Home কক্সবাজার সোনাদিয়া দ্বীপে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশ-সংকট ঘনীভূত কি !

সোনাদিয়া দ্বীপে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশ-সংকট ঘনীভূত কি !

119
SHARE

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২১ নভেম্বর) :: কক্সবাজারের উপকুলীয় দ্বীপ মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের বিছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়া। মোট জমির পরিমান- ২৯৬৫.৩৫ একর। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পরিমান ০৩.১৫ একর। শুটকী মহাল ০২টি, চিংড়ী চাষ যোগ্য জমির পরিমান ৯৮.০০ একর। বন বিভাগের জমির পরিমান ২১০০ একর। বাকী সব প্রাকৃতিক বনায়ন ও বালুময় চরাঞ্চল।প্রাকৃতিক অপরুপ সৃজিত জীবন বৈচিত্র সমৃদ্ধ সোনাদিয়া দ্বীপ। যেখানে রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য মন্ডিত প্যারাবন, দূষণ ও কোলাহল মুক্ত সৈকত। অসংখ্য লাল কাকড়ার মিলন মেলা, পূর্ব পাড়ায় নব্য জেগে উঠা চর, বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম সহ দৃশ্যাবলী, দ্বীপবাসীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও সাদাসিদে জীবন যাপন, পূর্ব পাড়ার হযরত মারহা আউলিয়ার মাজার ও তার আদি ইতিহাস, জেলেদের সাগরের মাছ ধরার দৃশ্য, সূর্যাস্তের দৃশ্য, প্যারাবন বেষ্টিত আকাঁ-বাঁকা নদী পথ।এ দ্বীপটি পূর্ব পশ্চিম লম্বা-লম্বী বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ এর সাথে অপার সম্ভাবনাময়ী সম্পদে ভরপুর।

কিন্তু সোনাদিয়া দ্বীপ নিয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়ও আছে।ইতিমধ্যেই পর্যটন ব্যবসায়ীদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে এ দ্বীপটির উপর। ইতিমধ্যেই পর্যটন ব্যবসায়ীদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে এ দ্বীপটির উপর। শুরু হয়ে গেছে দ্বীপকে ঘিরে তাদের কর্মযজ্ঞ। আর তাদের অপরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সোনাদিয়া দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে যেতে পারে। ব্যাপক নির্মাণযজ্ঞ ও বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত, আনুষঙ্গিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদির ফলে দ্বীপটির চারপাশের সমুদ্রদূষণে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে; দূষণ ক্রমেই বাড়বে। আমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথা ভাবলে বিষয়টা দুশ্চিন্তারই বটে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনে পর্যটনশিল্পের প্রসারে দোষের কিছু নেই। তবে এ ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কেন সোনাদিয়া দ্বীপটিই বেছে নিতে হবে? এই ধরনের দ্বীপগুলোকে কি আমরা প্রাকৃতিক অবস্থায় রাখতে পারি না? হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন স্থাপনা, মানুষের ভিড়, ভোগ্যপণ্যের বর্জ্য ও প্রযুক্তির দূষণ থেকে মুক্ত একেবারে নির্জন নিরিবিলি দ্বীপ কি আমরা চাই না? বৃক্ষ-তৃণ-লতা-গুল্ম আর প্রাণীদের অভয়ারণ্য এমন একটি বুনো দ্বীপের কথা কি আমরা ভাবতে পারি না? এটা বিলাসিতা নয়, আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য খুব প্রয়োজন।

আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি একটু ভিন্নভাবেও দেখা যেতে পারে। পর্যটনকেন্দ্র যদি বানাতেই হয়, তাহলে সেন্ট মার্টিনে নয় কেন। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, সেন্ট মার্টিন ইতিমধ্যে একটি জনবহুল পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেটা ঘটেছে খুবই অপরিকল্পিতভাবে। পরিবেশবাদীরা বলে আসছেন, পরিকল্পনাহীনতার কারণে দ্বীপটির প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশ-সংকট ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।জানা যায়,সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আয়তন ৪ বর্গকিলোমিটার; সেখানে ৬২৫ একর জমি ব্যক্তিমালিকানার; অবশিষ্ট জায়গার মালিকানা রাষ্ট্রের। কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রের জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে দিনের পর দিন। বেড়াতে যাওয়ার জায়গা হিসেবে এটা ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিনোদনের জন্য ছুটে গিয়ে মানুষ হতাশ হয়। কারণ, দ্বীপটির প্রায় সব স্থাপনা ও পথঘাট এখন জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। ঘাট থেকে নেমে দ্বীপের ভেতরে যেতে পথের দুই পাশের দৃশ্য দেখে যেকোনো পর্যটক ভাবতেই পারেন কোথায় এলাম, কেন এলাম!

সরকার চাইলেই দ্বীপের সব অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে পরিকল্পিত একটি পর্যটন শহর গড়ে তুলতে পারে। পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এটা অবশ্যই করা যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ওই দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণের সীমা নির্ধারণ করা যায়, এবং সেই সীমা যাতে অতিক্রান্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা যায় প্রশাসনিক দৃঢ়তার দ্বারা। এসব করতে হবে, নইলে আমাদের এই একমাত্র প্রবালদ্বীপটি হুমকির মুখে পড়বে।

পরিবেশবাদীরা জানান, ২০১০ সালের দিকে ঘোষনা আসে সোনাদিয়া দ্বীপকে ঘিরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হবে। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে, গভীর সমুদ্রবন্দর নয়, সেখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কে জানে; কিন্তু সোনাদিয়া দ্বীপ যেমন আছে তেমনটি থাকলেই ভালো হবে, সেখানে কোনো কিছু না করাই শ্রেয়। এ রকম কিছু দ্বীপ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে থেকে যাক। বরং সেখানে যা করার আছে, তা হলো ইতিমধ্যে মানুষের যেটুকু হস্তক্ষেপ পড়েছে, তার ক্ষতি সারিয়ে তোলা। বিএনপি সরকারের সময় দ্বীপটির প্যারাবন ধ্বংস করে লবণ ও চিংড়ি চাষের যে মহোৎসব শুরু হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে। সেখানে আবার গাছ লাগিয়ে দ্বীপটিকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনা উচিত।

তাছাড়া, ৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সোনাদিয়া দ্বীপে প্রায় তিন শ জেলে পরিবার বাস করে। সরকারের উচিত দ্বীপে আর কোনো নতুন বসতি নিরুৎসাহিত করা। দ্বীপটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই রেখে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, দ্বীপটি অতিরিক্ত মানুষের বসবাসের উপযোগী নয়। তা ছাড়া, অতিরিক্ত জনসংখ্যা দুর্ভোগের পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনবে। তুলনামূলকভাবে দ্বীপটি এখনো নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরপুর। একটু বাঁকা সৈকত, মসৃণ বালিয়াড়ি, নির্জনতা, প্যারাবন, পাখির কলরব—সবকিছু মিলিয়ে এখানে কিছুটা ভিন্ন স্বাদ রয়েছে। এই স্বাদটুকু অক্ষুণ্নই থাকুক।

সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে এর পরিবেশ মারাত্বকভাবে নষ্ট হবে। পর্যটনের স্বার্থে প্রথমেই উন্নত করা হবে যাতায়াতব্যবস্থা। তাতে স্রোতের মতো মানুষ আসতে থাকবে। তার ফলে দ্বীপটির কী কী ক্ষতি হতে পারে, তার তরতাজা দৃষ্টান্ত সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে দালানকোঠা, দালাল, ফড়িয়া, মহাজন, ধান্দাবাজ ও কুচক্রী মানুষের আনাগোনা। বড় ব্যবসায়ীরা জায়গা কিনবেন। সেখানে বানাবেন সুরম্য অট্টালিকা।
আমরা এসব চাই না। আমরা চাই, সোনাদিয়া দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য অটুট থাকুক। আমরা আশা করব, সরকার বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)এর সহকারী পরিচালক নয়ন শীল জানান,সোনাদিয়া দ্বীপে জাহাজ চলাচলের মাধ্যমে পরিবেশের যদি ক্ষতি হয় তাহলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিব।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক সাইফুল আশ্রাব জানান,সোনাদিয়া দ্বীপে কোন কিছু করার আগে অবশ্যই অনমতি নিতে হবে।তবে তাদের একার পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার প্রশাসন,কক্সবাজারের সচেতন নাগরিক,পরিবেশবাদী ও ছাত্র,যুব সমাজের অকুন্ঠ সমর্থন ও প্রতিরোধ।  

SHARE