Home বিনোদন মৃত্যুর ছয় দিন আগে কবরস্থান নির্বাচন করেন আইয়ুব বাচ্চু

মৃত্যুর ছয় দিন আগে কবরস্থান নির্বাচন করেন আইয়ুব বাচ্চু

112
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২০ অক্টোবর) :: চট্টগ্রামে মায়ের কবরের পাশে চির শায়িত হচ্ছেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু। যেখানে তাকে কবর দেয়া হচ্ছে মৃত্যুর মাত্র ছয়দিন আগে সে জায়গাটি দেখিয়ে সেখানেই তাকে কবর দেওয়ার কথা বলেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।

মৃত্যুর ছয়দিন আগে আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠান করতে। সেখানে মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে নিজের কবরের স্থান দেখিয়ে দেন রূপালি গিটারের এ নায়ক।

আইয়ুব বাচ্চুর মামা আব্দুল আলীম লোহানী বলেন, ”মৃত্যুর বিষয়টি মনে হয় তার জানা হয়ে গিয়েছিল। গত ১২ অক্টোবর শেষ বারের মতো প্রোগ্রাম করতে চট্টগ্রামে আসে আইয়ুব বাচ্চু।

তখন চৈতন্য গলির মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক জাফরকে বলেছিল, ‘জাফর আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার মায়ের পাশে আমাকে কবর দিবা।’’

চৈতন্য গলি কবরস্থানের মতোয়ালী হাফেজ গোলাম রহমান বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামে এলে মায়ের কবর জিয়ারত করতে আসতেন। তার ইচ্ছায় আজ এখানে কবর তৈরি করা হয়েছে।’

গত ১৮ অক্টোবর সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু।

কে ভালোবাসত না তাকে…

শুধু এলিট, মধ্যবিত্ত আর ‘শিক্ষিত’দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর সংবাদে দলে দলে মানুষ ছুটেছে হাসপাতালে। সংবাদকর্মীদের তো যেতেই হবে। গতকাল সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড় থেকে হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশে একজন রিকশাওয়ালাকে ডাকা মাত্র, কোথায় যাব এমন প্রশ্ন না শুনেই বলে ওঠেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু যে হাসপাতালে মারা গ্যাছে, ওইহানে যাবেন ভাই?’ অবাক হয়েই বলতে হলো, হ্যাঁ। এরপর তাকে আরেকবারের জন্য প্রশ্ন করা হয়।

— আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনছেন?

— ম্যালা গান হুনছি, আহারে মানুষটা এত তাড়াতাড়ি মইরা গেল!

গতকাল দুপুরের ঘটনা

হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার থেকে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের উদ্দেশে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার পর শাহবাগগামী আরেকটি রিকশায় ওঠার পর এ রিকশাওয়ালারও কৌতূহলী জিজ্ঞাসা, ‘বাচ্চু ভাইয়ের লাশ দাফন দেবে কোনখানে?’ জানানো হলো, আগামীকাল (আজ) চট্টগ্রামে তার মায়ের কবরের পাশে। এ কথার পর এ ব্যক্তি রিকশার প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতেই স্মৃতিচারণ করেন, ‘আম্মাজান ফিলিমে (ফিল্মে) তার গান শুনছি। ছবির কাহিনী অত মনে নাই, কিন্তু গানডা আমি এহনও গাই। আমার মোবাইলে এখনো বাচ্চুর অনেক গান আছে। প্রতিদিনই শুনি। আমার প্রিয় শিল্পী।’

আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ দুজন রিকশাওয়ালার উদাহরণ টানার কারণ একটাই যে, আইয়ুব বাচ্চু তার সুর, ব্যান্ড সংগীতকে শুধু এলিট, মধ্যবিত্ত আর শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। অন্যরা যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি তা-ই হাসিমুখে করতে সক্ষম হয়েছেন; সব শ্রেণীর মানুষের জন্য গান বেঁধেছেন। এ নিয়ে কেউ কেউ আবার ফেসবুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর পার্থক্যও করছেন। একজন লিখেছেন এভাবে, ‘রবীন্দ্রনাথের নাকি সকল অনুভূতির গান আছে। হায় হায় রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত যাইতে হবে? আইয়ুব বাচ্চুর সব অনুভূতির গান আছে।

ছ্যাঁক খাইছেন, আছে সেই তুমি। একটু সাইকোডেলিক ভাব নিতে চান, গতকাল রাতে। জীবনমুখী গান— হকার, মাধবী। প্রেমে পড়েছেন, কষ্ট পেতে ভালোবাসি। কত গান নীল বেদনা, মাকে বলিস, এই সব। রবীন্দ্রনাথের কোন গানে কি মাকে বলিসের অনুভূতি আছে, যেখানে ছেলে বাড়িতে যাওয়া বন্ধুকে বলতে বলছে, শহুরের যন্ত্রণায়, সে ভালো নেই, কিন্তু মাকে বলিস আমি ভালো আছি?’

আরেকজন লিখেছেন এভাবে, ‘এক লাইনে বললে বাচ্চু বাংলা গানকে তরুণদের জন্য বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন। বাংলা গানের গতিপথ বদলে দিয়েছেন। পরে আমরা নব্বইয়ে যারা নতুন কিছু শুনতে চাইতাম, তারা শূন্য দশকে আর বাচ্চু শুনি নাই। ভালো লাগত না। ঘুরে ফিরে কিছু ক্ল্যাসিক বাচ্চুই শুনতাম মাঝে মাঝে।’

গতকাল একজন আইয়ুব বাচ্চুর গান নিয়ে আবেগ্লাপুত হয়ে এভাবে স্মৃতিচারণ করছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তার এক বন্ধু একটি মেয়েকে পছন্দ করতেন। কিন্তু কিছুতেই যেন বলতে পারছিলেন না মনের সে কথা। এরপর একদিন টিএসসিতে আয়োজিত এক কনসার্টে আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনতে বন্ধুরা সবাই হাজির। এ সময় বাচ্চু গেয়ে ওঠেন ‘তুমি কেন বোঝো না, তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়’। ঠিক এ সময়ই বন্ধুটি রেলিংয়ের ওপর বসে তার কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার মানুষটির উদ্দেশে হাত নেড়ে আইয়ুব বাচ্চুর গানের সুরে সুরে বলতে থাকেন, ‘তুমি কেন বোঝো না, তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়।’ এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছেও সমান জনপ্রিয় ছিলেন বাচ্চু।

আধুনিক বাংলা গান, নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, রক ব্যান্ডসহ নানা ঘরানার গানের শিল্পীরা রয়েছেন। তাদের অনেকেই দারুণ সব গান উপহার দিয়েছেন বাংলা সংগীতকে। কিন্তু তাদের কেউ কি পেরেছেন, সব শ্রেণীর মানুষের জন্য, সব ধরনের গান উপহার দিতে? কোনো ব্যান্ড সংগীতশিল্পী কি পেরেছেন, শতভাগ ঢাকাই ছবি ‘লুটতরাজ’, ‘আম্মাজান’-এ অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে, আম্মাজান আম্মাজান চোখের মনি আম্মাজানের মতো গান উপহার দিতে? সম্ভবত একজন মাত্র শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু, যিনি ব্যান্ডের মতো জগতের মানুষ হয়েও নিরেট ফর্মুলাভিত্তিক ছবিতে জুতসই গান গেয়েছেন।

শিল্পী এবং ব্যক্তি— এই দুইয়ের ফারাক নিয়ে যে বিতর্ক চলমান, তাতে নিজের হাতে হয়তো ছেদ টেনেছেন আইয়ুব বাচ্চু। তিনি তার গানের মধ্য দিয়ে সব শ্রেণীর মানুষের মন যেমন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি যেভাবে গানের ভাষায় কথা বলতেন, ঠিক সেভাবে বাস্তবেও তিনি জীবনযাপন করে গেছেন।

এ শহরের অনেক ধনী পরিবারের সন্তানের মতো ব্যান্ড গড়ার সুযোগ পাননি আইয়ুব বাচ্চু। প্রায় খালি হাতে এ শহরে এসে জীবনযুদ্ধে নামতে হয়েছিল তাকে। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে যোগ্য করে তোলা সত্ত্বেও শুরুতে অবহেলার শিকার হয়েছেন। এমনও শোনা যায়, লিড গিটারিস্ট হওয়া সত্ত্বেও সোলস ব্যান্ডের কনসার্টগুলোয় সেই অর্থে তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হতো না।

এটাও জানা যায়, সংগীতজীবনের শুরুতে আইয়ুব বাচ্চুর টোন সুন্দর ছিল না।

ভাইব্রাটো ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারতেন না। কিন্তু টানা ১০ বছরের কষ্টসাধ্য পরিশ্রমে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। এ নিয়ে একজন বিশ্লেষকের উক্তি, ‘কিন্তু সেই আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের বাংলা ব্যান্ডের সবচেয়ে এক্সপ্রেসিভ গানগুলোর মধ্যে কিছু গেয়েছেন। তার রেঞ্জ ছিল ঈর্ষণীয়। টোনের ইউনিকনেসটাই তাকে বরং আলাদা করে তুলেছে পরে। এর একমাত্র কারণ সাধনা এবং অধ্যবসায়।’ হ্যাঁ দীর্ঘ ক্যারিয়ার শুরু থেকে দীর্ঘ ১০ বছরের কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে এভাবেই তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ রকম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের বেলায় নানা ধরনের গুজব, স্ক্যান্ডালের খবর রটে। এক্ষেত্রেও আইয়ুব বাচ্চু ব্যতিক্রম। তিনি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। মোহগ্রস্ত হননি। অনেক বাঁকা সুযোগকে তিনি এড়িয়ে গেছেন। তার সহধর্মিণীর নাম ফেরদৌস আইয়ুব চন্দনা। তাদের দুই সন্তান বড় মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব এবং ছোট ছেলে আহনাফ তাজোয়ার আইয়ুব থাকেন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। তাকে কখনই দেখা যায়নি অন্যদের মতো পরিবারের সবাইকে নিয়ে ক্যামেরার সামনে।

আইয়ুব বাচ্চু সবার দৃষ্টির অগোচরে চলে গেছেন। কিন্তু তার সৃষ্টি তাকে বারবার এই বাংলার মাটিতে ফিরে আনবে। তাকে মনে রাখতে বাংলা সংগীত, বাংলা ব্যান্ড বাধ্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

SHARE