
বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজারে লবণ উৎপাদন ও চাষে ধ্বসের আশংকা দেখা দিয়েছে। শীতে লবণ উৎপাদনের ভরমৌসুম শুরু হলেও কক্সবাজার জেলার কিছু অঞ্চলে এখনও মাঠে নেই অধিকাংশ চাষিরা। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি, অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয় ও বাজারে মূল্যহ্রাস। তিন সংকটে বিপর্যস্ত লবণচাষিরা। গত মৌসুমের লবণ এখনো মজুত রয়েছে। এবারের মৌসুম শুরুর পরও এখনো মাঠ ফাঁকা পড়ে আছে। লবণ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন না কেউ।
চাষিদের দাবি, বিদেশি লবণ আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, মজুত লবণ ক্রয়ে সরকারি উদ্যোগ এবং উৎপাদন খরচ কমানোর ব্যবস্থা না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মৌসুমি শিল্প বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বর্তমানে পরিস্থিতি চাষিরা মৌসুমের মাঝপথেও মাঠ তৈরি করতে সাহস পাচ্ছেন না।
শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ, অথচ লবণের দাম উৎপাদন খরচের অর্ধেকেও পৌঁছায় না। তাই পুরো অঞ্চলে লবণশিল্প পতনের মুখে।
লবণকে এক সময় সাদা সোনা হিসেবে অভিহিত করা হতো। সেই সাদা সোনায় কালো মেঘের ছায়া পড়েছে। নভেম্বর মাস শেষ হলেও লবণচাষিদের মধ্যে এখনো মাঠে নামার কোনো তোড়জোড় নেই। অধিকাংশ কৃষকের জমিতে গর্ত করে রাখা হয়েছে গত বছরের লবণ।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্যমতে, কৃষকের কাছে মজুত থাকা লবণের পরিমাণ পৌনে তিন লাখ টন। অথচ এই সময়ে কৃষকের কাছে লবণ জমা থাকার কথা নয়। বরং নতুন করে লবণ উৎপাদনে মাঠে দিনরাত তাদের পড়ে থাকার কথা ছিল।
পেকুয়া উপজেলা লবণ, মৎস্য ও কৃষিকল্যাণ সমিতির সভাপতি আবুল হাসেম জানিয়েছেন, চলতি বছরে লবণের বাজারে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন লাখ টন লবণ বিক্রি না হয়ে মজুত অবস্থায় পড়ে আছে। গত বছরের এই সময় নতুন মৌসুম শুরু হয়ে গেলেও এবার লবণ বিক্রির গতি একেবারেই সন্তোষজনক নয়।
তিনি বলেন, ‘এবারের এ পরিস্থিতিতে লবণচাষিদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। গত মৌসুমের লবণ বিক্রি না হলে নতুন মৌসুমের লবণ মজুত করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাজারে লবণের চাহিদা কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাজার-নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কক্সবাজারে লবণ চাষে ধস নেমেছে। এভাবে চলতে থাকলে লবণও পাটের মতো হারিয়ে যাবে।’
জানতে চাওয়া হয়, ‘বিসিকের দাবি, লবণ আমদানি হয়নি। তাহলে কেন এমন অভিযোগ?’ এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, ‘যারা লবণ আমদানি করেন তারা সাধারণত ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করে। কিন্তু বাজারে প্যাকেটজাত করে লবণ বিক্রি করে দেন। এখানে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। এই ফাঁকি বন্ধ করতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজার জেলা এবং বাঁশখালীর কিছু অংশে লবণ চাষ হয়। এই অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৬৮ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়। নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে চাষিরা মাঠ তৈরি করে লবণ উৎপাদনের কাজে লেগে যান। কিন্তু এবার মৌসুম শুরু হয়ে গেলেও এলাকাজুড়ে অধিকাংশ লবণ মাঠ এখনো অযত্নে পড়ে আছে।
এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, গত বছর লবণ চাষ করে চাষিরা ভয়াবহ লোকসানে পড়েন। প্রতি কানি (৪০ শতক) মাঠে গড়ে ৩০০ মণ লবণ উৎপাদন হয়। বর্তমানে প্রতি মণ লবণের দাম মাত্র ২৩০ টাকা। এতে কৃষকের মোট আয় হয় ৬৯ হাজার টাকা।
কিন্তু পানি বাবদ ৬ হাজার টাকা, কাগজ-পলিথিন ৮ হাজার টাকা, ৬ মাসে শ্রমিকের বেতন ১ লাখ ২০ হাজার ও বোটে তোলার ৯ হাজার টাকাসহ মোট ব্যয় হয় ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। প্রতি ৪০ শতক লবণ মাঠে কৃষকের লোকসান দাঁড়ায় অন্তত ৭৪ হাজার টাকা। যার ওপর জমির মালিককে উৎপাদনের অর্ধেক ভাগ দিতে হলে লোকসান আরও গভীর হয়।
পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য গোলাম রহমান বলেন, ‘সরকার বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করছে, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ। অন্যদিকে, কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানে পড়ছেন। এভাবে চললে কৃষকরা আর লবণ চাষ করবে না, আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।’
রাজাখালীর তরুণ চাষি আরিয়ান বলেন, ‘লবণকে আমরা সাদা সোনা বলি। কিন্তু এমন অবস্থায় চলতে থাকলে লবণ চাষ একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে। সরকারের এখনই জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) লবণশিল্প উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘মৌসুম শুরু হলেও লোকজনের মাঠে নামার প্রবণতা কম। গত বছরের প্রায় পৌনে তিন লাখ টন লবণ রয়ে গেছে।
তবে এই সময় গত বছরের লবণ মজুত থাকার কথা নয়। দাম কম থাকার কারণে কৃষকরা লবণ বিক্রি করেননি। মাটিতে গর্ত করে মজুত করে রেখে দিয়েছেন।’
গত বছর দেশে লবণ আমদানি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শুধু ওষুধ শিল্পের জন্য লবণ আমদানি হয়। ওষুধ কারখানাগুলোর লবণে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকতে হয়। তাই এই লবণ আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়।
তবে আমাদের দেশের কৃষকরাও এই লবণ চাষ করতে পারেন। কিন্তু এই লবণ উৎপাদন করতে গেলে মান নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। মোটা দানার লবণ লাগে। কৃষকরা সেই সময় দিয়ে লবণ উৎপাদন করতে চান না। ওষুধ কোম্পানিগুলোতে বছরে আড়াই থেকে তিন লাখ টন লবণ লাগে।
ওষুধ কোম্পানিগুলো চাইলে লবণচাষিদের গাইড করে তাদের প্রয়োজনীয় গুণগত মানসম্পন্ন লবণ উৎপাদন করে নিজেরা কিনে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কিন্তু কোম্পানিগুলো কখনো সেই উদ্যোগ নেয়নি। নেওয়ার মানসিকতা আছে বলেও মনে হয় না।’
তিনি জানান, আমাদের দেশের লবণের চাহিদার অর্ধেক শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক। কিন্তু অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই লবণের চাহিদা কমে দাম কমে গেছে। গত বছর সাড়ে ২২ লাখ টন লবণ উৎপাদন হয়। তার আগের বছরের দুই লাখ টন মজুত ছিল। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ টন।
কাগজে-কলমে আমাদের দেড় থেকে দুই লাখ টন লবণ কম ছিল। আমাদের শিল্প কারখানার বার্ষিক লবণের চাহিদা প্রায় ১৩ লাখ টন। কিন্তু কারখানায় ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৬ লাখ টনের মতো। বাকি প্রায় ৭ লাখ টন লবণ রয়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে লবণের দামে।
তবে আশার কথা হলো, যেসব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে চালু হতে শুরু করেছে। কারখানাগুলো যখন পুরোদমে উৎপাদনে যাবে, তখন লবণের চাহিদা বেড়ে যাবে। দেশের প্রায় ১২টি শিল্প খাতে লবণ ব্যবহার হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় গার্মেন্টসের ডায়িং, কেমিক্যাল, ট্যানারি এবং ডিটারজেন্ট তৈরিতে।

Posted ১:৪৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta