Home শীর্ষ সংবাদ জাতিসংঘে কি বলে এলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল

জাতিসংঘে কি বলে এলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল

159
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(১৫ সেপ্টেম্বর) :: একাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণ মূলক করতে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিক চেষ্টার অংশ হিসেবেই জাতিসংঘে গেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে এবারের চেষ্টাটি একটু ভিন্ন ধরনের।

গত বৃহস্পতিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকালে জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির মহাসচিব চারটি বিষয়ে জানিয়েছেন।

এগুলো হলো, এর মধ্যে রয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যু; খালেদা জিয়ার কারাবরণ ও তার বর্তমান অবস্থা; দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অ্যাক্টিভিটি, শীর্ষ কয়েকজন নেতার প্রোফাইল এবং ২০১৪ সালে তারানকোর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়বস্তু। বিএনপি মহাসচিবের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে  এসব তথ্য জানা গেছে।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা করেছেন। তিনি ফিরে এলে নিশ্চয়ই বিস্তারিত জানাবেন।’

এর আগে শনিবার ফরিদপুরে এক অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাদের ঢাকাস্থ অফিসের মাধ্যমে দাওয়াত পাঠিয়েছেন। আর এ দাওয়াত পেয়েই আমাদের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতিসংঘে গিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।’

উল্লেখ্য, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ৪০ মিনিটে অনেকটাই নীরবে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল। ফিরবেন আগামী দুই-একদিনের মধ্যেই। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মির্জা ফখরুলের সঙ্গে  আরও ছিলেন বিএনপির দুই নেতা তাবিথ আউয়াল ও লন্ডন প্রবাসী হুমায়ুন কবির। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। তবে, তিনি যাননি ব্যক্তিগত কারণে।

সূত্রের দাবি, জাতিসংঘের বৈঠকটি আয়োজন করা হয়েছে দেশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্যোগে, যিনি ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী তার নিজস্ব উদ্ভাবনের জন্য পরিচিত। এই ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতিসংঘে।

জাতিসংঘের বৈঠকের বিষয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষ্য, ‘আমি যেহেতু যাইনি, সেহেতু আমি বলতে পারবো না।’ তিনি বলেন, ‘আগামী পরশু মির্জা ফখরুল দেশে ফিরতে পারেন।’

মির্জা ফখরুলের ঘনিষ্ঠ একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে চারটি বিষয়ে জানানো। প্রথমত, রোহিঙ্গা ইস্যু। এই ইস্যুতে মির্জা ফখরুল অতীতে দুবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কথা তুলে ধরেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এবং ৯২ সালে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিএনপি সরকারের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন বিএনপির মহাসচিব।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যাটি যে এখন আর দ্বিপাক্ষিক নয়, সে বিষয়টি জাতিসংঘকে উপলব্ধি করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি। গত ৩০ জুন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ঢাকায় এলেও বিএনপি তার সাক্ষাৎ পায়নি। এ কারণে বিএনপির পক্ষ থেকে  জাতিসংঘে চিঠি দেওয়া হয়। পরে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে মির্জা ফখরুলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এ বিষয়ে চেয়ারপারসন মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘২৪ আগস্ট জাতিসংঘের দফতর থেকে মির্জা ফখরুলকে চিঠি দেয়। সেই চিঠি পেয়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান।’

সূত্র জানায়, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আরও বড় আকার ধারণ করবে। আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারেও এর একটি পরিষ্কার অবস্থান থাকবে। এই ইস্যুটি জাতিসংঘের কাছেও নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

মির্জা ফখরুল জাতিসংঘে খালেদা জিয়ার মামলা ও তার কারাবরণ নিয়ে বিস্তারিত ফাইল জমা দেন। এতে বিএনপির চেয়ারপারসনের মামলার আইনি দিক, তার বয়স ও ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় তার জামিন না হওয়াসহ শারীরিক অবস্থার বিষয়েও জাতিসংঘকে জানানো হয়।

গত কয়েকবছর ধরেই বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন বিষয়ে জানাচ্ছে বিএনপি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন দলটির নেতারা। এর সূত্র ধরেই জাতিসংঘে যান মির্জা ফখরুল। এবার যাওয়ার চারটি কারণগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। প্রথমটি হচ্ছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও আগামী একাদশ নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি। দলীয় দায়িত্বশীলদের প্রস্তুতকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়েছেন তিনি।

বিএনপির সিনিয়র দায়িত্বশীল একজন নেতা জানান, জাতিসংঘকে বলা হয়েছে ২০১৪ ও এ বছরের পরিস্থিতি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে শুধু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে থাকলেও এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ করে ইতোমধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য কাটিং করে নিয়েছেন মির্জা ফখরুল। সঙ্গে নিয়েছেন জাতীয় কয়েকজন নেতার প্রোফাইলও।

মির্জা ফখরুলের ঘনিষ্ঠ সূত্রটির দাবি, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার দাবিতে আন্দোলনরত যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় ঐক্যপক্রিয়ার ড. কামাল হোসেন, জেএসডি সভাপতি আসম রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ সিনিয়র কয়েকজন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক ক্যারিয়ারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিফ করা ফাইল প্রস্তুত করে নেওয়া হয়েছে। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশিদের ব্রিফ করার বিষয়টি সাধারণ হলেও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও প্রোফাইল দেওয়ার বিষয়টি একেবারেই নতুন।

চতুর্থ হচ্ছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের তৎকালীন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈঠক। ওই বৈঠকে দেওয়া ‘জেন্টলম্যান্ট এগ্রিম্যান্ট’র বিষয়টি পুনরায় তুলে ধরেছেন মির্জা ফখরুল। আর এই বিষয়টি ছিল মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে মির্জা ফখরুলের বৈঠকের মুখ্য বিষয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাতিসংঘের একটি নিবিড় তত্ত্বাবধান চায় বিএনপি।

এ বিষয়ে বিএনপির ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘এটা তো প্রথমবার নয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব তারানকো এসেছিলেন। কথা বলেছিলেন দু’দলের সঙ্গে। তিনিই বসিয়েছিলেন। সুন্দর নির্বাচন করার জন্য দুদলকে বসিয়ে তিনি যান। ওই নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে, এটাই কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এবার জাতিসংঘের মহাসচিব আমাদের দেশে এসেছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়নি বিএনপির।

’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন আগামী নির্বাচন হতে মাত্র কয়েক মাস বাকি। এই প্রেক্ষাপটেই মির্জা ফখরুলকে ডেকে পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। কারণ, তারাও চায় বাংলাদেশে কয়েকমাস পর যে নির্বাচন হবে, তা যেন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়। এই নির্বাচন যেন ৫ জানুয়ারির মতো না হয়। মির্জা ফখরুলের সঙ্গে জাতিসংঘের কর্মকর্তার বৈঠকে নিশ্চিতভাবেই ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈঠকের বিষয়টি উঠেছে।’

এদিকে, মির্জা ফখরুলের জাতিসংঘ যাত্রার বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সমালোচনা করলেও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, ‘নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতিসংঘে মির্জা ফখরুলের যাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশে গণতন্ত্রহীনতা, খালেদা জিয়ারে কারাবরণ সম্পর্কে তারা জানে। ক্ষমতাসীনরা চাপে আছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তার সঙ্গে মির্জা ফখরুলের বৈঠক হয়েছে, এটা তো সত্যি। তাহলে তাদের গাত্রদাহ কেন?’

SHARE