বৃহস্পতিবার ২৮শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

বৃহস্পতিবার ২৮শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

কক্সবাজার মর্গের হিমঘর থেকে ২৬ দিন পর লাকিংমের লাশ পেল বাবা-মা : রামু বৌদ্ধ শ্মশানে সমাধিস্থ

সোমবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২১
361 ভিউ

বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গের হিমঘরে ২৬ দিন পড়ে থাকার পর অবশেষে বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কিশোরী লাকিংমে চাকমার (১৫) মরদেহ।হস্তান্তরের পরপরই ২২ কিলোমিটার দুরে রামুর কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ শ্মশানে সমাধিস্থ করা হয়েছে।

সোমবার বিকাল সোয়া ৩টায় মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা র‍্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর উপপরিদর্শক অর্জুন চৌধুরীর উপস্থিতিতে লাকিংমের চাচাতো ভাই ক্যচিং চাকমা সই করে হাসপাতাল মর্গের হিমঘর থেকে লাকিংমে চাকমার মরদেহ গ্রহণ করেন।

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা শাহীন মো. আবদুর রহমান চৌধুরী।

হাসপাতালের লাশঘরের সামনে লাকিংমে চাকমার মা কেচিং চাকমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মেয়ের লাশটা পেয়েছি। আমরা নিতান্তই অসহায় দরিদ্র মানুষ। এখন আমাদের চাওয়া-একটাই যাতে আমার মেয়ের অপহরণকারি ও হত্যাকারীদের বিচার হয়।’ অপহরণের প্রায় এক বছর পর গত ৯ ডিসেম্বর লাকিংমে চাকমাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

হাসপাতাল চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‍্যাবের উপপরিদর্শক অর্জুন চৌধুরী বলেন, তদন্তে লাকিংমে চাকমার বয়স নাবালিকা অর্থাৎ প্রচলিত আইনে বিয়ের উপযুক্ত হয়নি তার সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই তার যদি বিয়েও হয়ে থাকে তা আইনগতভাবে অবৈধ। তাই সার্বিক বিবেচনায় তার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য তার মরদেহ বাবা-মার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এটি একটি অপহরণ মামলা হিসেবে আদালতে বিচার কার্য চলবে।

মরদেহ হস্তান্তরে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমঘরের ভাড়া বাবদ ২৮ হাজার টাকা দাবি করায়। লাকিংমের পরিবার অসহায় ও দরিদ্র হওয়ায় ওই টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। পরে র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের উপঅধিনায়ক মেজর মেহেদী হাসান র‍্যাবের পক্ষ থেকে হিমঘরের ভাড়া পরিশোধ করার ব্যবস্থা করেন। এরপর মরদেহ হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।এরপর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে হিমঘর থেকে লাকিং মের লাশ গাড়িতে তোলে স্বজনেরা জন্মস্থান টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের চাকমাপল্লিতে না নিয়ে গাড়ি ছুটে উল্টোপথে রামুর দিকে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সহ-সভাপতি ক্য জ অং বলেন, বাড়িতে নিরাপত্তা নেই, তাই রামুর কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ শ্মশানে (নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কে) লাকিং মে চাকমার লাশ সমাহিত করা হয়। এ সময় বিভিন্ন সংগঠনের নেতা–কর্মী, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষসহ নিহত নারীর পরিবারের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শাহীন মো. আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লাকিংমে চাকমাকে কয়েকজন যুবক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে। যুবকেরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জানায় রোগী বিষপান করেছে। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানায় হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতালে কর্মরত পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ লাকিংমের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ১০ ডিসেম্বর লাকিংমের মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়।’

এর মধ্যে আতাউল্লাহ নামে এক যুবক নিজের স্ত্রী দাবি করে মরদেহ তাকে হস্তান্তরের জন্য পুলিশকে আবেদন করে। মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পেয়ে বাবা লালা অংও হাসপাতালে ছুটে এসে সন্তানের মরদেহ পাওয়ার আবেদন করেন। শুরু হয় আইনি জটিলতা। গত ১৫ ডিসেম্বর লালা অং চাকমা তার সন্তানের মরদেহ তাকে হস্তান্তরের জন্য টেকনাফ বিচারিক হাকিম আদালতে আবেদন জানান। আদালত শুনানি পূর্বক আবেদনটি গ্রহণ করে লাকিংমের ধর্ম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য র‍্যাবকে দায়িত্ব দেন।

আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মংথেলা রাখাইন বলেন, গত ২৮ ডিসেম্বর মানবাধিকার কর্মীদের একটি দল টেকনাফে লাকিংমে চাকমার বাড়িতে যান। তারা পরিবার, গ্রামবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আতাউল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। পরেরদিন দলটি লাকিংমের বাবার উপস্থিতিতে কক্সবাজার র‍্যাব-১৫ এর কর্মকর্তাদের সাথেও কথা বলেন।

লাকিংমের বাবা লালা অং চাকমা বলেন, ‘গত বছরের পাঁচ জানুয়ারি তার মেয়ে লাকিংমেকে বাহারছড়া ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গা এলাকার আতাউল্লাহসহ চার-পাঁচ যুবক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তিনি ঘটনার দিনই অপহরণের বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ হাফেজকে অবহিত করে তার মেয়েকে উদ্ধার করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ওই ইউপি সদস্য কোনরকম ব্যবস্থা নেননি। এরপর তিনি বিভিন্ন জায়গায় তার মেয়েকে খুঁজতে থাকেন। আতাউল্লাহর স্বজনদেরও অনুরোধ করেন। তবে তাতেও ফিরে পাননি মেয়েকে। তিনি টেকনাফ থানায় গিয়ে অপহরণের মামলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই সময়ে টেকনাফ থানায় কর্মরত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ মামলা না দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন। ২৭ জানুয়ারি তিনি নিজে বাদি হয়ে কক্সবাজার জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে আদেশ দেন।

লালা অং চাকমা তার মামলার উল্লেখ করেছেন, তার মেয়ে এখনও বয়সে শিশু। ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ইস্যু করা জন্ম সনদ অনুযায়ী তার মেয়ের বয়স মাত্র ১৪ বছর ১০ মাস। তিনি বয়স প্রমাণের কাগজপত্রও আদালতে জমা দেন। তার মেয়ে নাবালক এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি। তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আতাউল্লাহ ও তার সঙ্গীরা অপহরণ করে নিয়ে গেছে।

আদালতের আদেশে গত ৯ আগস্ট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পরিদর্শক ক্যশেনু মারমা তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন। প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ক্যশেনু উল্লেখ করেন, ‘আমি এই মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং স্বাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দিও নেওয়া হয়েছে। পাঁচজন স্বাক্ষীই ভিকটিম লাকিংমের আত্বীয়। ওই পাঁচ জন ছাড়া কেউ লাকিংমেকে অপহরণ করা হয়েছে এমন বলেননি। তাই লাকিংমে নিজে স্ব-ইচ্ছায় চলে গেছে মর্মে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

মামলার বাদি লালা অং তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনের উপর না-রাজি দিয়েছেন। এ বিষয়ে আদালত পরবর্তী শুনানির তারিখ ২৮ জানুয়ারি নির্ধারণ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাদির আইনজীবী মোহাম্মদ মহি উদ্দীন খান।

লাকিংমে যেদিন মারা যান তার মাত্র ১৩ দিন আগে এক পুত্র সন্তান জন্ম দেন। নবজাতক সন্তান বর্তমানে আতাউল্লাহর মায়ের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর লাকিংমে চাকমার গ্রাম পরিদর্শনে যাওয়া মানবাধিকার কর্মী দলের অন্যতম সদস্য কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারাহ তানজিম টিটিল বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও আতাউল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে এবং লাকিংমের বয়স সংত্রুান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র স্বচক্ষে যাচাই করে দুইটি বিষয় পুরোপুরি স্পষ্ট হয়েছে। তা হলো লাকিংমে স্বেচ্ছায় কারো সাথে যায়নি সে পরিকল্পিত অপহরণের শিকার। দ্বিতীয়ত দেশের প্রচলিত আইন মতে সে নাবালক এবং তার বিয়ের বয়স হয়নি।

এদিকে সোমবার সকাল ১১ টায় কক্সবাজার জেলা শহরের পৌরসভা কার্যালয়ের সামনের সড়কে লাকিংমে চাকমার অপহরণ, বাল্য বিয়ে, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরিত করার প্রতিবাদে এবং তার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদ,আদিবাসী ফোরাম, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, হিউম্যান রাইটস্ ডিফেন্ডারস ফোরাম, নারী প্রগতি সংঘ, রাখাইন ওমেন ফোরাম, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ, তঞগ্যা স্টুডেন্ট কাউন্সিল এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

361 ভিউ

Posted ৫:২৭ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২১

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.

design and development by : webnewsdesign.com