Home শীর্ষ সংবাদ শরিক জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে ত্রিমুখী চাপে বিএনপি

শরিক জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে ত্রিমুখী চাপে বিএনপি

69
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৮ আগস্ট) :: জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতকে নিয়ে ত্রিমুখী চাপে পড়েছে বিএনপি। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জামায়াত মেয়র প্রার্থী দাঁড় করানোয় দলটির সঙ্গ ছাড়ার দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে বিএনপির ভেতর।

বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী, জোটের শরিক অন্যান্য দল এবং ‘বৃহৎ ঐক্যজোট’ গড়তে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াতসঙ্গ ত্যাগের ব্যাপারে সহমত প্রকাশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে দলের ভেতরে-বাইরে এবং দেশি-বিদেশি চাপের মুখে রয়েছে বিএনপি। এখন খোদ বিএনপির হাইকমান্ডও ক্ষুব্ধ জামায়াতের ওপর।

এ পরিস্থিতিতে তারা জামায়াতকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিস্থিতির নিরিখে জামায়াতের সুরও কিছুটা নরম হয়ে আসছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত দল জামায়াতের কারণেই বারবার বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েও তাতে সফল হওয়া যাচ্ছে না।

জামায়াতের কারণেই প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক দল ও শক্তি বিএনপিকে সমর্থন দিতে অনীহা জানিয়ে আসছে। তাই জামায়াত এখন জোট ছেড়ে চলে যেতে চাইলে তাদের ধরে রাখতে চাইবে না বলেই মতামত দিয়েছেন বিএনপি নেতাদের।

এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু অন্যতম।

তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ একটি বড় অংশ মনে করে, জামায়াতকে জোট থেকে সরিয়ে দিলে লাভ হবে সরকারের। কারণ সারাদেশে এই দলটির নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। এসব ভোট তখন আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যাবে।

এই চিন্তাধারার সঙ্গে রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও দলের অধিকাংশ স্থায়ী কমিটির নেতা।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বুধবার বলেন, জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের কোনো সমস্যা নেই। এটা মিডিয়ার সৃষ্টি। এত বড় দলে নেতাকর্মীদের নানামত থাকতেই পারে। এখানে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না।

তবে জামায়াত প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেছেন, জামায়াত নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করে। তাদের কাছে দেশ ও জোট মুখ্য নয়। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এই দলটি নির্বাচনে জয়লাভ নয়, নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে সংকীর্ণ রাজনীতি করে। সেই নির্বাচন বিতর্কিত হলেও তারা অংশগ্রহণ করে।

২০০৮ সালে বিএনপি অপ্রস্তুত থাকা অবস্থায় নির্বাচনে যেতে বাধ্য করে এ দলটি। বিএনপিকে বাদ দিয়ে হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করত, যদি তাদের নিবন্ধন থাকত। তাই জামায়াতকে বিশ্বাস করার কিছু নেই।

বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে আদালত থেকে স্বীকৃত জামায়াতকে নিয়ে শুরু থেকেই বেকায়দায় বিএনপি। দেশ-বিদেশের সুশীল সমাজ, অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের আহ্বানে আগে তেমন সাড়া না দিলেও এখন নড়েচড়ে বসেছে দলটি। রাজনীতিতে বিশ্বস্ততা ও আস্থার সংকটে থাকা জামায়াতকে নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।

জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার ২০ দলীয় জোটের এক বৈঠকে নতুন করে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের ক্ষোভ ও অস্বস্তি প্রকাশ পায়। সাম্প্রতিক সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত বিবৃতি দেওয়ায় ক্ষোভ ঝাড়েন জোটের নেতারা।

এ সময়ে বৈঠকে উপস্থিত জামায়াত প্রতিনিধিকে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি যেন তাদের দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের এসব ক্ষোভের কথা জানিয়ে দেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, তিনি সবসময় আপ্রাণ চেষ্টা করছেন জোটের ঐক্য ধরে রাখতে। আর তারা তাকে জড়িয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান ওই বৈঠকে উপস্থিত জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুল হালিম। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে তিনি বললেন, তাদের বিবৃতিকে যেভাবে দেখা হচ্ছে, আসলে তা ঠিক নয়।

জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের মেরুকরণ হিসেবে সিলেট সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছেন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা জানান, অন্যান্য সিটিতে জামায়াত প্রার্থী না দিলেও জোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিল না। এ ছাড়া বিগত দিনের উপজেলা, পৌর, ইউপি নির্বাচনেও জামায়াত একই কৌশল অবলম্বন করে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।

বিএনপি সূত্র জানায়, সিলেট সিটিতে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য এককভাবে প্রার্থী দেয় জামায়াত। বিএনপির নীতিনির্ধারণী নেতাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে জামায়াত তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।

বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, জামায়াতের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে অসন্তুষ্ট বিএনপির হাইকমান্ডও। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দলটির জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সিনিয়র নেতাদের বৈঠকেও।

গত শুক্রবারের ওই বৈঠকে রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, সিলেটে মেয়র পদে জামায়াতের প্রার্থী থাকার পরও বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এই নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী দিয়ে বিএনপিকে ‘শিক্ষা’ দিতে চেয়েছিল। তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল, ভোটের রাজনীতিতে তাদের ‘অপরিহার্যতা’।

তবে উল্টো এই নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে, জামায়াতকেও ছাড়াই বিএনপি জিততে সক্ষম। প্রমাণিত হয়েছে ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত বিএনপির জন্য কোনো ফ্যাক্টর নয়। ফলে আগামী নির্বাচনের আগে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ডাকে জাতীয় ঐক্য গঠন করতে জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দেওয়াই দরকার।

ওই বৈঠকে জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে দুলু বলেন, ড. কামাল হোসেন, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ আরও অনেকে জামায়াতকে বাদ দেওয়া সাপেক্ষে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্য করতে রাজি আছেন। ফলে এখন বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে, জামায়াতকে বাদ দিয়ে সরকারের বাইরে থাকা ডান-বাম সব মত ও পথের দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য করা।

সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সভাপতি রাহমাতুল্লাহ পলাশ বলেছেন, জামায়াত শুধু সিলেট সিটিতেই নয়; দেশের প্রত্যেক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে অসহযোগিতা করেছে। তাদের কোনো ভোট বিএনপির প্রার্থী পাননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সরকারি দলকে প্রকাশ্যে সহযোগিতা করেছে।

সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াত বিএনপিকে সহযোগিতা না করে উল্টো নিজেরা প্রার্থী দিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার কারণে তা জোটের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না।

বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতা জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াত প্রকাশ্যে দলের কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। সেখানে সিলেটে প্রকাশ্যে তাদের প্রার্থী সব দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। গাড়িবহর নিয়ে শহরের সব জায়গায় নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন, যা বিএনপির প্রার্থীও করতে পারেননি। অথচ জামায়াতের প্রার্থীকে পুলিশ কোনো বাধাও দেয়নি।

এ বিষয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম  বলেন, মেয়র প্রার্থী নিয়ে জামায়াতের কর্মকাণ্ডে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। জামায়াতের ব্যাপারে একটি ফয়সালা হওয়া উচিত।

আগামী দিনগুলোতে আন্দোলন আর একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে টার্গেট করে বিএনপির জাতীয় ঐক্য গড়ার পথে প্রধান বাধা জামায়াত। স্বাধীনতাবিরোধী এ দলটিকে রেখে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়তে জোরালো সাড়া মিলছে না জোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে।

এর মধ্যে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না রয়েছেন। তারা জামায়াতকে বাদ দিতে বিএনপিকে বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিয়ে এলেও তাতে সাড়া মেলেনি।

তবে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জামায়াতের নিবন্ধন না থাকায় এমনিতেই আগামী নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারছে না। এ ছাড়া জামায়াতকে ছেড়ে দিলে এই সুযোগটা ক্ষমতাসীন দল কাজে লাগাতে চাইবে। এসব কারণে এই দলটিকে জোট থেকে না সরিয়ে নিষ্ফ্ক্রিয় রাখার পক্ষে মত দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সম্পাদক প্রিন্সিপাল ইকবাল সিদ্দিকী বলেছেন, বিএনপি দেশের প্রধান বিরোধী দল। তাই তারা চাইবেই তাদের ছাতার নিচে সব দল ও মত আসুক। কিন্তু বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কখনই জামায়াতকে নিয়ে এক ছাতার নিচে যাবেন না বলে আগেই জানিয়ে রেখেছেন।

SHARE