Home শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

75
SHARE

কক্সবাংলা ডটকম(৩০ নভেম্বর) :: শ্রেণীকক্ষে গুণগত পাঠের বিষয়টি নির্ভর করে শিক্ষকের দক্ষতার ওপর। বেশির ভাগ দেশেই শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের পর পরই তাই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হয় শিক্ষকদের। কোনো কোনো দেশে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের শর্তই থাকে প্রশিক্ষণ। যদিও বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের অর্ধেকেরই প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও বড় অংশ।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতি বছর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ইউনেস্কো।

সংস্থাটির প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৫০ শতাংশ। যদিও প্রতিবেশী নেপাল, মালদ্বীপ, মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরে এ হার ৯০ শতাংশের বেশি।

এছাড়া শ্রীলংকায় প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদানরত শিক্ষকদের ৮৫ শতাংশ, পাকিস্তানের ৮২ ও ভারতের ৭০ শতাংশেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে। এর বাইরে ভুটান, জর্ডান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষকদের শতভাগই প্রশিক্ষিত।

শিক্ষক সংখ্যার তুলনায় প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততাকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবের কারণ বলে জানান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার পর পরই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। তবে ডিপিইডি ও সি-ইন এড প্রশিক্ষণের আওতায় না আনতে পারলেও নিয়োগ দেয়ার পর পরই সপ্তাহব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা হয়।

এ প্রশিক্ষণে শিক্ষকদের পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়। তবে গুণগত পাঠদানের ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রাখে না, তা সত্য। গুণগত পাঠদানের লক্ষ্যে শতভাগ শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার।

লক্ষ্মীপুরের পুরনো বিদ্যালয়গুলোর একটি সদর উপজেলার বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানে বিদ্যালয়টিতে সহকারী শিক্ষক রয়েছেন চারজন। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ রয়েছে মাত্র দুজন শিক্ষকের। বাকি দুজন পাঠদান করছেন প্রশিক্ষণ ছাড়াই। প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়ছেন শিক্ষকরা।

শাম্মী আখতার নামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছি এক বছর হলো। যোগদানের পরদিন থেকে আমাকে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ক্লাস নিতে বলা হয়। ক্লাস নিতে গিয়ে আমি বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে শুরু করি। এরপর প্রধান শিক্ষক ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে (ক্লাস্টার) প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহের বিষয়টি জানাই। তারা আমাকে বলেন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। আপনার সিনিয়ররাই এখনো প্রশিক্ষণ পাননি। তাদের পর প্রশিক্ষণের তালিকায় আপনার নাম আসবে।

যদিও শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগে এ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের সনদ নিতে হয়। শুধু প্রাথমিক নয়, শিক্ষার প্রতিটি ধাপেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। নিয়োগের শর্ত হিসেবে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

কেননা আমাদের দেশে বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় না। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়েছেন। শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের জন্য এসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি-বেসরকারি মিলে সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯০১টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে ছাত্র সংখ্যা ৮৫ লাখ ৮ হাজার ৩৮ ও ছাত্রী সংখ্যা ৮৭ লাখ ৪৩ হাজার ৩১২। এ শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিয়োজিত ৬ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৪ জন শিক্ষক। মোট শিক্ষকের ৬২ শতাংশই নারী।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাথমিকের মতো মাধ্যমিকেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের পেছনের সারিতে বাংলাদেশ। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষকদের ৬৬ শতাংশই অপ্রশিক্ষিত। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকই প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে এ হার ৯৩ শতাংশ, ব্রুনাইয়ে ৯০ ও নেপালে ৮৯ শতাংশ। আর ভুটান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও জর্ডানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদানরত শতভাগ শিক্ষকই প্রশিক্ষিত।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এক দশক আগেও মাধ্যমিক পর্যায়ে অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের চিত্র আরো ভয়াবহ ছিল। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।

বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একসময় শিক্ষক প্রশিক্ষণে সরকারের বরাদ্দও কম ছিল। এখন শিক্ষার গুণগত মানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের অবস্থান ভালোর দিকে যাচ্ছে।

বেশির ভাগ শিক্ষকই প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন, এমন একটি বিদ্যালয় পিরোজপুর সদরের আটঘর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নয়জন শিক্ষকের মধ্যে পাঁচজনই অপ্রশিক্ষিত।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, আমাদের সব শিক্ষকই স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পাঁচ শিক্ষক। পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা আর অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এজন্য আমরা প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মাধ্যমে ক্লাসও বেশি নিয়ে থাকি।

পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে প্রায় ৪৩ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারছেন না। সৃজনশীল পদ্ধতি বুঝে প্রশ্নপত্র তৈরিতে সক্ষম ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। চলতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪ হাজার ৮০১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এমন চিত্র পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একাডেমিক সুপারভিশন দল।

SHARE