Home শীর্ষ সংবাদ মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘের চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন চাই : জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘের চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন চাই : জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

66
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম( ২৯ সেপ্টেম্বর) :: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘের স্বাক্ষরিত চুক্তি অবিলম্বে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে তাই এর সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারে। জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে, আমরা তারও আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। গতকাল সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। খবর বাসস।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে, যারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশ সাধ্যমতো তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা করেছে।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় প্রথম থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে দেশটি মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না।

শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক নিপীড়িত ও রোহিঙ্গার মতো নিজ গৃহ থেকে বিতাড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমার হূদয়কে ব্যথিত করে। এ-জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

মিয়ানমারের ঘটনা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় জানিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা চালিয়েছিল, সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয় মিয়ানমারের এ ঘটনা। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানিরা ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। ২ লাখ নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন।

এক কোটি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে বিবরণ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে আমরা হতভম্ব। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে না পারবে, ততদিন তারা যাতে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করতে পারে, সেজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে আমরা নতুন আবাসন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার যারা সহানুভূতি দেখিয়েছেন এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে চলেছেন, তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। সেই সঙ্গে মানসম্মত পরিবেশে বসবাস নিশ্চিত করতে আমাদের সরকার রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে সহযোগিতার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার সপক্ষে তার অবস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জাতিসংঘ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তার দৃঢ়সংকল্পের কথা তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনের প্রতিপাদ্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য আমাকে অতীতের কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতায় নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ৪৪ বছর আগে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা এবং বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি একান্ত দরকার। এই শান্তির মধ্যে সারা বিশ্বের সব নর-নারীর গভীর আশা-আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়ে রয়েছে। এই দুঃখদুর্দশা-সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে জাতিসংঘ মানুষের ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের জনগণের। মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। একইসঙ্গে তারা আমার মা, তিন ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যসহ ১৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ফিলিস্তিন সংকট বিষয়ে শেখ হাসিনা তার ভাষণে বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন আজো অব্যাহত রয়েছে, যা আমাদের মর্মাহত করে। এ সমস্যার আশু সমাধান প্রয়োজন। ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে আমরা ওআইসির মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে তিনটি মৌলিক উপাদান বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে, তা হলো শান্তি, মানবতা ও উন্নয়ন। তাই মানবসমাজের কল্যাণে আমাদের মানবতার পক্ষে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। জনগণকে সেবা প্রদান এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মানবতা ও সৌহার্দই আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অধীনে ৫৪টি মিশনে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১০ জন শান্তিরক্ষী প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি রক্ষায় বিশেষ অবদান রেখেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ১৪৫ জন শান্তিরক্ষী জীবনদান করেছেন। বর্তমানে ১০টি মিশনে ১৪৪ জন নারীসহ বাংলাদেশের মোট সাত হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষী নিযুক্ত রয়েছেন। আমাদের শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারিত্ব, সাহস ও সাফল্যের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন।

নিরাপদ, নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন বিষয়ক ‘গ্লোবাল কমপ্যাক্ট’-এর মূল প্রবক্তা হিসেবে বাংলাদেশ আরো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানবাধিকার-কেন্দ্রিক একটি কমপ্যাক্ট প্রত্যাশা করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অভিবাসন-বিষয়ক এই কমপ্যাক্ট অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় একটি ক্রমপরিবর্ধনশীল দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদসহ সব সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রম বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমরা পরিচালিত হতে দেব না। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আমাদের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অব্যাহত থাকবে।

SHARE