Home কক্সবাজার রিপোর্টারের ডায়েরী : তাঁকে ‘আওয়ামী গুন্ডা’র অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল

রিপোর্টারের ডায়েরী : তাঁকে ‘আওয়ামী গুন্ডা’র অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল

101
SHARE

তোফায়েল আহমদ(৮ নভেম্বর) :: বৃহষ্পতিবার ছিল আমার মায়ের তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। সকালে ঘুম থেকে উঠেই পেলাম আমার এমন শোকের দিনে আরেক শোকের খবরটি। আমারই পারিবারিক ঘনিষ্টজন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব এডভোকেট একে আহমদ হোছাইন। যিনি এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারি ছিলেন। কত ঘাত-প্রতিঘাতের মুখে যাঁর এতটুকু উঠে আসা তার বিবরণ অনেক দীর্ঘ। যিনি শৈশব কাল থেকে মৃত্যুর পুর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কাটিয়েছেন একদম সাদাসিধে সাধারণ জীবন-যাপন।

মানুষের দুঃখে তিনি দুঃখিত হয়েছেন। এজন্য তিনি ভুক্তভোগী মানুষটিকে সাথে নিয়ে নিজেই থানায় পর্যন্ত গেছেন। থানায় গিয়ে কেবল ওসি সাহেবের সাথে কথা বলে ফিরেননি। তিনি কথা বলেছেন থানার ডিউটি অফিসারের সাথেও। তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের আইনজীবী। কিন্তু আইনজীবী হয়ে কেবল মোটা অংকের ফিঃ নেয়ার জন্য থানায় যাননি। গেছেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। এজন্য পাছে লোকে কত যে সমালোচনা করেছে-কিন্তু এসবে কোনদিন কান দেননি।

বৃহষ্পতিবার এমন কথাটিই বললেন-টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার ও কক্সবাজার তৃণমূল আওয়ামী লীগ কর্মী গোলাম আকবর। গোলাম আকবরের কথা-জীবনে বহু মামলা চালিয়েছেন এডভোকেট একে আহমদ হোছাইনকে আইনজীবী ধরে। তিনি মামলার ফিঃ দিতেন। কিন্তু কোনদিন গুণে দেখতেন না। যাই দিতেন তাই পকেটে নিতেন। তিনি আইনজীবী হিসাবে মক্কেলের মামলায় জিতার বিষয়টিকেই সবেচেয় বেশী প্রাধান্য দিতেন।
রাজনৈতিক জীবনেও তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির যেন শেষ নেই। গতকাল হাশেমিয়া মাদ্রাসা মাঠের নামাজে জানাযার কাতারে দাঁড়িয়ে ইমামের ডাকের অপেক্ষায় ছিলাম।

পার্শ্বে দাঁড়িয়ে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী যুব দলের আবদুর রহিম বলছিলেন-জেলা আওয়ামী লীগের ‘বটগাছ খ্যাত’ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম মোজাম্মেল হকের মৃত্যুর পর যেন আরেক ‘বটগাছ’ চিরবিদায় নিলেন। সদ্য প্রয়াত এডভোকেট একে আহমদ হোছাইনের কাছে সকল শ্রেণীর মানুষ মানবিক সহযোগিতা পেয়েছেন।তার প্রমাণ হাশেমিয়া মাদ্রাসার বিশাল মাঠে অনুষ্টিত নামাজে জানাযায় মুসল্লীদের ঢল।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের পশ্চিম হলদিয়া পালং গ্রামের আশে পার্শ্বে কোন স্কুল ছিলনা। তাই কয়েক কিলোমিটার দুরে প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান বাদশাহ মিয়া চৌধুরীর বাড়ীর পার্শ্বে নলবনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ। পরবর্তীতে রতœাপালং হাই স্কুল থেকে বাঁশখালী এবং পরে পটিয়ার রাহাত আলী হাই স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে মেট্রিক পাশ করেন প্রয়াত এডভোকেট একে আহমদ হোছাইন।

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচ,এসসি এবং বিএ পাশের পর তিনি ভর্ত্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে। থাকতেন এসএম হলে।

১৯৬২ সাল থেকেই প্রয়াত এডভোকেট একে আহমদ হোছাইনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু। এসময়ই তিনি শেখ ফজলুর হক মনি, ড. ওয়াজেদ মিয়া, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও আজমত আলী সিকদার সহ অনেকের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের একজন একনিষ্ট কর্মী। পরে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানকে আহ্বায়ক এবং তাঁকে যুগ্ন আহ্বায়ক করে যুবলীগের একটি কমিটি গঠণ করা হয়। তারপর থেকেই তিনি রাজনীতিতে আসেন সক্রিয়ভাবে।

রাজনীতিতে এসে যদি কোন নেতাকে সবচেয়ে বেশী সমালোচনা মূখর পরিস্থিতি সামাল দিতে হয় সেটা করতে হয়েছে তাঁকেই। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ছিল তিনি স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে আওয়ামী রাজনীতিতে ছিলেন না। সমালোচকরা এ রকম সমালোচনায় বরাবরই সরব ছিলেন। আমি প্রয়াত এডভোকেট একে আহমদ হোছাইনের একজন ঘনিষ্ট আতœীয়। গ্রামে আমাদের দুই পরিবারের বাড়ী হচ্ছে মাঝখানে মাত্র টেংরার ঘেরা। বাস্তবে তাঁর একজন বাল্য বন্ধু ছিলেন রুমখাঁ পালং পশ্চিম ক্লাসা পাড়ার মরহুম মোকতার আহমদ কন্ট্রাক্টর। তিনি পিডিপি করতেন এবং পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন।

বাল্যবন্ধু মোকতার আহমদের সাথেই প্রয়াত এডভোকেট আহমদ হোছাইনের স্বাধীনতা পূর্বকালীন দীর্ঘকালের সময় অতিবাহিত হয়েছে। এ কারনেই সমালোচকরা তাঁকে এরকম অপবাদ দিয়ে যেতেন। অথচ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়টিতে আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট একে আহমদ হোছাইনকে আমরা রাজাকার-আলবদরের কবর থেকে রক্ষা করতে পালা করে পাহারা দিতাম। তখন আমরা কিশোর বয়সের যারা স্বজন ছিলাম সবার গায়ে ছিল কালো গেঞ্জি এবং হাতে থাকত গরু চরানোর বেত (হাইল্লা ছোঁয়া)।

অর্থাৎ আমাদের যাতে কেউ সন্দেহ না করে সেজন্য আমরা গরুর রাখাল সেজেই ছিলাম। এসময় আহমদ হোছাইনের বেশীর ভাগ সময় কাটত পানের বরজের ভিতর। পানের বরজের ভিতর তিনিও কামলা সেঁজে কাজ করতেন। যখন পশ্চিমা হানাদার বাহিনী উখিয়ায় এসে পৌঁছে তার একদিন পরেই এডভোকেট আহমদ হোছাইনের বাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়। একই দিন বাদশাহ মিয়া চৌধুরী, মরহুম বক্তেয়ার আহমদ চৌধুরী (মাহমুদুল হক চৌধুরীর পিতা), শমশের আলম চৌধুরী সহ অরো অনেক আওয়ামী লগি নেতা সহ সংখ্যালঘুদের বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়।

এবার যদি বলি আহমদ হোছাইন যদি কিনা স্বাধীনতার পুর্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে না থাকতেন এবং তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধা না হতেন তাহলে কি পাকিস্তানীরা উনার ঘর পুড়িয়ে দিত ? সেদিন আমাদের নব নির্মিত ঘরটিতেও পশ্চিমারা পাউডার ছিঁড়িয়ে দিলেও কেবল একটি ছবি পেয়ে পাক হানাদার বাহিনী আগুন না দিয়ে সরে গিয়েছিল।

অত্যন্ত নির্লোভ ছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। ২০০৭ থেকে ২০১৫ খ্রীঃ পর্যন্ত একটানা ৮ বছর তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অথচ জীবনের শেষ সময়টি চরম আর্থিক টানাপোড়নে কেটেছে তাঁর। চিকিৎসা খরচের জন্য নানা জনের শরনাপন্ন হয়েছেন অত্যন্ত গোপনে। লেনদেন তাঁর কাছে মূখ্য ব্যাপার ছিল না। মূখ্য ছিল মানুষের সেবাটা তিনি দিতে পারলেন কিনা। এসব কারনে লোকজনের মুখে মুখে প্রয়াত রাজনীতিক এবং আইনজীবী আহমদ হোছাইন সর্ম্পকে বলা হয়-তাঁর কোন চাহিদা নেই। টাকা-পয়সা না দিলেও কাজ করে গেছেন। দৈনিক ডায়েরি লেখা ছিল তাঁর অন্যতম শখ। জীবনের শেষ ডায়েরির পাতাটিতে তিনি লিখেন গত ৫ নভেম্বর।

অর্থাৎ মৃত্যুর তিন দিন আগেও তিনি লিখেছেন ডায়েরি। লিখেছেন ডাক্তার আদনানের কাছে চিকিৎসা নিতে যাবার কথা। তিনি লিখেছেন ডাক্তারের আশ্বাসের কথাও। অর্থাৎ ক’দিন পরেই তিনি ভাল হয়ে যাবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই ডায়েরির পাতা লিখার তিন দিনের মাথায় তিনি চলে গেলেন চিরতরে। ডায়েরিতে তাঁর মেঝ সন্তান হেলাল চিকৎসার জন্য এক হাজার টাকা দেয়ার কথাও তিনি লিখে গেছেন। লিখেছেন জেলা প্রশাসকের সাথে আলাপের কথাও। এমনকি জীবনের শেষ বারের মত লেখা ডায়েরির পাতায়ও লিখে গেছেন পরোপকারের কথা।

তিনি ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন বটে কিন্তু ইংরেজী সাহিত্যে তাঁর পারদর্শিতা ছিল অসাধারণ। উখিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকাকালীন এডভোকেট আহমদ হোছাইনকে রাজনৈতিক কারনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সাথে ছিলেন উখিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বি.কম।

সেই সময় এডভোকেট আহমদ হোছাইনকে ‘আওয়ামী গুন্ডা ইলিমেন্ট’ হিসাবে তালিকাভুক্ত দেখিয়েই গ্রেফতার করা হয়েছিল। এডভোকেট আহমদ হোছাইনের জীবন বৃত্তান্তে তিনি নিজেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন এসব তথ্য। টানা ৫ মাস কারাভোগ করেন তিনি। এসময় তাঁকে সীমাহীন নির্যাতনের মুখেও পড়তে হয়। কারণ দেখানো হয়েছিল- তিনি ছিলেন ‘আওয়ামী গুন্ডা ইলিমেন্ট’ এর লোক। অর্থাৎ ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট এর পর দেশের আওয়ামী লীগাররা ছিলেন ‘আওয়ামী গুন্ডা’।

আওয়ামী গুন্ডার অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এই লড়াকু বঙ্গবন্ধু সৈনিকের স্বার্থকতা এখানেই- জীবনের এত ঘাত-প্রতিঘাতের মাত্র ৭৮ টি বছরের বর্ণাঢ্য কর্মকান্ড তিনি গতকাল সমাপ্ত করেছেন সর্বোচ্চ মর্যাদা নিয়ে। গতকাল শেষ বিকালে হাশেমিয়া আলীয়া মাদ্রাসার মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অনুষ্টানে বিউগলের সুরে তাঁকে চির বিদায় দেয়া হয়। তিনি চিরশায়িত হন উখিয়ার পশ্চিম হলদিয়া মৌলভী পাড়া মসজিদ কবরস্থানে পিতা-মাতার পার্শ্বে।

লেখক- তোফায়েল আহমদ, দৈনিক কালের কণ্ঠের সাংবাদিক।

SHARE