Home মহাকাশ মহাবিশ্বের প্রথম আলোর সন্ধানে স্পেস টেলিস্কোপ

মহাবিশ্বের প্রথম আলোর সন্ধানে স্পেস টেলিস্কোপ

89
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(২৬ অক্টোবর) :: জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ নাসার  নির্মাণাধীন টেলিস্কোপ, পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে ২০১৮ সালে। JWST নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপ বলা হয়ে থাকে, এটা হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরি হিসেবে ধরা হচ্ছে । JWST হাবল টেলিস্কোপ থেকে অনেক গুনে শক্তিশালী , যেমন মুল দর্পন প্রায় ৬.৫ মিটার দর্পনের আকার ছাড়াও এই JWST আসল বৈশিষ্ট্য হল ইনফ্রা-রেড (700 nm – 1 mm তরঙ্গ দীর্ঘ)  তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের টেলিস্কোপ। ইনফ্রা-রেড বা অবলোহিত টেলিস্কোপ আসলে এমন ছবি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে যা প্রচলিত অন্য টেলিস্কোপে এখন কঠিন। মহাবিশ্বের বিভিন্ন অংশে অত্যন্ত ক্ষীণ আলো পর্যবেক্ষণে সক্ষম হবে, বিজ্ঞানীমহল এই টেলিস্কোপ নিয়ে অনেক আশাবাদী।

বিগ ব্যাং এর পর প্রথম গ্যালাক্সির অনুসন্ধান
গ্যালাক্সির বিবর্তন পর্যবেক্ষণ , গ্যালাক্সি প্রথম গঠিত হওয়া থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা
নক্ষত্রের গঠন ও বিবর্তন পর্যবেক্ষণ, নক্ষত্র ও গ্রহের  সৃষ্টি

গ্রহের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় ( আমাদের সৌরজগত সহ )

টেলিস্কোপ যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে তাই রয়েছে হিট-শিল্ড বা তাপ রক্ষাকারী ঢাল , এই শিল্ড সূর্যের প্রচণ্ড আলো ও তাপ থেকে স্যাটেলাইটকে রক্ষা করবে। এই টেলিস্কোপের অপারেটিং তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ২২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ( মাইনাস) ।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে এই টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। পে-লোড ESA (European Space Agency) নির্মিত অরিয়ান-৫ লঞ্চ ভেহিকাল (Ariane 5 Launch Vehicle) এর মাধ্যমে কক্ষপথে প্রেরণ করা হবে ফ্রেঞ্চ গায়ানা থেকে । মিশনের আয়ুষ্কাল ৫ থেকে ১০ বছর।

বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য

মহাবিশ্বের প্রথম আলো এবং পুনঃআয়নিত হওয়া  First light and reionization

বিগ ব্যাং এর পর মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল বিভিন্ন কণার পরিপুর্ন, যেমন প্রোটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রন। বিভিন্ন ধরনের কণায়  ( particles) পরিপুর্ন থাকার কারণে আলো স্তানান্তর হতে পারেনি, এই সময়কে অন্ধকার সময় বলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে মহাবিশ্ব আস্তে আস্তে শীতল হতে শুরু করে এবং প্রোটন ও নিউট্রন একত্র হয়ে আয়নিত হাইড্রোজেন গঠন করে ( ইলেকট্রন ছাড়া ) এবং সাথে কিছু আয়নিত হিলিয়ামও তৈরি হয়। পরবর্তীতে আয়নিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম মুক্ত ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে নিরপেক্ষ্য পরমাণু (neutral ) গঠন করে। মহাবিশ্বে আয়নিত কণার কমে যাওয়ায় আলো চলতে আর কোন বাধা ছিল না এবং JWST টেলিস্কোপ ঠিক এই প্রথম আলো সনাক্ত করার চেষ্টা করবে।

JWST কয়েক ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে, যেমন

কখন এবং কিভাবে পুনঃআয়নিত হয়েছিল

কোন উৎস থেকে এই পুনঃআয়নিত শুরু হয়েছিল

প্রথম দিকের গ্যালাক্সির সনাক্তকরণ

গ্যালাক্সি গঠিত হওয়া Assembly of Galaxy

JWST আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য হবে গ্যালাক্সির গঠন অনুসন্ধান করা। কিভাবে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। প্রথম দিকের গালাক্সিগুলু আজকের গ্যালাক্সির থেকে অনেক আলাদা, বিগ ব্যাং এর পর আস্তে আস্তে গ্যালাক্সি যখন গঠন শুরু হয়, প্রাথমিক গ্যালাক্সি গুলু আকারে ছিল ছোট এবং বেশ অগোছালো। বর্তমান সময়ের গালাক্সিগুলু অনেক বড় এবং একটি নির্দিষ্ট আকারের যেমন, পেঁচানো সর্পিল অথবা উপবৃত্তাকার। JWST মাধ্যমে দেখা যাবে কিভাবে ছোট গ্যালাক্সি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে বড় আকারের গ্যালাক্সির সৃষ্টি হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে যেমন, প্রতি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি করে বড় কৃষ্ণবিবর বা ব্ল্যাকহোল রয়েছে, কিন্তু কৃষ্ণবিবরের সাথে গ্যালাক্সির কই সম্পর্ক এই ব্যাপারটি পরিষ্কার নয়। আশা করা যায়, JWST টেলিস্কোপ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হবে।

নক্ষত্র ও নক্ষত্র মণ্ডলীর গঠন Birth of stars and protoplanetary systems

JWST টেলিস্কোপ এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল বিভিন্ন নক্ষত্রের গঠন এবং তাদের বিবর্তন অনুসন্ধান করা। এই টেলিস্কোপে থাকবে বিভিন্ন ধরনের অবলোহিত বা ইনফ্রা-রেড ক্যামেরা , স্পেক্ত্রমিটার ও অন্যান্য যন্ত্র। JWST টেলিস্কোপ বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যা অবলোহিত আলো দেখতে পারে। যদিও বর্তমানে হাবল টেলিস্কোপের কল্যাণে আমরা মহাবিশ্বের অসামান্য ছবি ও তথ্য পেয়ে থাকি কিন্তু মহাবিশ্বের প্রচুর তারা ও অন্যান্য অংশ ঢাকা পড়ে আছে বিভিন্ন মহাজাগতিক ধূলিকনার আড়ালে। অনেক সময় দৃশ্যমান আলো অন্য নক্ষত্র থেকে হাবল টেলিস্কোপ পর্যন্ত আস্তে পারে না। ঠিক এই কারণে JWST টেলিস্কোপে রয়েছে অবলোহিত আলো সনাক্ত করা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা করার যন্ত্র। অবলোহিত আলো বা ইনফ্রা-রেড লাইট মহাবিশ্বের ধূলিকনা বা গ্যাস দ্বারা বাধা পাবে না, যার কারণে এই টেলিস্কোপ এর মাধ্যমে আরও গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা করা সম্ভব। এর মাধ্যমে নক্ষত্র কিভাবে গঠিত হয় ও তার আশে পাশে কিভাবে গ্রহ-উপগ্রহ ও সৌরজগত গঠিত হয়, সেই সম্বন্ধে আরও জানা যাবে।

গ্রহ ও প্রাণের উৎস  Planets and origin of life

JWST এর মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রহ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এই মিশনের অন্যতম লক্ষ্য বিভিন্ন গ্রহ পর্যবেক্ষণ ও তাদের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা। এই মুহূর্তে কয়েক হাজার এক্সো-প্ল্যানেট বা বহিঃসৌরমণ্ডলীয় গ্রহ সনাক্ত করা হয়েছে এবং ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়ছে । এই টেলিস্কোপের মাধ্যমে অন্য নক্ষত্রের গ্রহের গঠন, বায়ুমণ্ডলের উপাদান , পানির অস্তিত্ব , সেই গ্রহে প্রাণ ধারণের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে কিনা এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব।

JWST তে রয়েছে বর্ণ নিরীক্ষণের যন্ত্র বা স্পেকট্রোমিটার যা দুরের গ্রহ থেকে আসা আলো নিরীক্ষা করে বায়ুমণ্ডলের উপাদান সম্পর্কে তথ্য দিতে পারবে। প্রত্যেক বস্তু বা উপাদান আলোর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য শোষণ করে এবং আলোর বাকি তরঙ্গ প্রতিফলিত বা পার হয়ে যায়, স্পেকট্রোমিটারের মাধ্যমে আলোর শোষিত অংশের পর্যবেক্ষণ করে সেই বস্তু বা গ্রহের উপাদান নির্ণয় করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, যদি কোন গ্রহের বায়ুমণ্ডলে সোডিয়াম থাকে তাহলে স্পেকট্রোমিটারে একটি শোষিত লাইন থাকবে, যা থেকে সোডিয়ামের উপাদানের প্রমাণ করা যায়।

JWST শুধু বাইরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণই করবে না, আমাদের নিজেদের সৌরজগতও প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করবে। এই টেলিস্কোপর মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহ ও আনান গ্রহ পর্যবেক্ষণ করা হবে, একই সাথে কুইপার বেল্ট, গ্রাহানু, ধূমকেতু , ছোট গ্রহ (প্লুটো , এরিস ইত্যাদি) পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে, যেমন কিভাবে সৌরজগত গঠিত হয়, প্রাথমিক ধূলিকণা থেকে কিভাবে গ্রহ গঠিত হয়, বড় ধরনের গ্রহের প্রভাব কই রকম সৌরজগতে , গ্রহগুলুর কক্ষপথ কিভাবে স্থিতিশীল হয়, ধারনা করা হয়, প্রথম দিকে গ্রহের কক্ষপথ নক্ষত্রের থেকে দুরে থাকে , পড়ে আস্তে আস্তে সূর্যের কাছে আশে, কিন্তু কিভাবে? গ্রহ গঠনের উপাদান বিশ্লেষণ করে হয়ত প্রাণের আদিরূপ নির্ণয় করা সম্ভব। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এখনো প্রচুর অজানা প্রশ্ন রয়েছে , জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ হয়ত সেই প্রশ্নের অনেক উত্তর দিতে সক্ষম হবে।

SHARE