রবিবার ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

রবিবার ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটে MSF : দশ লাখ মেডিক্যাল কনসাল্টেশন ও আমাদের উপলব্ধি

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
394 ভিউ
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটে MSF : দশ লাখ মেডিক্যাল কনসাল্টেশন ও আমাদের উপলব্ধি

MSF,coxsbazar(১৩ ফেব্রুয়ারী) :: ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে ৭০০,০০০-এরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যারা যুক্ত হয় আগে থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে। বর্তমানে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে আছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এমএসএফ (মেডিসিন্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স / সীমান্তবিহীন চিকিৎসক দল) বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গারোগী মিলিয়ে মোট দশ লক্ষ চিকিৎসা পরামর্শ (মেডিক্যাল কনসালটেশন) প্রদান করেছে। আমাদের মেডিক্যাল কোঅর্ডিনেটর জেসিকা পাত্তির মুখে শুনুন আমরা কি দেখছি।

১। সকল প্রধান অসুখগুলোর পেছনে আছে মানবেতর জীবনযাপন

আমাদের দশ লাখেরও বেশি চিকিৎসার প্রায় ৯ শতাংশ (৯২,৭৬৬)তীব্র পানিবাহিত ডায়রিয়া জন্য, যাদের অধিকাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। তারা এই অবস্থা মোকাবেলার জন্য বেশ দুর্বল, এবং চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও সম্ভব। যদিও গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার, তবে বেশিরভাগ মানুষ যথাযথভাবে পানিশূন্যতা পূরণের পর বাড়ি ফিরে যেতে পারে।

ডায়রিয়া সরাসরি ক্যাম্পগুলোর অনুন্নত ও মানবেতর জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত।শরণার্থীরা প্রায়ই বাঁশ এবং প্লাস্টিকের শীট দিয়ে তৈরি ছোট ঝুপড়িতে বাস করে এবং অনেক পরিবারের সদস্য এক ঘরে একসাথে থাকে। ডায়রিয়া প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পরিষ্কার পানীয় জল, ল্যাট্রিনগুলির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতা বাড়ানোর জন্য সচেতনতা।

আমাদের দেখা অন্যান্য রোগগুলোর জন্য ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও দায়ী। এই রোগগুলোর মধ্যে আছে শ্বাসতন্ত্রের উপরের ও নিচের অংশের সংক্রমণ, চর্মরোগ, এবং বিবিধ অজানা কারণে হওয়া জ্বর। ল্যাবরেটরি সার্ভিস না পাওয়া গেলে এই জ্বরগুলোর কারণ অনুসন্ধান করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

মানুষের ক্যাম্পে আরো জায়গা প্রয়োজন।এতে কিছু কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণের বিস্তার কমানো সম্ভব হবে।সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার সাধারণ অভ্যাস ফাঙ্গাস ও স্ক্যাবিজের মত অনেক চর্মরোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে।কিন্তু রিফিউজি ক্যাম্পে যেখানে পানি অনেক অপ্রতুল, সেখানে সামান্য হাত ধোয়াটাও এত সহজ না। তাই পানি ও পয়ঃনিস্কাশন সংক্রান্ত কর্মকান্ডগুলো এমএসএফ-এর কাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন পর্যন্ত আমাদের টিম ক্যাম্পে ৮,৭৮,০০,০০০ লিটার পরিস্কার পানি বিতরণ করেছে।

২। টিকাদান কর্মসূচীর পরও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েই গেছে

রোহিঙ্গা সংকটের প্রথম মাসগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন স্বাস্থসেবা প্রদানকারী সংস্থা বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করেছে। এর পেছনে দায়ী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য টিকা নেয়ার অতি অল্প সুযোগ, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচীতে সামান্য অংশগ্রহণ ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে, এমএসএফ ৬,৫৪৭ জন ডিপথেরিয়া ও ৪,৮৮৫ জন হামের রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে। যদিও এই সংখ্যা আমাদের মোট চিকিৎসা পরামর্শ (মেডিক্যাল কনসালটেশন)-এর শুধু ১ শতাংশ; কিন্তু এই প্রাদুর্ভাবগুলো দ্রুত ঠেকানোর ব্যবস্থা করা খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। তখন থেকে ডিপথেরিয়া, হাম ও কলেরার জন্য বেশ কয়েকটি টিকাদান কর্মসূচী চালানো হয়েছে।

বিশাল জনসংখ্যার উৎখাত / উদ্বাস্তু হওয়ার মত জরুরী অবস্থায় প্রথমেই যেটা করতে হয়, তা হচ্ছে হামের টিকা দেয়া, কারণ এটা বারবার ফিরে আসার মত একটি রোগ। আর ডিপথেরিয়ার আগমন আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল, কারণ এই রোগের প্রাদুর্ভাব বর্তমান বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা। আমাদের বেশিরভাগ ডাক্তার ওস্বাস্থ্যকর্মীদের নতুন করে শিখতে হয়েছিল কিভাবে এর চিকিৎসাকরতে হয়।

বর্তমানে ক্যাম্পগুলো বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত, এবং আমাদের টিম নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ঝুঁকি এখনও আছে। যেমন উদাহরণস্বরুপ বলা যায় সম্প্রতি আমরা কয়েকশ চিকেন পক্সের রোগীরচিকিৎসা করেছি; এটিএমন একটি রোগ যা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কিংবা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত মানুষদের জন্য জটিলতা নিয়ে আসতে পারে।

৩। ভবিষ্যৎ এতই অনিশ্চিত যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই এমন কিছু অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে যা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। অনেকেই সহিংসতার শিকার হয়েছে, কিংবা চোখের সামনে সহিংসতা দেখেছে, এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুদের হারিয়েছে।তাদের অনেকেই নিজ দেশে নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু এটা বর্তমানে সম্ভব হচ্ছে না।তাই তারাহতাশ বোধ করে এবং মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে।রোহিঙ্গা সংকটের একদম শুরু থেকেইমানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা এমএসএফ-এর একটি অগ্রাধিকার হিসেবে আছে।আমাদের চিকিৎসা পরামর্শ (মেডিক্যাল কনসালটেশন)-এর ৪.৭% (৪৯,৪০১) ছিল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসা।

অনেকের কাছেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারটা একদমই নতুন। আবার অনেক সময় এতে জড়িত থাকে সামাজিক ও লোকলজ্জার ভয়। তাই আমরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করেছি, এবং আমাদের এটি চলমান রাখা প্রয়োজন। আমাদের মেন্টাল হেলথ টিম একক ও দলীয় সেশন পরিচালনা করে; এছাড়াও আছে অপুষ্টির শিকার শিশুদের জন্য সাইকোসোশ্যাল স্টিমুলেশন থেরাপিও বিভিন্ন মনোরোগের চিকিৎসা। এটি ধীরে ধীরে তাদেরকে সাহায্য করছে। অনেকেই ফলো-আপ এর জন্য আসছে এবং পুরোপুরি চিকিৎসা শেষ করে চলে যাচ্ছে। এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির লক্ষণ।

৪। দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা এখনও অপ্রতুল

ডায়বেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মত দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো আমাদের রোগীদের, বিশেষত বয়স্কদের মধ্যে লক্ষণীয়ভাবে বিদ্যমান। কিন্তু এই স্বাস্থ্যচাহিদাটি পূরণে এখনও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। যখন আমরা এমন কোন রোগী দেখি যার এরকম দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য জরুরী চিকিৎসা প্রয়োজন, আমরা প্রথমে তাকে প্রাথমিক সেবা দিয়ে স্ট্যাবিলাইজ করি, ও পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য অন্য কোন চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করি। শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক থেলাসেমিয়ার রোগী রয়েছে, এটি এমন একটি জন্মগত রোগ যা চিকিৎসা করা বেশ কঠিন এবং এর জন্য ব্লাড ট্রান্সফিউশন প্রয়োজন।

এখন পর্যন্ত আমাদের টিম ২,১৯২টি শিশুর জন্মগ্রহণে সাহায্য করেছে। পৃথিবীর অন্যান্য যেসব স্থানে এমএসএফ কাজ করে, তার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। এর কারণ হচ্ছে বেশিরভাগ মহিলাই হাসপাতালে সন্তান জন্মদান করতে অনিচ্ছুক। সাধারণত তাঁরা বাড়িতে ধাত্রীর সহায়তা নিয়ে জন্মদান করেন, ঠিক যেমন মিয়ানমারে করতেন। কিন্তু যখন বাড়িগুলো প্লাস্টিকের তৈরি অস্বাস্থ্যকর ঝুপড়ি, তখন পরিবেশটা আসলে আর ভালো থাকে না, আর এটাই আমরা বদলাতে চাই। হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে আসা মহিলারা অনেকেই অনেক দেরি করে আসেন, প্রসবকালীন কোন রকম চিকিৎসা বা প্রস্তুতি ছাড়াই। প্রসবকালীন চিকিৎসা নিতে আসা মহিলারা আমাদের মোট মেডিক্যাল কনসালটেশনের মাত্র ৩.৩৬% (৩৫,৩৯২)। ফলস্বরুপ আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়ই গর্ভবতী মহিলাদের দেখতে পায় প্রি-এক্লাম্পশিয়া, এক্লাম্পশিয়া, দীর্ঘস্থায়ী প্রসব বেদনা এবং বিলম্বিত জন্মদানের সমস্যায় ভুগতে।

৫। জরুরী অবস্থা এখন রুপ নিয়েছে দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটে

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুর দিকে জরুরী অবস্থায় আমরা মিয়ানমারের সহিংস ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দিয়েছিলাম, আর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও তখন ছিল অতি জরুরী। বর্তমানে যাদেরকে আমরা সহিংসতা-জনিত ঘটনার জন্য চিকিৎসা দিচ্ছি, তাদের অনেকেই ক্যাম্পের কিংবা পারিবারিক ঘটনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এবং যৌন সহিংসতার শিকার। মূল স্বাস্থ্য চাহিদা এখন অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও সেকেন্ডারি লেভেল এর স্বাস্থ্যসেবা। জরুরী অবস্থার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত, কারণ ও পরিবেশ বদলালেও, যৌন সহিংসতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোকাস হিসেবে আছে। আমাদের ক্লিনিকগুলোতে মহিলারা অনেক সময় আসে বহুদিনের উপেক্ষিত যৌনরোগের সংক্রমণ নিয়ে।

চলমান সময়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে এমএসএফের অব্যাহত উপস্থিতিস্থানীয় বাংলাদেশীদের জন্যও চিকিৎসা প্রদানে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষত এমএসএফ-এর যেসব ক্লিনিকগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে অবস্থিত নয়, সেগুলোতে বাংলাদেশী রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ (মেডিক্যাল কনসালটেশন) নেয়ার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

 

 

 

394 ভিউ

Posted ৬:৩৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.

design and development by : webnewsdesign.com