Home কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের ঢল

বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের ঢল

163
SHARE

আব্দুল কুদ্দুস রানা(২৩ আগস্ট) :: বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এখন লাখো পর্যটকে ভরপুর। উত্তাল সমুদ্রে গোসল, বালুচরে দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি তাঁরা ছুটে বেড়াচ্ছেন দরিয়ানগর পর্যটনপল্লি, হিমছড়ি ঝরনা, পাথুরে সৈকত ইনানী, টেকনাফ সৈকত, মাথিন কূপ, জালিয়ারদিয়া, মিয়ানমার সীমান্ত। কেউ যাচ্ছেন রামুর বৌদ্ধপল্লি ও চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক দেখতে। কিন্তু বৈরী পরিবেশের কারণে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় লোকজন প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন ও মহেশখালীর সোনাদিয়া ও আদিনাথ মন্দির দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ নৌচলাচল বন্ধ আছে।

হোটেল মালিকেরা জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সৈকতে সমবেত হয়েছেন লাখো পর্যটক। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় আরও ৫০ হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে পাঁচ কিলোমিটারের বিশাল সৈকত পর্যটকে ভরে গেছে। আগামী শনিবার পর্যন্ত অন্তত পাঁচ লাখ পর্যটক সৈকতে ভ্রমণে থাকবেন বলে আশা হোটেলমালিকদের।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, হাজার হাজার পর্যটক কোমরসমান পানিতে নেমে গোসল করছেন। উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের ধাক্কায় কোনো পর্যটক যেন সমুদ্রে ভেসে না যান, সে জন্য লাইফগার্ডের কর্মী, ডুবুরি ও ট্যুরিস্ট পুলিশ লোকজনকে সতর্ক করছেন। ভাটার সময় গোসলে নামলে স্রোতের টানে লোকজন গভীর সাগরে ভেসে যেতে পারে, সে ব্যাপারে লোকজনকে সতর্ক করতে বালুচরে উড়ানো হচ্ছে লাল পতাকা। লাল পতাকা উড়তে দেখা গেলে গোসলে নামা বিপদ। আর জোয়ারের সময় গোসল নিরাপদ। এ সময় উড়ানো হয় সবুজ পতাকা।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে রাব্বী প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের কয়েক দিনের ছুটিতে পাঁচ লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটবে। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য ১২২ জন ট্যুরিস্ট পুলিশসহ আরও কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কাজ করছেন।

বিকেলে সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে কথা হয় রাজধানীর সূত্রাপুর থেকে আসা গৃহবধূ সালমা আখতারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে একটু নিরিবিলি পরিবেশে থাকার জন্য কক্সবাজার সৈকতে ছুটে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখছি লাখো মানুষে ভরপুর সৈকত। উত্তাল সমুদ্রের গর্জন মানুষের কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও ভালো লাগছে অন্য রকম পরিবেশ দেখে।’

সমুদ্রসৈকতে হাজারো পর্যটক। ছবি: প্রথম আলোকুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আসা স্কুলশিক্ষক শফিকুর রহমান বলেন, বর্ষায় সমুদ্রের রূপ অন্য রকম। উত্তাল সমুদ্রের একেকটা ঢেউ এবং সমুদ্রের বিশালতা মানুষের মনকে জাগিয়ে তুলছে। মানুষকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলতে সাহস জোগাচ্ছে, উৎসাহিত করে। কিন্তু নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকায় প্রবালদ্বীপ ভ্রমণে যাওয়া সম্ভব হয়নি বলে ছেলেমেয়েদের মন একটু খারাপ।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকা থেকে আসা কলেজছাত্রী বিলকিস আকতার বলেন, পাঁচ বছর আগে এসে যে সমুদ্রসৈকত দেখে গিয়েছিলাম, এখনো তা-ই রয়ে গেছে। বিপুল পর্যটকের নিরাপদ গোসলের নেটিং ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। সমুদ্রে গোসলে নেমে নিখোঁজ লোকজনকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য নেই সরকারি কোনো ডুবুরি ও উদ্ধারযান। এটা ভ্রমণে আসা লোকজনের জন্য আতঙ্কের কারণ।

হোটেলমালিকেরা বলেন, ঈদকে সামনে রেখে টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে সৈকত ভ্রমণে আসবেন পাঁচ লাখের বেশি পর্যটক। এ সময় হোটেল, মোটেল, কটেজ ও গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁর ব্যবসা হবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বর্ষা মৌসুমের ভ্রমণকে কাজে লাগানোর জন্য ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেলমালিকেরা ৪০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কক্ষ ভাড়ায় বিশেষ রেয়াত দিচ্ছেন।

সমুদ্রসৈকতের কলাতলী এলাকার এক বর্গ কিলোমিটার এলাকায় তারকা মানের আটটিসহ হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজ আছে প্রায় ৪৫০টি। এসব হোটেলে দৈনিক দেড় লাখ মানুষের রাত যাপনের ব্যবস্থা আছে।

এর মধ্যে কটেজ আছে ১৬৫টি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন কটেজে থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন। কারণ কটেজে একটি কক্ষ ৪০০ থেকে ২০০০ টাকায় পাওয়া যায়। কম খরচের খাওয়া এবং বিনোদনের নানা সুযোগও কক্ষগুলোতে রাখা হয়। নিরাপত্তার জন্য কটেজগুলোকে আছে সিসিটিভি।

কক্সবাজার কটেজ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি কাজী রাসেল আহম্মেদ বলেন, ঈদ উপলক্ষে তাঁরা (কটেজ মালিকেরা) সর্বোচ্চ (৬০%) রেয়াত দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে কটেজগুলোর ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলোও তাঁরা সংরক্ষিত রেখেছেন বিপদাপন্ন ট্যুরিস্টদের জন্য।

সমুদ্রে চলছে স্নান। ছবি: প্রথম আলোসৈকতের সঙ্গে লাগোয়া পাঁচতারকা হোটেল সি-গাল। এই হোটেলে কক্ষ আছে ১৭৯টি। অতিথিদের জন্য তারা ছাড় দিয়েছে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ। কিন্তু আজ এই হোটেলে কোনো কক্ষ খালি নেই।

পাশের তারকা হোটেল দ্য কক্স টু ডে, সায়মান বিচ রিসোর্ট, ওশান প্যারাডাইস, লং বিচ হোটেল, হোটেল সি প্যালেস, হোটেল ওয়েস্টার্ণ, প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতের পরিবেশবান্ধব ইকো টুরিজমপল্লি মারমেইড বিচ রিসোর্টসহ চার শতাধিক হোটেল মোটেলের কোনো কক্ষ খালি নেই।

কক্সবাজারের কয়েকটি হোটেলমালিকদের সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ফেডারেশন অব কক্সবাজার ট্যুরিজম সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুর রহমান বলেন, ‘ঈদের দ্বিতীয় দিন হোটেলগুলোতে অবস্থান করছেন ১ লাখ ২০ হাজারের মতো মানুষ। কাল-পরশু দুই দিনে আসবে আরও ৩ লাখ মানুষ। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে কিছু হোটেল মালিক অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাচ্ছি। এ ব্যাপারে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

টুয়াক (ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন, বিপুলসংখ্যক পর্যটক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সন্ধ্যার পর শহরের অলিগলি অন্ধকারে ডুবে থাকে। মেরিন ড্রাইভ সড়ক অরক্ষিত। সৈকতের অরক্ষিত ৯০ কিলোমিটার সৈকতে পর্যটকদের দেখভালের কেউ নেই। সেখানে গোসলে নেমে কোনো পর্যটক বিপদে পড়লে উদ্ধারের কেউ নেই।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, লাখো পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর। যে কারণে এ পর্যন্ত কোনো ঘটনা ঘটেনি। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ দায়িত্বপালন করছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্র জানায়, জোয়ার-ভাটা দেখে গোসলে নামার জন্য পর্যটকদের সতর্ক করে প্রতিদিন প্রচারণা চালানো হলেও কেউ তা আমলে নিচ্ছেন না। ভাটার সময়ও অনেকে উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছেন। অনেকে বিপদে পড়ছেন। গত ২০ দিনে সৈকতের গোসলে নেমে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন বিদেশি, তিনি জাতিসংঘের কর্মকর্তা। অপর দুজন রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

সৈকতের পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইয়াছির লাইফগার্ড স্টেশনের পরিচালক ও নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ডুবুরি মোস্তফা কামাল বলেন, সৈকতে এখন উত্তর-দক্ষিণ লম্বা কয়েকটি গুপ্ত খালের সৃষ্টি হয়েছে। ভাটার স্রোতে ভেসে গিয়ে কেউ খালে আটকা পড়লে উদ্ধার করা কঠিন।

সৈকতে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেলিম শেখ বলেন, ঈদের দিন থেকে সৈকতে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয়। হোটেল মোটেলগুলোতে অতিরিক্ত কক্ষ ভাড়া ও রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারের অতিরিক্ত দাম হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা-ও দেখছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

প্রথম আলো

SHARE