালিজমের প্রতি আক্রমণাত্মক ও সমালোচনামূলক আলাপের সূচনা করেছেন তা আসলে বাস্তব জীবনে তাঁর এবং তাঁর বন্ধু ব্রাহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের (১৮৬১-১৯০৭) মধ্যকার বিতর্কের সংলাপ রূপ মাত্র। শ্রী উপাধ্যায় ছিলেন ক্যাথোলিক ধর্মতত্ত্ববিদ ও বেদান্তবিদ, যিনি প্রথম আধুনিক ভারতীয় হিন্দু ন্যাশনালিস্ট একটিভিস্ট বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃত। তিনি আগ্রাসনমূলক হিন্দু ন্যাশনালিজম তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিতর্ক শুধু উপাধ্যায়ের সাথেই ছিল না বরং তা ছিল, বিবেকানন্দ ও রূডইয়ার্ড কিপিং এর সাথেও। রবীন্দ্রনাথ তার উপন্যাসের নায়ক ও খলনায়কদের মধ্যে উপাধ্যায়ের ভয়, শঙ্কা, আশা, লক্ষ্য প্রভৃতির মানবীয় অনুভূতি স্পষ্ট করে তুলেছেন এবং সেই অনুভ‚তির যারা দাসত্ব করছেন ও বিরোধিতা করছেন তাদের সেই কথোপকথনের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। (Tagore 1930: 64; Nandy 1994)

ভারতীয় সভ্যতার ঐকতানের উৎস

রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম সম্পর্কিত সমালোচনামূলক ভাবনার সাথে সম্পর্ক রয়েছে তার ভারতীয় সভ্যতার ঐক্যবদ্ধ সম্পর্কিত ধারণার। তার সময়ে অনেকেই, এমনকি আমাদের সময়ের অনেকেই, বিশ্বাস করেন যে বেদ, উপনিষদ এবং গীতা প্রামাণিক গ্রন্থ হিসেবে ভারতীয় সভ্যতার ঐকতান প্রতিষ্ঠা করে। রাজা রামমোহন রায়, বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ প্রমুখ উনিশ শতকের এই গুরূত্বপূর্ণ চিন্তকরা এই গ্রন্থগুলোকে ভারতীয় সভ্যতার ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক বলেই মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথ এই ধারণা অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ভারতের সভ্যতার ঐকতানের ভিত্তি হিসেবে গুরূত্ব আরোপ করেছেন মধ্যযুগের কবি, সুফি, অজ্ঞেয়বাদী, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুদের কাজ, চিন্তা ও অভ্যাসের উপর। তার মতে ভারতীয় সভ্যতার ঐকতানের মূলে ছিলেন এঁরা। (Tegore 1930 : 64) আর সেকারণেই রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন ভারতবর্ষের মতন এমন বহুসংস্কৃতির দেশে ন্যাশনালিজম এর আমদানি করা সুইজারল্যান্ড এর নৌবাহিনী গঠনের মতন অবাস্তব ভাবনা। (Tegore 1930 : 64) সেই সময়ের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের জন্য এই অবস্থান নেয়া ছিল বিপদজনক। কেননা তাঁর পরিবার সেই সময়ের হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন । তিনি নিজে ব্রাহ্ম ছিলেন। ব্রাহ্মরা বেদ ও উপনিষদকে বিশুদ্ধ, পবিত্র ও অনুশাসনিক গ্রন্থ হিসেবেই গ্রহণ করেছিল। এগুলোকে আকর গ্রন্থ ধরে সমাজ সংস্কারের প্রয়াসও চালায় । তারা সতী ও অচ্ছুৎ প্রথার বিরুদ্ধে, কন্যা শিশুবিবাহ বন্ধে ও বিধবাবিবাহ প্রবর্তনে এই গ্রন্থগুলোকে প্রামাণিক হিসেবে উপস্থাপন করেন, ও সমাজ সংস্কারে এর ব্যাবহার করেন। এই অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পারিবারিক অবস্থানের বিরুদ্ধে। একই সাথে তিনি তৎকালীন ভারতীয় নব্য আধুনিক এলিট সমাজের অবস্থানের সাথে চরমভাবে ঋণাত্মক মতামত পোষণ ও প্রকাশ্য তা প্রচার করেন। উল্লেখ্য, এই এলিট সমাজের বিকাশে ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ, রামকৃষ্ণ মিশন প্রভৃতির সমাজ সংস্কারমূলক সংগঠনের সরাসরি ভূমিকা ছিল। আর এই আন্দোলনগুলো বেদ, উপনিষদ, ও গীতাকে ভারতীয় সভ্যতার ঐকতানের প্রামাণিক গ্রন্থ হিসেবেই বিবেচনা করত, তাই সেই মতামতের বাইরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষের ধারণা দেন তা ছিল প্রচলিত মতের সাথে সাংঘর্ষিক। রবীন্দ্রনাথ যে বিকল্প মতের প্রস্তাব করেন তা ছিল সাংস্কৃতিক। তাতে ভূমিকা ছিল অজ্ঞেয়বাদী সাধু, সুফি ও কবিদের যাদের অনেকের ধর্ম ও পরিচয়ের সীমানা নির্ধারিত ছিল না। যেমন কবির, নানক, বুল্লেহ শাহ, কিংবা লালন। সাধারণ মানুষ এদের সকলকেই নিজেদের বলে দাবি করতেন। (Nandi 2006 : 3503) ভারতকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করার কারণে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও ভারতীয় এই দুই ধারণার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়। একই সাথে ন্যাশান স্টেটের ধারণার প্রতি কবির এক ধরনের তীর্যক সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ পায়। উল্লেখ্য ইতোমধ্যে কলোনিয়াল ভারত ন্যাশান স্টেট গঠনের জন্য নিজেদের তীব্র আকাক্সক্ষার প্রকাশ করেছে। তবে এই বিশ্লেষণের সাথে দ্বিমত করেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তিনি মনে করেন রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্র কাঠামোর বিরোধী ছিলেন না । (Chatterji 2003 : 7-25) হয়তো রবীন্দ্রনাথ তা ছিলেন না, তবে তাঁর রাষ্ট্র ও ন্যাশনালিজম স¤পর্কে মতামত গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি রাষ্ট্র ধারণার বিরোধিতা না করলেও ন্যাশান স্টেট ধারণার সমালোচনা করেন। (Nandi 2006 : 3503) কেননা ন্যাশন স্টেট ন্যাশনালিজমের ধারণার থেকে আলাদা হতে পারে না কারণ ন্যাশান স্টেটের কাঠামো তৈরিতে ন্যাশনালিজম কংক্রিটের ভূমিকা পালন করে থাকে। (Gelner 1964:174)

রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম  ন্যাশনালিজম

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিকল্প মডেলে দেশপ্রেমের ধারণার কথা বলেছেন। তার মতে দেশপ্রেম হলো প্রাকৃতিক, মতাদর্শগত নয়, এবং ন্যাশনালিজম থেকে আলাদা। দেশপ্রেমও ন্যাশনালিজম দুটো ভিন্নমাত্রার বিষয়। অতি সাধারণীকরণের ফলে যাকে আমরা এককরে ফেলি। সেইক্ষেত্রে ন্যাশনালিজম শব্দের অবর্তমানে রবীন্দ্রনাথের কাছে সবথেকে গ্রহণযোগ্য শব্দ হল দেশপ্রেম। দেশপ্রেম হলো মানুষের আবেগের অবস্থান। মানুষের নাড়ির টান। তা নির্দিষ্ট মানচিত্রের সীমার মতাদর্শিক ধারণার সাথে সম্পৃক্ত নয়। এমনকি এই সম্পৃক্ততা মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বর্তমান আছে তাই তা মানুষের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক। অন্যদিকে ন্যাশনালিজম হলো মতাদর্শগত যা সচেতনভাবে কন্সর্ট্যাক্ট করা হয়েছে। তা একি সাথে ইগো ডিফেন্সিভ, স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা ও নিজের সীমানার বাইরের মানুষের প্রতি বিরূপ ও শত্রুভাবাপন্ন সঙ্কীর্ণধারণা সচেতনভাবেই প্রচার করে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের এই ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করা যা মূলত territoriality of a political community কে ইউরোপিয়ান ধরনের ন্যাশনালিজমের কবল থেকে রক্ষা করবে। (Nandi 2006 : 3503) কেননা তিনি ইতোমধ্যেই জেনেছিলেন ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে ইউরোপিয়ান ন্যাশনালিজম কতোটা বিধ্বংসী ছিল এবং কেমন করে তা ইউরোপ ও বিশ্বকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই শঙ্কার কথা আমরা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর ভেতরকার বিতর্কেও পেয়ে থাকি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের দুজনের মধ্যের বন্ধন ছিল গভীর। রবীন্দ্রনাথই প্রথম গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ ও গান্ধী তাকে ‘গুরুদেব’ বলে সম্বোধন করেন। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবেই গান্ধী মনে করতেন ভারতীয় সভ্যতার ঐকতানের উৎস ক্লাসিক্যাল ইন্ডিয়া নয় বরং তা মধ্যযুগের যৌথ সাংস্কৃতিক সম্মীলনের ফলাফল

এটা ধারাবাহিকভাবে অতি নির্যাতনের দোহাই দিয়ে ভয়ের আবহ তৈরি করে রাখে। এতো সবকিছুর পেছনে এর মূল লক্ষ্য হল প্রযুক্তিগত পুঁজিবাদ নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন এর মাধ্যমে পুঁজিবাদকে জীবিত রাখা। এই পরিপেক্ষিতে ন্যাশনালিজম কাল্পনিক ঐক্য গঠনের টুলস হিসেবেই কাজ করে। ন্যাশনালিজম যে কাল্পনিক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করে তাকে হ্যানা আরেনট ‘সুডকমিউনিটি’ এবং বেনেডিক এনডারসন ‘ইম্যাজিন কমিউনিটি’ বলে অবিহিত করেছেন। (Anderson 1991; Arendt : 1963) অপর দিকে দেশ প্রেম মানচিত্রের ঐক্য থেকে কমিউনিটি ধারণার উপর বেশি জোর দেয়। তাদের স্বকীয়তা স্বীকার করে নেয় এবং গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ন্যাশনালিজম একটি আবহ তৈরি করে যে পৃথিবী জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত এবং সকল ক্ষমতার কেন্দ্রে ন্যাশানস্টেট এর অবস্থান। আর এমন এক পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য এর রীতিনীতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে, দক্ষতাও থাকতে হবে, কিছুক্ষেত্রে ন্যাশন স্টেটের সংস্কৃতিকে মেনে নেয়া অতি জরুরি। (Anderson  1991) এভাবে ন্যাশনালিজম ব্যক্তির উপর এক ধরনের রাষ্ট্রবাদ চাপিয়ে দিয়ে থাকে। (Arendt : 1963) দেশপ্রেম এমন কোন দাবি করে না,বা তা কোন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেন্দ্র করে ও বিকশিত হয় না। যখন ন্যাশনালিজম রাষ্ট্রের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করে থাকে তখন দেশপ্রেম পরিবার, সমাজ বা দেশে ভেতরে ভিন্নভিন্ন স্তরে ভিন্নভিন্ন আনুগত্য এর সুযোগ দিয়ে থাকে। ন্যাশনালিজমের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক যাকে বলা হয় উনিফরমা লয়ালিটি। (Arendt : 1963) রাষ্ট্র ও দেশপ্রেমের মধ্যে সম্পর্ক খোলামেলা ও দরকষাকষির। এর অর্থ এই নয় যে দেশপ্রেম মানুষকে একত্রিত করে না। বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মতামতের ভিত্তিতে তা মানুষকে একত্রিত করে একটি সাধারণ লক্ষ্যের জন্য, কিন্তু ন্যাশনালিজম উনিফরম ঐক্য ও আনুগত্য এর বাইরে কোন মতামতের সুযোগ সৃষ্টির পক্ষে নয়। রবীন্দ্রনাথের এই ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করা যা মূলত territoriality of a political community কে ইউরোপিয়ান ধরনের ন্যাশনালিজমের কবল থেকে রক্ষা করবে। (Nandi 2006 : 3503) কেননা তিনি ইতোমধ্যেই জেনেছিলেন ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে ইউরোপিয়ান ন্যাশনালিজম কতোটা বিধ্বংসী ছিল এবং কেমন করে তা ইউরোপ ও বিশ্বকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই শঙ্কার কথা আমরা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর ভেতরকার বিতর্কেও পেয়ে থাকি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের দুজনের মধ্যের বন্ধন ছিল গভীর। রবীন্দ্রনাথই প্রথম গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ ও গান্ধী তাকে ‘গুরুদেব’ বলে সম্বোধন করেন। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবেই গান্ধী মনে করতেন ভারতীয় সভ্যতার ঐকতানের উৎস ক্লাসিক্যাল ইন্ডিয়া নয় বরং তা মধ্যযুগের যৌথ সাংস্কৃতিক সম্মীলনের ফলাফল। (Nandi 2006 : 3503)

এ প্রবন্ধজুড়ে আমার আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজম নিয়ে কী ভাবতেন। তিনি তাঁর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন না কি ন্যাশনালিজমকে সমালোচনা করে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। উপরের আলোচনার সাধারণ সারমর্ম হলো, রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমকে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বিপদজনক দান হিশেবে দেখেছেন। তাঁকে যারা ভারতীয় সভ্যতার শত্রু হিশেবে দেখেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে- এ আত্তীকরণের ফল যে শুভ হবে না, তা তাঁর লেখায়-বক্তৃতায় বারবার সতর্ক করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যখন এই অবস্থান নিয়েছেন, ভারতবর্ষে তখন ন্যাশনালিস্ট আন্দোলনের স্বর্ণযুগ, এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা একটি ন্যাশানস্টেট গঠনের জন্য জোরেশারেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের এমন অবস্থান তাকে বহু সমালোচনার মুখোমুখি করেছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেশপ্রেমের ভিত্তিতে কমিউনিটির স্বকীয়তার জোর দিয়ে যে বিকল্প ব্যবস্থার সুপারিশ তিনি করেছেন, তা রাজনীতিবিদদের নিকটে গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতে বিস্তর আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে। বর্তমান পোস্ট-ন্যাশনালিস্ট যুগে মানুষের মুক্তির যে নয়া আন্দোলন শুরু হয়েছে তাতে জাতিরাষ্ট্রের সংকীর্ণ ধারাণার বিরুদ্ধে তাঁর ধারণা অনেক বেশি মানবিক। তিনি রাষ্ট্রবাদ নয়, মুক্তির পক্ষে ছিলেন।

SHARE