মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চট্টগ্রাম সফর

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০
61 ভিউ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চট্টগ্রাম সফর

কক্সবাংলা ডটকম(৬ জুলাই) :: ১৯০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চট্টগ্রামে আসেন। তার আগে থেকেই চট্টগ্রামের সাহিত্য সমাজের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। ১৮৭৭ সালে হিন্দু মেলার এক আসরে চট্টগ্রামের খ্যাতিমান কবি নবীন চন্দ্র দাসের সাথে তার পরিচয় ঘটে। নবীন চন্দ্র দাস সেই সময় কালিদাসের ‘রঘুবংশের’ বাংলা অনুবাদের প্রথম খন্ড প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অনুবাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

১৮৯২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি নবীন চন্দ্র দাসকে এক দীর্ঘ প্রশংসাপত্র পাঠান। তাতে বিশ্বকবি লেখেন,

“আমি আপনার লেখা রঘুবংশের বাংলা অনুবাদ পড়ে বেশ পুলকিত হয়েছি। সংস্কৃত ভাষার কবিতা অনুবাদে অনেক সময়ই কবিতার প্রাঞ্জলতা রক্ষা করা বেশ দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে কবিতার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়। কিন্তু আপনার অনুবাদে মূল কবিতার ভাবার্থ যথাসম্ভব রক্ষা করে তার ভাবরস ও সৌন্দর্যের এতোটুকু বিচ্যুতি ঘটতে দেননি। ”

রঘুবংশের দ্বিতীয় খন্ডের অনুবাদ পড়েও কবিগুরু সমান মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৮৯৫ সালে সাধনা পত্রিকায় এই বইয়ের প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ একটি দীর্ঘ সাহিত্য সমালোচনা লেখেন। চট্টগ্রামের আরেক অনুজ ‘কবি ভাস্কর’ শশাঙ্ক মোহন সেনের সাথে রবি ঠাকুরের ছিল বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। তার লেখা ‘সিন্ধু সঙ্গীত’ পড়েও রবীন্দ্রনাথের বেশ ভালো লাগে। এই কবিতার বই নিয়ে কবিগুরুর মন্তব্য ছিল এরকম,

“এই বইয়ের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা এবং এক কবির কাব্য প্রতিভার স্ফুরণ দেখতে পাওয়া যায় ।” ফলে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট লেখকদের সাহিত্য সম্পর্কে রবি ঠাকুর বেশ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাদের সাহিত্যকর্মের প্রতি তার ছিল অপার মুগ্ধতা। ফলে সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তাদের সাথে কবিগুরুর একধরনের আত্মিক বন্ধন তখন থেকেই ছিল। আর সেজন্য চট্টগ্রামে আসার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ আগ্রহ ছিল।

এই সময়ই চট্টগ্রামের আরেকজন ব্যক্তিত্ব কবিকে চট্টগ্রামে আসার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি হচ্ছেন কর্মীপুরুষ যামিনীকান্ত সেন। চট্টগ্রাম হিতসাধিনী সভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তার সাথে রবীন্দ্রনাথের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। যামিনীকান্ত সেন কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করতেন। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে ওকালতি পেশা ছেড়ে বিনা বেতনে শান্তিনিকেতনে শিক্ষক পেশায় যোগ দেন তিনি। স্বভাবতই, যামিনীকান্তের প্রতি কবিগুরু কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বরিশালের সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা জানতে পারার পর থেকেই কবিকে চট্টগ্রামে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়। চট্টগ্রামের প্রবীণ জননেতা যাত্রামোহন সেন যামিনীকান্তের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে চট্টগ্রামে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান।

চট্টগ্রাম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেককাল আগে থেকে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কবিগুরুর সহৃদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক ঠাকুর দাস মুখোপাধ্যায়ের মুখে পাহাড়, সমতলভূমি, নদীবেষ্টিত চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে কগিুরু প্রথম জানতে পারেন। ঠাকুর দাসের লেখা নানা চিঠিপত্রে চট্টগ্রামের অসাধারণ রূপ বর্ণনা কবিকে চট্টগ্রাম সম্পর্কে আকৃষ্ট করে তোলে। এরপর আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের লেখা ‘স্বদেশী আন্দোলন ও মুসলমান সমাজ’ প্রবন্ধে চট্টগ্রামবাসীর অসম্প্রদায়িক চেতনার কথা, স্বদেশপ্রীতি, অসহযোগ আন্দোলন এবং চট্টগ্রামবাসীর অসাধারণ বীরত্বগাথা নিয়ে গান্ধীজী কর্তৃক অভিনন্দন রবীন্দ্রনাথকে চট্টগাম সম্পর্কে আরো আগ্রহী করে তোলে।

চট্টগ্রাম সফরের আসার মাত্র কয়েক বছর আগে, রবীন্দ্রনাথ তার আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, সমাজের দরিদ্র মানুষের উপকারের জন্য ‘দ্য হিন্দুস্তান কো-অপারেটিভ ইনস্যুরেন্স সোসাইটি’ নামে একটি বীমা কোম্পানি গঠনের করা হয়েছে। এই কোম্পানীর মাধ্যমে অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া কাটিয়ে সাবলম্বী হয়ে গড়ে ওঠার জন্য যুবকদের মাঝে ঋণ প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতার দুশ্চিন্তা নিরসনের জন্য সহজ শর্তে বীমার ব্যবস্থা রাখাসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড রবীন্দ্রনাথকে চট্টগ্রাম সম্পর্কে উৎসাহী করে তোলে।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা খোলা, চট্টগ্রামের কবি সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করা এবং সর্বোপরি সুহৃদ যামিনীকান্ত সেনের আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চট্টগ্রামে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কবিগুরুর এই সফর ছিল মাত্র দুদিনের। বরিশালের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভায় অংশগ্রহণ শেষে তিনি চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করবেন বলে চট্টগ্রামের অভ্যর্থনা কমিটিকে জানিয়ে দেওয়া হয়। অভ্যর্থনা কমিটির পক্ষ থেকে ত্রিপুরাচরণ চৌধুরী ও কাজেম আলী মাস্টার প্রমুখের উদ্যোগে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনটিকে সাজানোর ব্যবস্থা করা হয়।

চট্টগ্রাম শিক্ষিত সমাজ ও সাহিত্যানুরাগীদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি ভালোবাসা বরাবরই ছিল। ১৯০৭ সালের ১৭ জুন পূর্ববাংলার বন্দরনগরী চট্টগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম পদার্পণ করেন। দিনটি ছিল সোমবার। কবিগুরুর সফর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন ভাইপো সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধু কেদারনাথ দাশগুপ্ত। সেদিন ভোরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের অনেক গুণীজন ও সাহিত্যপ্রেমিক কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে চট্টগ্রাম স্টেশনে জড়ো হন। চট্টগ্রামের সাহিত্যানুরাগী ও সুশীল সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ কবিকে বরণ করে নেন।

কবিগুরুকে স্টেশন থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে যামিনীকান্ত সেনের বাবা কমলাকান্ত সেনের দোতলা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কমলাকান্ত সেনের বাড়ির সামনে সেদিন কবিকে দেখতে ও কথা বলতে অনেকেই ভিড় করেন। ১৭ জুন সন্ধ্যায় কবিকে নৈশ ভোজের আমন্ত্রণ জানান নগরীর আইসিএস জজ। কিন্তু তার পরিবর্তে চট্টগ্রামের সুশীল ও নাগরিক সমাজের সাথে বৈঠক করতেই কবি বেশি উৎসাহিত ছিলেন। এজন্য জজের আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য কবি তার ভাইপো সুরেন্দ্রনাথকে জজের বাড়িতে পাঠান।

তৎকালীন চট্টগ্রাম কলেজের আইনের অধ্যাপক ও সাহিত্যিক রজনীরঞ্জন সেনের পার্সিভিল হিলের ‘দ্যা প্যারেড’ এর বাসভবনে নির্ভেজাল আড্ডায় মেতে ওঠেন কবি। এই আড্ডা চলাকালীন স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকদের সমর্থনে চট্টগ্রামে সাহিত্য পরিষদ স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

চট্টগ্রামের কবি, লেখক, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট নাগরিকগণ এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, নবীন চন্দ্র সেন, পূর্ণ চন্দ্র চৌধুরী, মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, যাত্রা মোহন সেন, রামচন্দ্র বড়ুয়া, হরিশচন্দ্র দত্ত, আবদুর রহমান দোভাষ, মাহিমচন্দ্র গুহ, কাজেম আলী ও ব্রজ কুমার সেনের (প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর অনুপম সেনের পিতামহ) মতো চট্টগ্রামের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ।

১৯০৭ সালের ১৮ জুন মঙ্গলবার সকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষদের কয়েকজন কবিকে চট্টগ্রাম শহর দেখাতে নিয়ে যান। কর্ণফুলি নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখে কবি মুগ্ধ হন। এইসময় কবি জাহাজের কয়েকজন মাঝি-মাল্লারের সাথে কথা বলেন। বিকেলে নগরীর সদরঘাট এলাকায় তখনকার কমলবাবুর থিয়েটার হলে (পরবতীর্তে লায়ন সিনেমা হল) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সভার শেষদিকে ব্রজমোহন সেনের অনুরোধে শ্রোতাদের উদ্দেশে কবি একটি গান পরিবেশন করেন।

পরেরদিন ভোরে চট্টগ্রাম থেকে কবিগুরু কোলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।এভাবেই শেষ হয় কবিগুরুর চট্টগ্রাম ভ্রমণ।

61 ভিউ

Posted ২:১৪ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.